মারিয়া সালামের গদ্য ‘বনলতা এক্সপ্রেস: এককথায় গোঁজামিল’
প্রকাশিত : মে ১৮, ২০২৬
হলে গিয়ে সিনেমা তেমন দেখা হয় না, উচ্চশব্দে প্রচণ্ড মাথাব্যথা হয়। নেটফ্লিক্স দেখি, সাধারণত কমেডি, এনিমেশন বা হরর। এর বাইরে রোম্যান্টিক বা মেলোড্রামাটিক সিনেমা দেখি না, এক ধরনের প্যানিক অ্যাটাক মতো হয়।
এসবের পরেও, গ্রামীণফোন ফ্রি দেখার অফার দিল বলে চলে গেলাম বনলতা এক্সপ্রেস দেখতে। হুমায়ূন আহমেদের গল্প অবলম্বনে বলে বরাবরই আগ্রহ ছিল। ফ্রি পপকর্ন আর পেপসি নিয়ে গিয়ে বসলাম হলে। সিনেমা শুরু হলো।
সিনেমার প্লট নিয়ে বলার কিছু নাই, মোটামুটি সবার জানা আছে। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস যেমন হয়। আমি বরং মেকিং নিয়ে কিছু বলতে পারি। প্রথমেই হোঁচট খেলাম শুরুর দিকের ভয়েসওভার শুনতে গিয়ে, কয়েকটা জায়গায় উচ্চারণ প্রমিত নয়।
অবশ্য আমি নিজেও যে প্রমিত উচ্চারণ করি, সেরকম নয়। কিন্তু সিনেমায় যখন এ রকম সূচনার কথা প্রমিত বাংলায় বলা হবে, তখন অবশ্যই সেটার কন্টিনিউটি বজায় থাকা উচিত। মূল সিনেমা শুরু হতেই আরেক হোঁচট, কয়েকজন ছাড়া প্রায় সবারই অভিনয়টা অভিনয়ই মনে হলো।
মুখের এক্সপ্রেশন, ডায়ালগ থ্রো, বডি ল্যাংগুয়েজ—সবই অভিনয় সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। উপন্যাসের একটা গতি আছে, সেখানে কাহিনি যেভাবে এগিয়ে যায়, সিনেমার চিত্রনাট্যে সেটা খাটে না। সিনেমায় কাহিনি এগিয়ে নিতে হলে মূল গল্পের বাইরে গিয়ে মালমশলা দিতে হয়, একটা স্মুথ ট্রানজিশন থাকতে হয়।
এখানে কিছু কিছু দৃশ্যের শেষ বাক্য নিয়ে আরেকটা দৃশ্যের শুরুর সাথে জুড়ে দিয়ে ট্রানজিশন স্মুথ করার চেষ্টা করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গল্প এগিয়ে নিতে সেটা যথেষ্ট মনে হয়নি। বিরতিতে যাবার আগ পর্যন্ত পুরা বিষয়টাই খুব হালকা আর স্থুল হাস্যরসের মধ্যে আটকে ছিল বলে মনে হলো।
বিরতির পর ঠিক উল্টাটা শুরু হলো। এতক্ষণে সবাই যেমন হালকা হাস্যরসের মধ্যে ছিল, সবাই তেমন গভীর আবেগঘন পরিস্থিতিতে চলে গেল। মানে চরিত্রের পরিচিতি পর্ব ঠিক যতটা ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাদের মানবিক সংকটগুলো হঠাৎই যেন ১০০ মাইল বেগে দৌড়াতে থাকল।
মন্ত্রীর অপসারণ থেকে আবার মন্ত্রী পদে বহাল থাকার যে যাত্রা, সেটা উপন্যাসের পাঠক হিসেবে একভাবে বুঝলেও, সিনেমার দর্শক হিসেবে বুঝে উঠতে পারলাম না। এককথায় গোঁজামিল। এদিকে, গণিতের অধ্যাপকের ছেলের জানাজায় আজিজকে দেখা গেল। তাতে সমস্যা নাই।
সমস্যা হলো, অধ্যাপকের ছেলের কফিন যাচ্ছে রাজশাহীর কোনো এক গ্রামে দাফনের জন্য। ট্রেন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে থেমে গেছে একটা বিরান জঙ্গলের পাশে। সেখান থেকে হেলকপ্টারে আফিয়াকে নেওয়া হলো হাসপাতালে, তারপর ট্রেন আবার ছুটে চলল।
সেই ট্রেনে সবাই আবার চেপে বসল, কিন্তু অধ্যাপককে দেখা গেল ছেলের কফিন নিয়ে গ্রামে দাফনে ব্যস্ত। অর্থাৎ ট্রেন রাজশাহী পৌঁছানোর আগেই অধ্যাপকের ছেলের দাফন হয়ে গেল। সেই গহীন জঙ্গল থেকে অধ্যাপক কিভাবে গন্তব্যে গেলেন, তার কোনো ব্যাখ্যা পেলাম না।
সিনেমার শেষের দিকে কয়েক জায়গায় আবেগে চোখে পানি এসে গেলে ঠিকই, কিন্তু সিনেমার রাইজিং অ্যাকশন, ক্লাইম্যাক্স আর ফলিং অ্যাকশন কার্ভটা ঠিক আইডিয়াল নয়। ক্লাইম্যাক্সের পরেই পুরো গল্পটা মনে হলো একঝাপে খাড়া হয়ে ভূপাতিত হলো।
যাই হোক, লাভের লাভ যেটা হলো ফ্রি পপকর্ন, পেপসি আর গ্রামীণের পেইজে আমাদের সিনেমাটিক ছবি।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী























