সাদাত হাসান মান্টোর গল্প ‘হেয়ার কাটিং সেলুন’

অনুবাদ: এবিএম কামালউদ্দিন শামীম

প্রকাশিত : নভেম্বর ১২, ২০২১

: আপনি আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। খোদা করুন, আমি যেন মরে যাই।
: নিজের মৃত্যু কামনা করো কেন? আমি মরে গেলেই সব ঝামেলা চুকে যায়। বলো যদি আমি এখনই আত্মহত্যার জন্যে তৈরি রয়েছি। এখানে আমার পাশেই আফিমের কৌটা রয়েছে। এক তোলা আফিমই যথেষ্ট।
: যান, ভাবছেন কি অত?
: যাচ্ছি। তুমি ওঠো। জানি না, এক তোলা আফিমের দাম কত, তুমি আমাকে দশটা টাকাই দ্যাও।
: দশ টাকা!
: হ্যাঁ ভাই, নিজের জীবন দেব, দশ টাকা তো এমন বেশি কিছু নয়।
: আমি দিতে পারব না। আফিম খেয়েই আপনাকে মরতে হবে?
: কীটনাশক ওষুদ খেয়েও তো মরা যায়।
: দাম কত?
: আমি জানি না। আগে কখনও খাইনি।
: আপনি সবই জানেন, এখন না-জানার ভান করছেন।
: তুমিও ভান করছ। বিষের দাম আমি জানব কী করে?
: আপনি সব বিষয়েই অভিজ্ঞ।
: তোমার সম্পর্কে এখনো অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারিনি।
: কারণ, আমার সম্পর্কে আপনি কখনো ভাবেননি।
: এটা সুস্পষ্ট বাড়াবাড়ি। পাঁচ বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে এমন একটা দিনের কথা বলো দেখি, যেদিন আমি তোমার সম্পর্কে ভাবিনি?
: রাখুন ওসব ন্যাকামি। পাঁচ বছরে যতদিন হয় ততদিনই আপনি এ ধরনের আজগুবি কথা বলেছেন।
: বাস্তব কথাকে তুমি বলছ আজগুবি! তা বললে আমি কি করব?
: যা বলার বলে ফেলুন। আপনার মুখে তো লাগাম নেই।
: আবার তুমি বাজে কথা বলছ!
: বাজে কথা বলছেন আপনি। এই পাঁচ বছরে আপনি কোরআন মাথায় নিয়ে বলুন দেখি, কবে আপনার সাথে গোস্তাখি করেছি? তবে বলা যায় আপনি- আপনি...
: বলো বলো, থামলে কেন?
: আমি কিছু বলতে চাই না। আপনি তো চান যে, ব্যথা পেলেও কেউ উহ শব্দ না করুক। আমি এ ধরনের জীবনযাপনে হাঁপিয়ে উঠেছি।
: তুমি চাওটা কি বলবে তো?
: আমি কিছু চাইনে।
: না চাইলে এরকম গলাবাজিতে কী লাভ!
: লাভ আপনি ঠিকই জানেন। না জানার ভান কেন করছেন? একটা লাভ নিশ্চয়ই আছে।
: কি সেটা?
: আমি কি জানি?
: অদ্ভুত ব্যাপার! নিজেই ছিঁড়ছ, নিজেই সেলাই করছ না কেন? আমি বুঝতে পারছি না, প্রতিদিনের ঝগড়া আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে!
: জাহান্নামে।
: সেখানেও তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।
: আমি সেখানে যাবই না।
: তবে তুমি কোথায় যাবে?
: আমি জানি না।
: তুমি অনেক কিছুই জানো না। যেমন আমার ভালোবাসার কথা তুমি কিছুই জানো না। ভালোবাসার প্রকাশ করতে আমি কার্পন্য করেছি, নাকি তোমার মধ্যে অনুভব শক্তি নেই, কে জানে! আসলে তুমি অনুভূতিহীন।
: কী রকম? এই পাঁচ বছরে প্রতিদিন প্রতিদিন...
: সে তো আমার ভালোবাসার প্রকাশেই গৌরবোজ্জ্বল।
: এ ধরনের ভালোবাসার ওপর অভিশাপ যে ভালোবাসায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
: ভালোবাসায় কেউ অতিষ্ঠ হয় নাকি?
: হয়। যেমন আমি হয়েছি।
: এর অর্থহলো তুমি স্বীকার করছ যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
: আমি কখন স্বীকার করলাম?
: এটাই তো আসলে স্বীকারোক্তি।
: হবে হয়তো।
: হয়তো নয়, আসলেই। কিন্তু তুমি জেদি মেয়ে তো, এ কারণে মানতে চাও না। মেয়েদের মনস্তত্ত্বযে কী আমি বুঝতে পারলাম না। ভালোবাসলে তারা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, অবহেলা করলে ক্ষেপে যায়।
: এসবই বাজে কথা।
: নিবেদিতপ্রাণ স্বামীর মুখনিঃসৃত কথা, তাই বাজে কথা মনে হচ্ছে।
: যান যান, আপনাকে চিনতে আমার বাকি নেই।
: চিনতেই যখন পেরেছো তখন বিশ্বাস কেন করছ না?
: আমাকে জ্বালাতন করবেন না। আমার শরীর খারাপ, কোনও কিছু ভালো লাগে না।
: নিজেকেও ভালো লাগে না?
: না না, আজ নয়।
: আচ্ছা, তাহলে কাল?
: জানি না।
: বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তুমি আমাকে ঘৃণা করো।
: তবে শুনে নিন, আপনাকে আমি ঘৃণা করি।
: দুঃখিত হলাম, অথচ এই আমিই তোমার সব ইচ্ছে যথাসাধ্য পূরণ করেছি।
: কিন্তু একটা ইচ্ছে পূরণ করেননি।
: কী সেটা?
: আপনি বুদ্ধিমান মানুষ, নিজেই বুঝে নিন। আমি কেন বলব?
: ইশারায় বলো।
: আমি অত ইশারা জানি না।
: তুমি এভাবে কথা বলা শিখলে কোথায়?
: আপনার কাছে শিখেছি।
: আমার কাছে? আশ্চর্য, আমাকে এ রকম অপবাদ দিচ্ছ?
: এরকম বহু অপবাদ আপনাকে দেয়া যায়।
: যেমন, বলো দেখি।
: আমি অত উদাহরণ দিতে পারব না। আল্লার ওয়াস্তে কথা বন্ধ করুন। আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। আমি তো বলেছি, আমাকে...
: কি তোমাকে?
: আমাকে বেশি বিরক্ত করবেন না। মন চায় মাথার চুল ছিঁড়তে শুরু করি।
: আমার মাথা হাজির রয়েছে। তুমি সাগ্রহে চুল ছিঁড়তে পারো।
: আপনার চুল তো আপনার খুবই প্রিয়।
: মানুষের নিজের সবকিছুই তার প্রিয়।
: কিন্তু পুরুষের মাথার চুলেও বাড়াবাড়ি ভেড়ার লোমের জটার মতোই মনে হয়। জানি না, চুল কাটাতে আপনার এত আপত্তি কেন?
: আমি আপত্তি করারই মানুষ।
: মিথ্যে কথা। গত পরশু বলেছেন, আপনি এক পার্টিতে মদ খেয়েছেন। সেই মদের ক্ষেত্রে আপত্তি কোথায় ছিল?
: লা হাওলা ওয়ালা, আমি তো শুধু এক গেলাশ শিরিন পান করেছি।
: সেটা আবার কি জিনিস?
: এক নির্দোষ উত্তম পানীয়। তোমার বাজে কথা আমাকেও বাজে কথায় অভ্যস্ত করে তুলতে পারে।
: এমনিতে কি আপনি বাজে কথা বলেন না?
: বাজে কথা বলতো তোমার বাবা। জানো তো, উনি প্রত্যেক ব্যাপারেই বাজে কথা বলতেন।
: আমার সামনে আমার আব্বার সম্পর্কে কিছু বলবেন না। আপনি বড় নিচে নেমে যাচ্ছেন।
: তার মানে?
: আমি জানি না।
: না জেনে অমন ফতোয়া দাও কি করে?
: আমি বলতে চাই, আপনি অত লম্বা চুল রাখলেন কেন? দেখেই আমার ভয় করে।
: ও, এই কথা! এ কারণেই তুমি অমন ক্ষেপে আছো? ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি।
: কোথায়?
: যাচ্ছি।
: আল্লার ওয়াস্তে বলুন, কোথায় যাচ্ছেন। আমি কিন্তু গলায় দড়ি দেব।
: আমি নুসরাত হেয়ার কাটিং সেলুনে যাচ্ছি।