চিত্রকর্মঃ রিফাহ সানজিদা

চিত্রকর্মঃ রিফাহ সানজিদা

এক কাপ চা

বৈতরণী হক

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৮

সামনে এক্সাম বা অফিশিয়াল আ্যাসাইনমেন্টের ডেডলাইন মিট করতে হবে তাই রাত জাগতে হচ্ছে আপনার সংগী কে- এক কাপ চা; অলস বিকেলে গল্পের বই নিয়ে বসেছেন বা সিনেমা দেখছেন আপনার চাই সেই এক কাপ চা; সন্ধ্যার পর বন্ধুদের জমজমাট আড্ডায় আপনার হাতে এক কাপ চা না হলেই নয় তাই নয় কি? আজকের গল্প সেই এক কাপ চা কে নিয়েই।

 

বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গায় চা বাগান থাকলেও সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায় সর্বাধিক চাবাগান অবস্থিত। আর শ্রীমংগল উপজেলা হলো মৌলভীবাজারের অন্তর্গত। শ্রীমংগল বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী। সুন্দর, ছিমছাম আর পর্যটক বান্ধব একটা থানা শহর। ২০১৩ সালে এই শ্রীমংগল আর তার পার্শ্ববর্তী কিছু জায়গার কয়েকটা চাবাগান ঘুরে আর চা শ্রমিকদের সাথে কথা বলে- প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলাম আমার ডিগ্রী লাভের খাতিরে। আর তার ভিত্তিতেই আমার আজকের লেখা। চা বাগানের শ্রমিকদের পূর্বপুরুষরা বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালে। বাংলাদেশের আদিবাসি হিসেবে তাদের ধরা যেতে পারে। ১৫০ বছর ধরে তাদের বাস আমাদের দেশের মাটিতে। চাবাগানের পাতা তোলার কাজটা সবথেকে কঠিন সেটাই নারীরা করে। পুরুষরা প্রসেসিং ইউনিটে কাজ করে, পোকামাকড় মারার বিষ স্প্রে করে বাগানে, গাছে ওষুধ ছিটায়। মহিলাদের রবিবার বাদে সবদিন দৈনিক আট ঘন্টা করে কাজ করতে হয়, দুপুরে অল্প সময়ের জন্য বিরতি। এই মহিলাদের খাদ্যতালিকা কি জানেন? সকালে ছোট ১টা বা দুটো শুকনো রুটি আর দুপুরেও তাই। কখনো শুকনো হাফ বয়েল ভাত যাকে তারা দানা বলে। আর রাতের বেলা তারা ভাত খায় আলু ভর্তা বা ডাল দিয়ে। তলবের দিন মানে সাপ্তাহিক বেতন যেদিন পায় সেদিন তারা ডিম বা ছোট মাছ দিয়ে ভাত খায়। বিজয়া দশমী আর হোলি-বছরে এই দুইদিন তাদের কপালে মাংস বা বড় মাছ জোটে। বাগান থেকে যে রেশন দেয়া হয় তা দিয়ে তাদের চলেনা তাই আধপেটা খেয়ে থাকতে হয়। পানির ব্যাপারেও তাদের হিসাব করতে হয়। বাগানগুলোতে দিনে দুই বার পানির সাপ্লাই দেয়া হয় এক বা দুই ঘন্টার জন্য। ত্রিশ চল্লিশটা পরিবারের পানির লাইন একটা কলের পিছনে।

 

সারাদিন হাড় ভাংগা খাটুনির পর পানির জন্য লাইন, সেকি কষ্ট নিজের চোখে দেখা। তারপর সেই পানি জোগাড় করে ঘরের কাজ করা। রাতে যে খুব আরামের ঘুম হয় তাদের তাও না। একটা ছোট ঘরে গাদাগাদি করে ছয় সাতজন থাকে কখনো বা খারাপ আবহাওয়ার সময় গবাদি পশুদের ও এক ঘরে আশ্রয় হয়। এইসব বাগানের মহিলাদের মাঝে পড়ালেখার কোন ছাপ পড়েনি, নিজের নামটা লিখতে পারেনা। যদিও বা এখন সরকার, এনজিও আর বাগান মালিকদের তরফ থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্হাপণ করা হয়েছে তাও সেটা খুব বলার মত না। স্কুল ড্রপ আউটের সংখ্যা বেশি কারণ ওরাকাজ করতে গেলে ছোট ভাইবোন দের দেখতে হয় সেই ড্রপ আউট বাচ্চাগুলোকে। এবার আসি তাদের স্বাস্থ্য কথাতে। নারী শ্রমিকদের কাজ সবসময় এক জায়গায় হয়না। বাগানের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় তাদের পাতা তুলতে হয় একেক সময়। Tea Garden Labour Ordinance 1962 সাল অনুযায়ী যে এলাকায় একসাথে ২৫ জন নারী কাজ করে সেখানকার অদূরে টয়লেট থাকার কথা। অবশ্য আইনের এই নিয়মটার বাস্তবায়নটা তেমন সহজ নয় মালিক শ্রেনীর মতে। কিন্তু তাতে কি শ্রমিকদের ভোগান্তি তো থেমে নেই!

 

পাতা তোলার কাজে নারীরা নিয়োজিত থাকলেও তাদের কাজের তদারকি যারা করে তাদের বলে সুপারভাইজার বা সর্দার তারা তো পুরুষ। লজ্জায় আট ঘন্টা তারা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে চায়না বড় গাছ বা ঝোপের আড়ালে গিয়েও । একটু ভেবে দেখবেন যে নারীটি সন্তান সম্ভবা বা যার মাসিক চলছে তার কেমন লাগে? মাথার উপরে কখনো সূর্য আবার কখনো বৃষ্টি নিয়ে তারা কাজ করে পিঠে এক ভারি বোঝা নিয়ে। দৈনিক তাদের কমপক্ষে ২২ থেকে ২৩ কেজি পাতা তুলে জমা দিতে হয়। তার পরে কিছু তুলতে পারে সেটা বাড়তি ধরা হয়। জীর্ণকায় শরীরের হাড়গুলোর কত না আঘাত লাগে এই ভার বইতে! আগেই তো বললাম লেখাপড়ার ছোঁয়া না থাকায় তারা কুসংস্কারচ্ছন্ন। আগে না থাকলেও এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কাঁচা টয়লেট আছে তাও নারীরা ব্যবহার করেনা কারণ স্বামী শ্বশুড় দেবতাতূল্য, এক জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করলে তাদের অসম্মান করা হয়। তাই কি আর করা টয়লেট সিনেমার মত লোটা পার্টির সদস্য হয়েই সব কাজ সারতে হয় তাদের। কিন্তু এই দেবতাতূল্য মানুষগুলো যখন প্রতিরাতে মদ খেয়ে এসে বউ পিটায় তখন নারীরা নীরব থাকে। তলবের দিন ই সব টাকা তুলে দেয় স্বামীকে তাও স্বামীর শান্তি হয়না। এদের মধ্যে প্রতিবাদী নারী যে নাই তা না তবে খুব কম। (আরেকদিন এমন এক নারীকে নিয়েই শুধু লিখবো) আজকাল চা বাগানে বাংলাদেশের সমতল ভূমি থেকে মানুষরা গিয়ে কাজ করছে যেমন ময়মনসিংহ, কুমিল্লা। তারা মূলত ম্যানেজারের বাংলোর কাজ কর্ম বেশি করে। এমনি এক মহিলা আমাকে দুঃখ করে বলছিল যে - আমরা কাজ পাইনা বলে এখানে আসছি , আবার ভালো কাজের সন্ধান পেলে চলেও যাবো। এদের কি হবে ওরা না বুঝে আমাদের কথা, না আছে বাগানের বাইরে কোন ধারণা, ওদের দেখে আমার দুঃখ লাগে খুব। কথা সত্য।

 

১৯৭১ সালের পর তাদেরকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের নাগরিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে তারা ভোট ও দেয় তবে বেশিরভাগ সময় তাদের বলে দেওয়া হয় কাকে ভোট দিবে। তাছাড়া আর কি করার প্রার্থীদের কেও তো তারা চিনেনা। চাবাগানের কলোনীর ভিতরগুলো এক অদ্ভুত জায়গা। লেবার লিডারদের সহযোগিতা না পেলে এসব মহিলাদের সাথে কথা বলাও সম্ভব না, ওরা কথা বলতেও ভয় পায়। এ এক স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিতরে এক পরাধীন দেশ বলে আমার মনে হয়েছে। আসলে ব্রিটিশ আমলে এতো কিছু চিন্তা করে বা এত মানুষকে ভেবে তো বাগান করা হয়নি। ক্রমবর্ধমান মানুষের চাপে বাগান মালিকদের ও সব ম্যানেজ করতে বেগ পেতে হয় বলে মালিক শ্রেণীর মানুষদের দাবি। কিন্তু তাই কি? আজকে আমাদের বাংলাদেশের শুধু শহর না গ্রামের মেয়েরা কত এগিয়ে গিয়েছে যেটা গর্বের কথা, কিন্তু আমাদের দেশের একটা কোণায় কিছু নারী শারীরিক মানসিক কষ্ট সহ্য করে যুগের পর যুগ কাটাচ্ছে, মেনে নিয়েছে তাদের নিয়তি, নিজেদের ভাগ্যবান ভাবে শুকনো রুটি খেয়ে, একট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থেকে মাথা গুঁজতে পারে বলে। ওদের মনে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে ওরা দাস আর দাসদের নিজস্ব চিন্তা চেতনা বিবেচনা কি আর থাকতে আছে?

ধারাবাহিক