রহিমা আফরোজ মুন্নীর নভেলা ‘ধুরন্ধর’

পর্ব-২

প্রকাশিত : জুন ২৭, ২০২৬

৩.
ঠিক বা বেঠিক ভেবে কেইবা চোখ দিয়ে চায়, অন্তত প্রথমবারের চোখ দিয়ে তো নয়ই। তবে দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার চাইলে মগজকে অর্ডার করা যায় ঠিক বা বেঠিক বুঝে, তারপরে দেখো তবে সাধের মগজেও আজ গোবর ভরা নিধির। নাহলে চারবারের বারও ঠিক না বেঠিকের ধন্দে হাতের কাপ উল্টে টেবিলের ক্লথ ভাসিয়ে কী বুঝ নিয়ে সে আরও কাছ থেকে দেখতে গেল দেয়ালে ঝোলানো পোট্রেটের চোখ দুটো, বিভাসের চোখ। বিভাস নিধির স্বামী, পেশায় ডাক্তার, বছর তিনেক হলো তাদের  নামকাওয়াস্তের বিয়ের, কেউ কারোর পরওয়া করে না, সবই গা সওয়া। তবুও নিধির অনুভবে বিভাসের চোখ দুটোতে আজ আরও সন্দেহ, আরও ঘৃণা।

চোখে চোখ রেখে অবহেলার হাসিতে বিভাসের পোট্রেটের দিকে চেয়ে নিধি ফিসফিসিয়ে বলল, ‘বিভু, তুমি আমাকে মেরে কেন ফেলো না!’

অকারণেই সোজা হয়ে থাকা পোট্রে্টটা বাঁকা করে দিল। ঘুরে এসে আবারও ইভানের পাশে বসে ভাবল, শব্দ করে চা না খেলে আমি হয়তোবা তোমার মুখোমুখি বসতাম, হয়তোবা ছবিটা এই মুহূর্তে চোখে পড়ত না, হয়তোবা বিভু আমাকে এক্ষুনি দোষী অনুভব করাতে পারত না। আবারও একদফা রাগ উঠল ইভানের প্রতি। তার পরিমিতবোধ নিয়ে ভাবছিল। বছরখানেক হলো ইভানের সাথে তার পরিচয়। আর এই এক বছরে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি ইভানের, যা রোজগার করে তার বেশি খরচ করে, সেটাও নিধির থেকে নিয়ে।

এবার স্বামীর পোট্রেটের দিকে তাকায় নিধি, ইভানের উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে বলতে থাকে, ‘ওহো, ড. বিভাস যে, সিনিয়র অ্যানেস্থেসিস্ট হয়েও ডিউটিতে মদ পান আর রোজ নয়া সিস্টারদের সাথে শোয়াতেও পয়লা নম্বর অর্জনের পর আমাকে ছুঁতে ঘেন্না ছড়ানোর পর তুমি কতটা পরিমিতবোধ সম্পন্ন!’

বলতে বলতে নিধি দেয়াল থেকে পোট্রেটটা খুলে ছুঁড়ে মারে মেঝেতে। উত্তেজনায় পা দিয়ে মাড়িয়ে বলতে থাকে, ‘তোমাকে তো আমি ভালবাসতে চেয়েছিলাম বিভু।’ এই সময় দ্রুত ইভান ছুটে এসে পোট্রেটটা বাঁচাতে চেষ্টা করে। কারণ নিধির কাছেও সেটা মূল্যবান, ইভান জানে। মেঝে থেকে পোট্রেটটা নিয়ে দেয়ালে টাঙায়, ক্ষতিগুলো স্পষ্ট, কিন্তু নিধির ভয় করে না। ততদিনে সে বুঝে গিয়েছে, বিভাস তার স্বামী, পদবী সামাজিকভাবে টিকিয়ে রাখবে যে কোনো মূল্যে, লোকলজ্জায় খাটো হয়ে পরিমিতবোধের জলাঞ্জলি দিলে খ্যাতির চূড়া থেকে পিছলে যাবে মুহূর্তেই। লোকের খাতিরে তাই বিয়ের প্রথম থেকেই সম্পর্ক জুড়ে সীমাহীন শর্ত, তাই সামাজিকভাবে সুসম্পন্ন বিয়েটা পরিমিতবোধের বাইরে একটা আঙুলও তুলে না।

তাছাড়া নীতিগতভাবেই নিজের বিষয়ে বিভাস কোনো রাখঢাখ রাখেনি। তার যাপনে বিন্দুমাত্র দখলদারি চলবে না, এই শর্ত মেনেই বিয়েতে রাজি হয়ে নিধি ধরেই নেয়, এইসব কথা নিছক কথার কথা ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু সেইসব নিছক তখনও ছিল না, আজও নেই, আর পরের কথা ভাবতে নিধি এখনও তৈরি নয়। সামাজিক নিরাপত্তার অভাব তাকে ডিভোর্স বিষয়ে ভীতু আর অসহায় করে তুলছে। তার ওপর দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেবার বাস্তবতায় অনাগত দিনে নিজকে দেখে আরও হীন আরও দুর্দশাগ্রস্থ। এইসব না জানা দিনের মুখোমুখি না হবার তাড়না নিধিকে আপ্রাণ চেষ্টা করায় বিভাসকে স্বাভাবিক রাখতে।

এগিয়ে গিয়ে দেয়ালে ঝোলানো পোট্রেটটা সাবধানে ঝাঁড়পোচ করে টানটান করার চেষ্টায় টের পায়, ভয়ের হাত কাঁপাকাঁপি, করুণার চোখ দুটো পরম মমতায় হাত টেনে ঢেকে নেয় পরস্পরের ভীরুতা।

৪.
ইভান আর নিধি বেসরকারি একটা কলেজে পড়ায়, খুবই সাধারণ মানের, এবিসিডিইএফ জাতের নাম যথারীতি, শহরের দামি এলাকায় ক্যাম্পাস আর হোস্টেল, অনেক ভুজংভাজুং দিয়ে ধনীদের আকর্ষিত করাটাই তাদের ধ্যান, এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটিজ চলতেই থাকে মাসজুড়ে। কিন্তু পড়ার নামে লবডঙ্কা। ইভান, নিধি আছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের লেকচারার হিসাবে। এছাড়া আরও কয়েকজন সিনিয়র স্টুডেন্টসহ এক্সট্রা কারিকুলামের বিষয়গুলো দেখে। ইভানের পছন্দের বিষয় ফটোগ্রাফি। যদিও তার সার্টিফিকেট যা পাশের দেশের এক ইউনিভার্সিটির বলে সে দাবি করে, কিন্তু কিছু একটা নয়-ছয় যে রয়েছে, তাতে কলিগদের সন্দেহ আছে।

নিধির দায়িত্ব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, যার মধ্যে ইন্টেরিয়র থেকে শুরু করে কুকিং পর্যন্ত দেখতে হয়। ম্যানেজমেন্ট তার কাজকর্মে সন্তুষ্ট বিধায় অন্যান্য কলিগরাও তাকে সমঝে চলে। অন্যদিকে বিয়াল্লিশ বছরের ইভান যথেষ্ট সিনিয়র হবার পরেও আচরণে চব্বিশে ঠেকে আছে। অবশ্য ছাত্রছাত্রীদের মাঝে সেই কারণেই তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। মাস্টারের ঘাড়ে হাত রেখে সিগারেট টানা স্টুডেন্টদের কাছে মজাদার তো বটেই। নিজের বয়স নিয়ে ইভান মজা করে, ‘৪ এর জায়গায় ২, আর ২ এর জায়গায় ৪ বসিয়ে নিয়েছি স্রেফ, ফেলা হচ্ছে না তো কাউকেই।’

তার স্টুডেন্টরাও ফেলতে চায় না এমন এভারগ্রীন টিচারকে, বিশেষত মেয়ে স্টুডেন্টগুলো মৌমাছির মতো স্যারকে ঘিরে এমন পাক খেতে থাকে যে, ছেলে স্টুডেন্টগুলো আকর্ষিত করবার একশো একটি কৌশল শিখতে যায় ইভানের কাছেই। আর ইভানের বিশ্বাস, ফ্রি শেখালে ভুলে যাওয়ার চান্স বেশি। তাই খামের সাইজ যা হোক খাম থাকতেই হবে শিখতে চাইলে, তা হোক ছেলে বা মেয়ে। তাছাড়া সুদর্শন ইভানকে নিয়ে যেহেতু নারীঘঠিত স্ক্যান্ডালও নেই, তাই মেয়েরা নিরাপদ আপোসে স্যারকে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ক্লাসের বাইরে সবার কাছেই সে ব্রো, আর এই নিয়ে নিধির আপত্তিতেও ইভানের মনে হয়নি, তার পরিমিতবোধ সীমা লংঘন করছে। চলবে