করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫৪৫৮৩১ ৪৯৬১০৭ ৮৪০০
বিশ্বব্যাপী ১১৪০০০৫৯৫ ৮৯৫৬৩৭৯৪ ২৫২৯৫৯৩

সদীপ ভট্টাচার্যের উপন্যাস ‘উপোষী মেঘ’

পর্ব ৩

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২১, ২০২১

জাঁ কোকতু বলেছিলেন, The day of my birth, my death began its walk. It is walking toward me, without hurrying.
 
কোকতুর সিনেমা অনেক পরে দেখেছি, কিন্তু তার কবিতার বই (ইংরেজি অনুবাদে) আমার হাতে এসে পৌঁছেছিল অনেক আগে। অবশ্যই রতনদার হাত ধরে। আমি কবিতাগুলো গিলেছিলাম বলা চলে।

তিনটে পাতা ছাড়া গাছ পরপর লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। রাত হতে আর বেশি সময় নেই। একটা বাংলা মদের বোতল হাতে দূর থেকে টর্চ নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে কেউ। আমি দেখলাম, রতনদা।

দেখা হবে এভাবেই, তোর সাথে। এপারে, ওপারে... রতনদা আমার একদম পাশে এসে বসেছে। বোতল খুলে ঢকঢক করে কিছু মদ খেয়ে নিয়ে বোতলটা আমার দিকে এগিয়ে ধরল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাবাকে দেখলাম আজ, একটু আগেই। নদীর ঐদিকটায়। আমরা কথা বললাম কিছুক্ষণ। আচ্ছা, আমি কোথায় বলো তো?

রতনদা হালকা হেসে বলল, যমের দক্ষিণ দুয়ারে। নে নে মাল খা... দেখবি জ্বালার মধ্যে দিয়ে অপেক্ষা মিশে একটা চিড়বিড়ানি নেমে যাবে পেটের মধ্যে। আর তুই মেনে নিতে শিখবি।

জোনাকি উড়ে বেড়াচ্ছে ধারেকাছে। আলো নেই বললেই চলে। রতনদা টর্চটা বন্ধ করে পাশে রেখেছে। ঘোলাটে চোখে নদীর বুকে চেয়ে রতনদা বলল, জলের ওপর দিয়ে হেঁটে গেছিস কখনো?
আমি বললাম, না। জলের মধ্যে হেঁটেছি।

রতনদা চটজলদি উঠে পড়ল। আমার হাত ধরে বলল, চল তোকে নিয়ে যাবো আজ...
আমি বললাম, কি করে সেটা হয়? আমি যে সাঁতার জানি না।

রতনদা আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ডুববি না, কথা দিচ্ছি। রাতের সদ্ব্যবহার করতে শেখ। জলের ওপর হাঁটবি, জঙ্গলের ভেতরে উড়ে বেড়াবি আর পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচু করে প্রশ্ন করবি...

শব্দ বাক্য সাজায়। শব্দ যতই জাদুকর হোক না কেন, এর পরের অভিজ্ঞতা শব্দে কতটা ফুটে উঠবে, জানি না। আমি আর রতনদা নদীর জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে লাগলাম সামনে যেখানে চাঁদের বুড়ি চরকা কাটছে আলোয়। যেখানে শুশুক মাথা উঁচু করে আমাদের পথ দেখিয়ে দিচ্ছে আর আমরা দুজনে সোজা জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি একদম রাস্তায় হাঁটার মতো। পা ভিজছে অল্প অল্প। যেমন স্বল্প জলে পা ভেজালে মনে হয়, তেমন।

নিচে দেখিস না। নিচে প্রলোভন ফাঁদ পেতে রেখেছে। মোহে পা পড়লেই ব্যাস! রতনদা একটা জোনাকিকে আদর করতে করতে কথাটা বলল। আমি কৌতূহলে নিচে তাকাতেই প্রথমেই চোখে পড়ল নিচে একটা কলকাতার গলি। গলির মোড়ে রাত্রি দাঁড়িয়ে আছে। রাত্রি আমার কলেজে পড়ত। একই ইয়ার। রাত্রি একটুও বদলায়নি। না না, আমিই ভুল করছি, এত ২০১১ সাল।  একটু পরেই আমি আসব রাত্রির সঙ্গে দেখা করতে এই গলিতে।

বললাম, রতনদা? দেখে যাও! জলের নিচে অতীত দেখা যাচ্ছে। রতনদা?
একবার মুখ তুলে দেখি, রতনদা চুকচুক শব্দ করছে দূরে দাঁড়িয়ে আর নিমেষের মধ্যে আমি ডুবে যাচ্ছি জলের তলায়! হাবুডুবু খাচ্ছি জলের মধ্যে। আমার ইতিহাস আমাকে টানছে নিচে মাধ্যাকর্ষণের যুক্তিতে। আমি তলিয়ে যাচ্ছি, ভিজে যাচ্ছি, ডুবে যাচ্ছি, ডুবে যাচ্ছি, ডুবে যাচ্ছি...

মোহ পুরোপুরি কাটিয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু মোহে বারবার ডুবে যাস না, কথাটা মাথায় রাখিস! রতনদা বলেছিল, নাকি বলল আরেকবার? কানে জল ঢুকে যাচ্ছে। কথাগুলোর শব্দ এখন মাছেদের পেটে। চলবে