রজনীকান্ত সেনের ১০ কবিতা

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬

কবি ও সুরকার রজনীকান্ত সেনের আজ মৃত্যুদিন। ৪৫ বছর বয়সে কলকাতা মেডিকেল কলেজের কটেজ ওয়ার্ডে ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। তার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ হিসেবে তার লেখা দশটি কবিতা পুনর্মুদ্রণ করা হলো—

স্বাধীনতার সুখ

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,
"কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পড়ে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।"

বাবুই হাসিয়া কহে, "সন্দেহ কি তায়?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।"

মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়

মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়
মাথায় তুলে নে রে ভাই;
দীন-দুঃখিনী মা য়ে তোদের
তার বেশী আর সাধ্য নাই।

ঐ মোটা সুতোর সঙ্গে, মায়ের
অপার স্নেহ দেখতে পাই;
আমরা, এমনি পাষাণ, তাই ফেলে ঐ
পরের দোরে ভিক্ষা চাই |

ঐ দুঃখী মায়ের ঘরে, তোদের
সবার প্রচুর অন্ন নাই;
তবু, তাই বেচে কাচ, সাবান মোজা,
কিনে কল্লি ঘর বোঝাই।

আয়রে আমরা মায়ের নামে
এই প্রতিজ্ঞা করব ভাই;
পরের জিনিস কিনব না, যদি
মায়ের ঘরের জিনিস পাই।

তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে

তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে।
তব, পূণ্য-কিরণ দিয়ে যাক্, মোর
মোহ-কালিমা ঘুচায়ে।
মলিন মর্ম মুছায়ে।

লক্ষ্য-শূন্য লক্ষ বাসনা ছুটিছে গভীর আঁধারে,
জানি না কখন ডুবে যাবে কোন্
অকুল-গরল-পাথারে!
প্রভু, বিশ্ব-বিপদহন্তা,
তুমি দাঁড়াও, রুধিয়া পন্থা;
তব, শ্রীচরণ তলে নিয়ে এস, মোর
মত্ত-বাসনা গুছায়ে!
মলিন মর্ম মুছায়ে।

আছ, অনল-অনিলে, চিরনভোনীলে, ভূধরসলিলে, গহনে;
আছ, বিটপীলতায়, জলদের গায়, শশীতারকায় তপনে।
আমি, নয়নে বসন বাঁধিয়া,
বসে, আঁধারে মরিগো কাঁদিয়া;
আমি, দেখি নাই কিছু, বুঝি নাই কিছু,
দাও হে দেখায়ে বুঝায়ে।
মলিন মর্ম মুছায়ে।

পরোপকার

নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল,
তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল,
গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান,
কাষ্ঠ, দগ্ধ হয়ে, করে পরে অন্নদান,
স্বর্ণ করে নিজরূপে অপরে শোভিত,
বংশী করে নিজস্বরে অপরে মোহিত,
শস্য জন্মাইয়া, নাহি খায় জলধরে,
সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত-তরে।

নমো নমো নমো জননি বঙ্গ

উত্তরে ঐ অভ্রভেদী,
অতুল, বিপুল, গিরি অলঙ্ঘ্য।
দক্ষিণে সুবিশাল জলধি,
চুম্বে চরণ তল নিরবধি,
মধ্যে পূত-জাহ্নবী-জল-ধৌত
শ্যাম-ক্ষেত্র-সঙ্ঘ।
বনে বনে ছুটে ফুল পরিমল,
প্রতি সরোবরে লক্ষ কমল,
অমৃতবারি সিঞ্চে, কোটি
তটিনী, মত্ত, খর-তরঙ্গ,
কোটি কুঞ্জে মধুপ গুঞ্জে,
নবকিশলয় পুঞ্জে পুঞ্জে,
ফল-ভার নত শাখি-বৃন্দে
নিত্য শোভিত অমল অঙ্গ!

যারে মন দিলে আর ফিরে আসে না

যারে মন দিলে আর ফিরে আসে না,
এ মন তারে ভালবাসে না!
যাদের মন দিতে হয় সেধে সেধে,
প্রেম দিতে হয় ধরে বেঁধে,
তাদের মন দিয়ে, মন মরে কেঁদে,
আর, জন্মের মত হাসে না!
ফেলে দে মন প্রেম-সাগরে,
হারিয়ে যাক্ রে চির-তরে,
একবার, পড়লে সে আনন্দ-নীরে,
ডুবে যায়, আর ভাসে না।

শ্যামল-শস্য ভরা

শ্যামল-শস্য ভরা
চির শান্তিবিরাজিত, পুন্যময়ী;
ফল-ফুল-পূরিত; নিত্য সুশোভিত;
যমুনা সরস্বতী গঙ্গা বিরাজিত।
ধূর্জটি বাঞ্ছিত হিমাদ্রি মণ্ডিত;
সিন্ধু গোদাবরী-মাল্য-বিলম্বিত;
অলিকুল গুঞ্জিত-সরসিজ-রঞ্জিত।
রাম-যধিষ্ঠিত ভুপ-অলকৃত
অর্জুন ভীষ্ম শরাসন টঙ্কত;
বীর প্রতাপে চরাচর শঙ্কিত।
সামগানরত আর্য্য তপোধন,
শান্তি সুখান্বিত কোটি তপোবন;
রোগ-শোক দুখ পাপবিমোচন।

শুনাও তোমার অমৃত বাণী

শুনাও তোমার অমৃত বাণী,
অধমে ডাকি, চরণে আনি।
সতত নিষ্ফল শত কোলাহলে,
ক্লিষ্ট শ্রুতি যুগ কত হলাহলে
শুনাও হে—
শুনাও শীতল মনোরসায়ন
প্রেম-সুমধুর মন্ত্রখানি।
হউক সে ধ্বনি দিক প্রসারিত
মিশ্র কলরব ছাপিয়া,
উঠুক সে ধবনি শিহরি’ পুলকে
কাঁপিয়া, সুখে কাঁপিয়া,
বিতরি’এ ভবে শুভ বরাভয়;
রুগ্মে করি’;হরি চির নিরাময়,
শুনাও হে—
শুনাও দুর্বল চিত্ত, হে হরি!
তোমারি শ্রীপদ নিকটে টানি।

আমি তো তোমারে চাহিনি

আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে তুমি অভাগারে চেয়েছ;
আমি না ডাকিতে, হৃদয় মাঝারে নিজে এসে দেখা দিয়েছ।
চির-আদরের বিনিময়ে সখা! চির অবহেলা পেয়েছ
আমি দূরে ছুটে যেতে দুহাত পসারি ধরে টেনে কোলে নিয়েছ।
ও পথে যেও না ফিরে এস বলে কানে কানে কত কয়েছ
আমি তবু চলে গেছি ফিরায়ে আনিতে পাছে পাছে ছুটে গিয়েছ।
এই চির অপরাধী পাতকীয় বোঝা হাসি মুখে তুমি বয়েছ,
আমার নিজ হাতে গড়া বিপদের মাঝে বুকে করে নিয়ে রয়েছ।

বড় বিদ্যে করেছি জাহির

রাজা অশোকের কটা ছিল হাতি,
টোডর মল্লের কটা ছিল নাতি,
কালাপাহাড়ের কটা ছিল ছাতি,
এসব করিয়া বাহির, বড় বিদ্যে করেছি জাহির।
আকবর শাহ কাছা দিত কিনা,
নূরজাহানের কটা ছিল বীণা,
মন্থরা ছিলেন ক্ষীণা কিম্বা পীনা,
এসব করিয়া বাহির, বড় বিদ্যে করেছি জাহির।