করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাপী

শামীমা জামানের গদ্য ‘কাঁঠালের বার্গার’

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২১, ২০২২

জাতির পিতা আমাদের কাঁঠাল দিয়ে গেছেন। কিন্তু কাঁঠালের মূল্যায়ন আমরা কখনোই করি না। এ ভারি অন্যায় কথা। কাঁঠালের মতো একটি শক্তিশালী ফলকে প্রায় লোকেই একটু ঘেন্নাপিত্তি করে। অন্যদের কথা কী বলবো, আমাদের বাড়িতেই কাঁঠাল আনলে আব্বা প্রায় চোরের মতো কাচুমাচু হয়ে থাকতেন। মাকে আশ্বস্ত করতেন কাঁঠাল কাটা, কাঁঠালের কোয়া সুন্দরমতো বের করে যাবতীয় আবর্জনা লিলিবু পরিষ্কার করে ফেলবে ডুমো মাছি আসার আগেই।

আব্বার কাঁঠালপ্রীতি সেই লেবেলের! তিনি ছোটখাটো একটা কাঁঠাল এক বসাতেই সাবাড় করে ফেলতে পারতেন। কাঁঠাল একটা এনেও শান্তি হতো না। কারণ, আব্বার পছন্দ নরম রসগোল্লার মতো কাঁঠাল। মা আর আমার পছন্দ একটু শক্ত খাজা কাঁঠাল। কাঁঠাল আমারও পছন্দ। কিন্তু শৈশবে সেটা প্রকাশ করা লজ্জার ছিল। কারণ, প্রিয় বন্ধু লিতামনি সবসময় কাঁঠাল নিয়ে নাক সিটকাতো। কাঁঠাল তার ভালো লাগে না। কাঁঠাল খুবই বিশ্রি একটা জিনিস।

ওসব শুনে নিজের দাম কমে যাওয়ার ভয়ে আর উচ্চারণ করতাম না কাঁঠাল আমার খুবই প্রিয়। কাঁঠালের কোনোকিছুই ফেলে দেওয়ার নয়। এ অতীব সত্য কথা। কাঁঠাল শুধু আমাদেরই জাতীয় ফল নয়, এর পাতা ছাগলের জাতীয় খাদ্য। যশোর গাজীপুরে এক পির সাহেব আছেন, যার বাড়ির ডিজাইন মনিহার সিনেমা হলের মতো। উনার কাছে যেতে হলে কাঁঠালের পাতা নিয়ে যেতে হতো। কাঁঠাল পাতায় তিনি ফুঁ দিয়ে সকলের মুশকিল আসানের চেষ্টা করতেন। বৃত্তি পরীক্ষার আগে আমাদের নিয়ম করে সেখানে নিয়ে যেতেন সিরাজ স্যার।

বিয়ের পর যখন একান্নবর্তী পরিবারে থাকতাম, কাঁঠালের সাথে সম্পর্কটা তখন পুরাই পরকীয়া প্রেমিকের মতো হয়ে গেল। আমার ননদ কাঁঠাল দেখতে পারেন না। কাঁঠাল এ বাড়িতে বলতে গেলে নিষিদ্ধ। কালেভদ্রে তার দেখা মিলতো। শাশুড়ি আম্মার সাথে বসে গপাগপ কটা মেরে দেয়ার আগেই তিনি সতর্কবাণী দিতেন, জলদি খাও, কানিজ এসে পড়বে।

যাই হোক, কাঁঠালের পুষ্টিগুণের কিন্তু শেষ নেই। সে অতিশয় শক্তিশালী ফল। একটি আমল বলে দেই, কাঁঠাল যদি কেউ নিয়মিত বার্গার বানিয়ে কিম্বা কাবাব বানিয়ে খায় সে একটানা ১৪ বছরেরও বেশি একই চেয়ারে বসে থাকতে পারবে। এ কথা প্রমাণিত সত্য। বিদেশে নাকি কাঁঠালের বার্গারের অনেক চাহিদা। এবারও কাউকে বলতে পারছি না এই জিনিসের নাম আমি কোনোদিন শুনি নাই। পাছে আমার দাম কমে যায়!

জ্যাকসন হাইটস এর মান্নান, হাটবাজার এসব গ্রোসারিতে বারো মাসই কাঁঠাল থাকে। ইন্ডিয়ান গ্রোসারি আপনাবাজার, প্যাটেল ব্রাদার্স এ অবশ্য কাঁচা কাঁঠাল প্যাকেটজাত ও টিনজাত অবস্থায় রেডি করা থাকে ইচড়ের জন্য। আজকাল নাকি মানুষ মাংস রেখে কাঁঠাল খাচ্ছে। এ বিষয়টিকে ভেগানদের জয়যাত্রা বলে আখ্যা দেয়া যেতে পারে। দিন দিন ভেজিটেরিয়ানদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে পৃথিবীতে। এটা লোকেদের বেশ একটা ইন্টেলেকচুয়াল ভাব এনে দেয়।

এই যে কাঁঠালকে আপনারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন, কাঠাল কিন্তু একটি সুপার ফুড। এটি মধুর মতোই শক্তিশালী। ইয়ে বর্ধক। কলিকাতা হার্বাল বা ফার্মগেটের আজেবাজে জায়গায় না ঘুরে একট কাঁঠাল কিনে বার্গার বানিয়ে খেয়ে ফেলুন। রেসিপি না জানলে চ্যানেল আইয়ের কেকাপ্পির সাহায্য নিন। তো অই কথাই রইলো, গরুর মাংসের দাম প্লেন ছোঁয়া বলে মন খারাপের কোনো কারন নেই। আমাদের আছে কাঁঠাল। আমাদের আছে ভেন্নার তেল। আমাদের আছে মিষ্টি কুমড়া। ব্যাংকে টাকা নাই তো কী!

একটু কৃচ্ছসাধন করলেই ভালভাবে থাকা যাবে। কার কোথায় সতেরটা বাড়ি, কার বিলিয়ন বিলিয়ন কাগজের হাঁড়ি, এসব দিয়ে আমাদের কাজ কী! চলেন আমরা কাঁঠাল খাই।

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক