অমিতাভ পালের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : জুন ০২, ২০২০

মানুষ বিষয়ক একটি থিসিস

ওরা অমেরুদণ্ডী
ওরা চোখে দেখে না কানে শোনে না কথা বলে না
ওরা মাটির নিচে থাকে আর গর্ত করে
ওরা চাষি

আরেক দলের পেশী লোহা লক্করের
যন্ত্রের জীবনের মতো ওদের জীবন
নিজের ওজনের ছয়গুণ বোঝা টানলেও
ওরা কখনো ক্লান্ত হয় না
পোকার মতোই ওদের ছয়টা পা
আর মাথা বুক পেট
ওরা শ্রমিক

এই দুই দলেরই মাথার ওপর জাল পেতে বসে আছে
একদল আটপেয়ে মাকড়
এদের জাল খুব আঁঠালো

মাস্ক

ঝোঁপের আড়াল থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে
দুইটা গভীর চোখ
তারা আমাকে দেখছে
আমার নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছে
ভাবছে আমি বিপদজনক কিনা
আর আমি চারদিকে তাকিয়ে খুঁজছি একটা জুতসই শিকার
এক গুলিতে ঘায়েল করবার আশায়

এই কবিতায় আমাকে তোমরা করোনা ভাবতে পারো
আর ঝোঁপের আড়ালের ওই চোখ দুইটি
যেন মাস্ক পরা কোনও ভয়ার্তের

মাস্ক আমাদের চোখগুলিকে স্পষ্ট করে দিয়েছে

ব্লাস্ট

ঝিনাইদহে ধানগাছে ব্লাস্ট রোগের কারণে হাহাকার করছে কৃষকরা
ক্ষুধা অভাব ভয়— সব সম্মিলিতভাবে এই হাহাকারের সাথে বাজাচ্ছে যন্ত্রসঙ্গীত
এক ভয়াবহ মাতমে ভরে যাচ্ছে মানুষের মন গ্রাম শহর
আর ব্লাস্টের জীবাণু হাসছে ভিলেনের মতো
এবার আসুন— এই হাহাকারটাকে ফিল্টার করি
ছাঁকনির ফুটা দিয়ে নিচে ফেলে দেই এইসব মাতম আর পোঁ
দেখবেন ছাঁকনির পরতে পরতে আটকে আছে আরেকটা মৃদু কান্নার শব্দ
এই কান্না এক সন্তান হারানো মায়ের— একটা ধানগাছের

এই ধানগাছেরা আরেকবার কাঁদবে—
পাকা ফসল কেটে ঘরে নিয়ে যাওয়া কৃষকরা
যখন সিদ্ধ করতে বসবে ধান
সন্তান হারানোর কান্না আবার বাজবে খড়ের গাদায় গরুর পেটে ঘরের চালে

করোনার মহামারিতে আমরাও এই ধানগাছগুলির মতো কাঁদছি
অশ্রুত এই ক্রন্দন চাপা পড়ে যাচ্ছে অর্থনীতির হাহাকার
পোশাক শিল্পের বেদনা আর দোকানপাটের আর্তনাদের নিচে
আমাদের কোনও প্রণোদনা কিংবা গণমাধ্যম নেই

ওদিকে মৃত্যু ত্রাণশিবির খুলেছে বিভিন্ন কবরখানায়

রিজার্ভ

আমরা সমানে জৈব পদার্থ সঞ্চয় করছি
বন্যা দুর্যোগ রানা প্লাজা সড়ক দুর্ঘটনা করোনা—
সব আমাদের ঢেলে দিচ্ছে অসংখ্য মৃতদেহ
আর তারা মাটির নিচে গিয়ে ঊর্বর করে তুলছে আমাদের দেশের মাটি
আমাদের উৎপাদন ঠেকায় কে

আমাদের সন্তানরা এবার প্রতিবেলায় দুধভাত খাবে

চতুর্দশী

আমার গ্লাসটপড ডাইনিং টেবিলটার চকচকে মুখ
আজকাল খুব মলিন দেখায়
ডিনারে কোনও হৈহুল্লোড় করে না চারপাশের চেয়ারগুলি
সবার মনে এক আসন্ন দুর্ভিক্ষের ভয়
অবশ্য এরই মধ্যে এর ছাপ পড়তে শুরু করেছে ডাইনিং রুমে
পদের সংখ্যা কমছে
গামলা বাটিরা অনেকেই চলে গেছে আলমারির গ্রামে
রান্নাঘরেও কোনও আর্তনাদ কিংবা চিৎকার নেই
স্যাঁতলানো মাছ সবজির—
আমাদের বাসাটা আজকাল খুব নীরব
কুকুরের ডাকহীন লকড ডাউন পাড়াগুলির মতো

আমাদের গলিতে মৃত্যু আর আতঙ্কের ক্যাডাররা ঘুরছে