করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৪০৬৩৬৪ ৩২২৭০৩ ৫৯০৫
বিশ্বব্যাপী ৪৫৯৫০৩৭২ ৩৩২৭৩৯২২ ১১৯৪৪২৩

শ্রেয়া চক্রবর্তীর উপন্যাস ‘বেহেস্ত’

পর্ব ২

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

শহর থেকে অনেক দূরে ফ্রিতি নদীর ওপর কাঠের ঝোলা ব্রিজটা ছিল আমার আর জুমেরানের সব থেকে প্রিয় জায়গা। কারণ ওখানেই আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। জুমেরান ছিল টুরিস্ট গাইড। ফ্রিতি নদীর ধার ধরে কিছুদূর এগোলে পাকা রাস্তা। সেখান থেকে ঢাল বরাবর নেমে গেছে আমাদের গ্রামের পথ।

ফ্রিতি নদীর ধারে আমার বাবুজি একটি রেস্তরাঁ চালাতেন। খুব নাম ছিল রেস্তরাঁর। বেশি যাতায়াত ছিল দেশি-বিদেশি ট্যুরিস্টদেরই। অনেকটা পথ ভ্রমণ শেষে বাবুজির রেস্তরাঁর রুটি-মাংস তাদের চাঙা করে দিত। বেশিরভাগ পদ বাবুজি নিজের হাতে বানাতেন। সাথে থাকতো বছর কুড়ির একটি দোহারা ছেলে, গ্রামেই যার বাড়ি। মাঝে মাঝে বাবার সাথে হাত লাগাতে যেতাম আমি। আমি তখন বছর সতেরোর কিশোরী, পড়তাম গ্রামেরই এক ইস্কুলে।

এমনই একদিন রেস্তরাঁয় সার্ভ করছি, দূরে রাস্তায় একটা জিপ এসে দাঁড়ালো। জিপ থেকে নামলো কয়েকজন ট্যুরিস্ট। তারা নিজেদের মধ্যে কীসব বলাবলি করতে করতে এগোচ্ছিল। ওদের সবার আগে হেঁটে আসছিল যে ছেলেটি পথ দেখিয়ে, আমি তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলাম। জুমেরান। প্রায় ছ`ফুট লম্বা, মাথায় কোঁকড়া চুল, টিকালো নাক-মুখ। তখনো তাকে জানি না, তবে প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়েছিলাম।

জুমেরান ট্যুরিস্টদের নিয়ে রেস্তরাঁয় এলো। আমরা তাদের ভরপুর লাঞ্চ করালাম। আমি তাকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম, কিন্তু জুমেরান, সে এত ভদ্র বিনয়ী, একবারও আমার দিকে চেয়ে দেখলো না। বড় বেশি উদাসীনতা আমাকে তার প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট করেছিল। যাওয়ার আগে জুমেরান বাবুজিকে ফিসফিস করে কী যেন জিজ্ঞেস করলো। তারপর বেরিয়ে গেল।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল। সাধারণত বড় বেশি রাত অবধি রেস্তরাঁ খোলা থাকতো না। সন্ধ্যার পর ট্যুরিস্টও আসতো না তেমন। রাতের দিকে পরিবেশ তেমন শান্ত থাকতো না। ফ্রিতি নদীর বাঁধের জল নিয়ে কোম্পানির সাথে নেটিভদের লড়াই চলছিল। তবু নদীর কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তার নীল জলধারা চিরকালীন শান্ততার সাথে বয়ে যেত। তখন সাড়ে সাতটা-আটটা বাজে। বাবুজি একটি ক্রেট ধরিয়ে দিয়েছিলেন হাতে। দেখলাম, ওতে বিয়ারের বোতল। এই রেস্তরাঁ মদ বেচতো না। কারণ এখানে মদ বেচার লাইসেন্স পাওয়া যেত না। যা হতো তা গোপনে হতো। বাবা বললেন, শালের ভেতর বোতলটি লুকিয়ে কাঠের ব্রিজের ওপর গিয়ে দাঁড়াতে। তার সাথে ওনার ফোনটিও দিলেন। বললেন, সতেরোর বালিকাকে এখানে কেউ সন্দেহ করবে না। ব্যক্তি ফোন করে আসবে। এলে তাকে যেন বোতলটি দিয়ে দেয়া হয়। বলতে বলতে তিনি রেস্তরাঁ সেদিনের মতো বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে লাগলেন।

আমি বাবার নির্দেশ মতো রওনা দিলাম ফ্রিতির দিকে। আসন্ন সন্ধ্যায় আকাশের নক্ষত্ররাজি তখন জ্বলে উঠছে একটু একটু করে। দূরের পাহাড় আর অরণ্য অন্ধকারে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে আছে। দেখে মনে হবে, এক দৈত্য অতিকায় হয়ে পাঁচিলের মতো আকাশকে ঘিরে রেখেছে দু’বাহু দিয়ে। পথের পাশে বুনো ফুলের গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করে। গিয়ে দাঁড়ালাম কাঠের ব্রিজের ওপর। নিচে নদীর জল কুলকুল করে বইছে। দু’একটা গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে হেড লাইটের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে। ঠিক এমন সময় তার ফোন বেজে উঠেছিল।

দূর থেকে এগিয়ে আসছিল জুমেরান আর আমি যেন মন্ত্রমুগ্ধ কোনো এক কল্পনার জগতে ভেসে গেছিলাম নিমেষেই। আমি কে, তা আমি যেন বিস্মৃত হয়েছি। শুধু মাথার ওপর জেগে আকাশ নক্ষত্রমালা পায়ের নিচে দিশেহারা জল ভেসে ভেসে আকুল। যেন স্বপ্ন, যেন বিভ্রম, যেন মরীচিকা!

জুমেরান এসে দাঁড়ালো আমার সামনে। অন্ধকারের ভেতর আমি দেখলাম তার কোঁকড়ানো চুল, তার প্রশস্ত কপাল, তার ঠোঁট যা নীরবতার ভেতর স্থির হয়েছিল। আমি শালের ভেতর থেকে বোতল বের করে তার হাতে দিলাম। সে ব্যাগে ভরে নিলো। ঠিক এমন সময় উল্টো দিক আসা গাড়ির আলো তার মুখের ওপর পড়েছিল। আমি দেখলাম তার দৃষ্টি আমার চোখের ভেতর স্থির, যেন ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজতে ব্যস্ত, এমন উৎসুক। আমার মাথা থেকে পা অবধি বিদ্যুৎ খেলে গেল, যেন আমি গোটাটাই বিদ্যুৎ হয়ে গেছি তার চোখে চোখ লেগে। আমি ঝটিতে ঘুরে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করেছিলাম আর পিছনে শুনেছিলাম তার কণ্ঠ, মানি?

একটু থেমে ঘাড় ঘুরিয়ে কোনোমতে জবাব দিয়েছিলাম, বাবুজিকে দিয়ে দেবেন। বলেই ছুটতে শুরু করেছিলাম। পাহাড় নদী অরণ্য অতিক্রম করে কোথাও পালাচ্ছিলাম যেন। কিন্তু কোথায়? আর কার থেকেই বা পালাচ্ছিলাম দূর অতিদূর কোনো আশ্রয়ের কাছে... সে প্রশ্নের জবাব পেয়েছিলাম অনেক পরে।

রেস্তরাঁর কাছে পৌঁছে দেখলাম, বাবুজি ঘরে যেতে প্রস্তুত। আমি তার সাথে হাঁটা শুরু করলাম। সেদিনের পথ যেন অতি দীর্ঘ বোধ হলো। অন্ধকারে নিজ ছায়ার পিছু পিছু ফিরলাম আমার নিজস্ব গৃহে। ঘরের দরজা দিয়ে শুলাম। সারারাত আমাদের বাড়ির টিনের চালের ওপর ঝমঝম বৃষ্টি পতনের শব্দ শুনেছিলাম সেদিন। স্বপ্নে দেখেছিলাম ফ্রিতি নদী ফুঁসছে। এত তার তেজ যে, বড় বড় পাথরের খণ্ডগুলো ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে, বৃষ্টির ভেতর দুলছে নদীর ওপর কাঠের ব্রিজ। ব্রিজের এপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি আর ওপ্রান্তে জুমেরান, আর দুজনের মাঝখানে ছিল কেবল প্রবল বর্ষণজনিত অস্পষ্টতা... চলবে