অমিতাভ পালের একগুচ্ছ কবিতা
প্রকাশিত : আগস্ট ২৩, ২০১৮
পুরুষের আকাশে মেয়েদের চোখ
পুরুষের আকাশে মেয়েদের চোখ সূর্যের মতো
পরিচয়ের প্রথম ক্ষণগুলিতে সেখানে মাখানো থাকে
ভোরের নম্রতা আর কোমল লাল রোদ
তারপর পরিচয়ের জীবনে মধ্যাহ্ন এলে
সেই চোখে প্রখরতা বাড়ে
রোদের তখন দারুণ ঝাঁঝ
ছিড়েখুড়ে ফেলা তার দৃষ্টির দিকে তাকাতেও কষ্ট হয়
অবশ্য আকাশে সেসময় মেঘের জন্মও হয়
তার ছায়ায় আমরা সুশীতল হই
আর জলে মাখা থাকে বিষণ্ন সিক্ততা
সেই সিক্ততা আমাদের ভেজায় আর শিশুদের মাতায়
অবশেষে পরিচয়ের বিকালে চোখ দুটিতে নামে অস্তরাগের আভা
নিরব সিসি ক্যামেরার চাউনির মতো
তারপর দিনের শেষে সন্ধ্যায়
তারা ডুবে যায় জীবনের সম্পূর্ণতায়
আগামীকাল শুরু হবে মেয়েদের কিশোরী কন্যার দিন
নগরের চারদিকে জল
নগরের চারদিকে জল– জলাবদ্ধতা
মেঘের মূলধন হারিয়ে বৃষ্টি বিদায় নিয়েছে সেই কবে
কিন্তু জল এখনো রয়ে গেছে সদর্পে
সংহারী মেজাজে
এদিকে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাথায় হাত-
এই জলসমাবেশ ছত্রভঙ্গ হবে কবে
কিভাবেই বা হবে
চলছে মিটিংয়ের পর মিটিং খাওয়াদাওয়া আর
খরচের লিস্ট লম্বা হচ্ছে একটু একটু করে
কিন্তু কোথাও কোন স্পন্দন নেই
ইউরেকা বলে উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠছে না কেউ
এমনকি স্বপ্ন দেখারও সাহস পাচ্ছে না
মিটিংয়ের সুযোগ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া ভারি মাথাগুলি
সবখানে কেমন একটা থমথমে ভাব
শেষে নিষ্কাশন পাইপগুলিকে খুঁচিয়ে
তাদের ভিতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ঘুমন্ত ময়লাদের
বাস্তুচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো মিটিংয়ে
বলা হলো- পাইপগুলিকে অবাধ হতে দিলে
চিরকালের ছটফটে অস্থির জলকে আর রুখবে কে
তখন জলের কাজ জল নিজেই করবে
আর কর্তৃপক্ষও পিছনে ফেলতে পারবে
এইসব অস্বস্তিকর দিন
চারদিকে এখন সাজসাজ রব
শাবল খন্তা বাঁশ লাঠিসোটা- সব নিয়ে পাইপগুলির ওপর
ঝাঁপিয়ে পড়লো মিউনিসিপাল কর্মীরা
ওভারটাইমের বাড়তি টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা
তাদের মনকে করেছে উৎফুল্ল
এখন তারা পাইপের পর পাইপ খুঁচিয়ে চলেছে
আটকে পড়া যাবতীয় ময়লাকে পৃথিবীছাড়া করতে
আর দুই ঘন্টার কাজ করছে চার ঘন্টায়
কয়েকদিনের মধ্যেই পাইপের মধ্যে আটকে থাকা
ময়লাগুলিকে খুঁচিয়ে বের করা হলো
পরীক্ষা করে দেখা গেল এরা সব সাধারণ মানুষের
আলোর মুখ দেখতে না পাওয়া ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ আর স্বাধীনতার মৃতদেহ-
হাজার হাজার লাখ লাখ কোটি কোটি
যেন অবৈধ কোন সম্পর্ক প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে
অপুষ্ট সব ভ্রুণকে হত্যা করে ফেলে দেয়া হয়েছে
সুয়ারেজ পাইপের গোপন ভাগাড়ে
এরা এখন পচা গলা নিহত
এদের আর কোন সম্ভাবনা নেই এবং
এরাই নগরের জমাট জল বাইরে যেতে দিচ্ছে না
এরাই অসহযোগ
সংবাদ সম্মেলনে এসে দুর্গন্ধ আর ঘৃণায় মুখ কুঁচকে
কর্তৃপক্ষ জানালো– বরাবরের মতো এবারো
পাবলিকই নাগরিকদের সব ভোগান্তির জন্য দায়ী
একটা বিছানা কিনেছি
একটা বিছানা কিনেছি আমি
সেইসাথে খাদ্যগ্রহণের জন্য কিছু থালাবাসন
কিছু পোশাক পরিচ্ছদ
আর এইসব রাখার জন্য একটা ভাড়া বাসা
এখন আমি খুব সহজেই বৃষ্টিতে শীতে রোদে আর বর্ষায়
রাতের নিরবতায়
নিশ্চিন্তে কাটাতে পারি আমার দিনগুলি
এইসব কেনাকাটার জন্য আমার খরচ হয়েছে
ঝকঝকে উজ্জ্বল স্বাধীনতা
ইচ্ছার কয়েন
আর ভোরের ঘুম
কিছু পেতে হলেতো কিছু দিতেই হয়- এই প্রথা মেনে
আমার ব্যালান্স শিট তবু মিলছে না
মনে হচ্ছে খরচ অনেক বেশি হয়ে গেছে
আরাম মুচকি হাসছে
কথা বলার সময়
কথা বলার সময় মূলত আমরা প্রতিধ্বনি করি
বুলি ফোটানোর সময় আমাদের যা শেখানো হয়েছিল
কিংবা পরে পৃথিবীর বারান্দায় গিয়ে
আর যাকিছু সব শিখেছি-
সবই কি বোর্ডের অক্ষরগুলির সমষ্ঠির মতো নির্দিষ্ট
আমরা সবাই এই অক্ষরগুলির কাঁধে ভর দিয়ে
জীবন কাটাই
প্রেম করি
ধমক দেই
এমনকি আমরা যা কিছু ভাবি
তারাও নিছক কয়েকটা ভাবনারই প্রোটোটাইপ
কথা বলার সময় মূলত আমরা প্রতিধ্বনি করি
আমাদের মুখ দিয়ে কথা বলছে আমাদের হাজার হাজার পূর্বপুরুষ
আর আমরা তাদের শোনাচ্ছি টিউনিং ফর্কের গান
আমরা নাড়া বেঁধে গান শিখেছি
পোষমানা
শহরের অসংখ্য বহুতল বাড়ির একটাতে আমরা থাকি
আমাদের সাথে আরো অনেক অনেক পরিবার
এই বাড়িগুলিতে থাকে
আমরা সবাই একসময় একটা সবুজ গ্রামে থাকতাম
এখন শহরের নাগরিকদের মনোরঞ্জনের জন্য
আমাদের নিয়ে আসা হয়েছে
আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মনোরঞ্জন করি
আমাদের খাওয়া পড়ার চিন্তা নাই
সব আমাদের বেতন থেকেই হয়
আর না হলেতো ধার বাকি আছেই
আমাদের সবার যাতায়াতের পথ
গন্ডিবদ্ধ একটা নির্দিষ্ট শিকঘেরা দেয়াল পর্যন্ত
শহরের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্যই এটা করা হয়েছে
কেননা তারা কোথায় যেন শুনেছে- বাঘ বুড়া হলেও
খাপ ভোলে না
তবে আমরা যে একেবারে নির্জীব না সেটা বোঝাতে
মাঝেমাঝে নির্দেশমতো ডাক ছাড়ি
শিশুরা এতে কেঁপে ওঠে
মেয়েরা পিছিয়ে যায় এক পা আর পুরুষরা
বাদাম খেতে খেতে হাসতে থাকে তাদের করের টাকায়
তৈরি হওয়া বিনোদনের স্বাদে
মাঝেমাঝে আমরাও ছুটি পাই
তখন আমাদের ছেড়ে দেয়া হয় আমাদের সঙ্গীনিদের সাথে
যেন তারা গর্ভধারণ করতে পারে আর
আগামী দিনগুলির মনোরঞ্জনের প্রয়োজনে
সরবরাহ করতে পারে নতুন নতুন শিশু
তারপর আবার ছুটিশেষে আমার ফিরে আসি
নিজের নিজের গুহায়
আপনারা আমাদের চিনতে পারছেন তো-
আমরা ঢাকা নামের একটা চিড়িয়াখানায় থাকি
পোষমানাদের মতো
আমাদের প্রত্যেকের মুখে
আমাদের প্রত্যেকের মুখে একটা মুখাশ আছে
প্রতিটা মনোহারী দোকানে
প্রতিটা সুপারমলে
নিউমার্কেটে
দেদারসে বিক্রি হচ্ছে এই মুখোশ
আমরা কিনছি আর মুখে লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি
মুখোশটার মুখে বিষণ্নতার বলিরেখা
প্রাণহীন হাসি
আর ভয়ের চিহ্ন আঁকা হয়েছে বিভিন্ন রঙে
মুখোশটার মুখে একটা আর্ত মানুষের পোর্ট্রেট ছাপানো
আমাদের এখন আর আলাদা কোন চেহারা নেই
সম্পর্কের ম্যানুয়াল
জন্ম নেবার কিছুক্ষণ পর শিশুটি গেল তার মায়ের কোলে
এবং ঘুমিয়ে পড়লো
যেন এখনো সে গর্ভের ভিতরেই আছে
তারপর ঘুম ভাঙ্গলে সে পিটপিট করে তাকালো পৃথিবীর দিকে
আর তার পরিচয় হলো আলো বাতাস এবং
আনুষঙ্গিক সব শব্দের সাথে
মায়ের কোলে শুয়ে
তারপর মায়ের কাছ থেকে সে শিখলো মায়ের ভাষা
মায়ের রুচি আর মায়ের গন্ধ
জানলো পৃথিবীর মানুষের মধ্যে মা বলে একজন আছে
যার কাছে পাওয়া যায় মানুষের স্বাদ মানুষের ঊষ্ণতা আর মানুষের প্রেম
এবং এইভাবেই সে ঘনিষ্ট হলো মানুষের
শিশুটি এখন মায়ের কোলের চেয়ে বড়
একটা পৃথিবীর সামনে দাঁড়ানো এক কিশোর
তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন রঙ অনুভব
আর নড়তে চড়তে পারা কিছু জিনিসপত্র
সে তাদের আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে
জিহ্বা দিয়ে চাখে আর মস্তিষ্কের গোপন কোষে
লিখে রাখে তাদের সমুদয় বিবরণ
এবং টের পায় তার চারপাশে এতদিন যেসব মানুষেরা ছিল
পৃথিবী কেবল তাদের নিয়েই না
বরং এই পৃথিবী একটা সীমাহীন এক জগত -
যার আকাশ আছে নক্ষত্র আছে আর আছে
জীবনের অজস্র ধরণ
আর নিজের জীবনে এই প্রথম সে টের পেলো নিঃসঙ্গতা-
তার একাকী ক্ষুদ্রতা
তারপর একদিন এই নিঃসঙ্গতাই কিশোরটিকে পৌছে দিল
জীবনের যুবক বয়সে
এবং সেই বয়স তাকে এনে দিল বন্ধুত্ব সাহস আর যৌথতার দিন
এনে দিল নারী নামের একটা পরিচিত শব্দের নতুন অর্থ
বিষণ্নতা এবং প্রেম
ক্রন্দন ও দুঃখ
নিঃসঙ্গতাও এখন তাকে দেখাচ্ছে অন্য এক মুখ
শোনাচ্ছে যুগ্মতার ইতিহাস-
আরেকটা নতুন সম্পর্কের গাথা
এই সম্পর্ক আলিঙ্গনের আশ্লেষের আর সমর্পনের
বিচ্ছেদের ও মাধুর্যের
এখন চারপাশে ছড়ানো বিরাট পৃথিবীটাও
আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যাচ্ছে একটা খড়কুটার বাসায়
যেখানে ঘনিষ্ঠতা অপেক্ষা করে আছে
অপেক্ষা করছে ভালোবাসা
এবার একটা আকাঙ্খার ভ্রুণের জন্ম হবে
আর সেই ভ্রুণের মধ্যে বড় হয়ে উঠতে থাকবে
তার নিজের তৈরি করা জীবন
সেই জীবন হাসবে কাঁদবে চিৎকার করে জানাবে নিজের উপস্থিতি
কিশোর হবে যুবক হবে তারপর নিজেও রচনা করবে
নিজের সাধ
বারবার...























