আবু তাহের সরফরাজের পাঁচটি কবিতা

প্রকাশিত : অক্টোবর ২৪, ২০১৭

আমার মৃত্যু

রাত্রি তোমার নিকষ কালো অন্ধকারের থাবা
ভয় করি না, আমার বুকে সুরক্ষিত কাবা।

ইটের ওপর ইট সাজানো ইট মানে ঈমান
বিশ্বাসে তার দৃঢ়তা আর চরিত্রে ধীমান।

সমাজ এবং মানুষ নিয়ে আবার সামাজিক
এক মানুষের ভাঙাগড়া, এই তো নানাদিক।

রাত্রি আমি নতজানু বিনয় এবং ধ্যানে
হঠাৎ হঠাৎ ভাঙে সে ধ্যান, হঠাৎ পাওয়া জ্ঞানে।

জ্ঞান তো আছে নানারকম, বিভিন্ন তার মানে
সকল জ্ঞানের দাড়িপাল্লা সব মানুষই জানে।

রাত্রি আমার বুক পকেটে ভোরের সুর্যোদয়
দূর নীলিমার বুকেই যেন আমার মৃত্যু হয়।

 

মিলে আর মিশে

মিলে আর মিশে তারা
     দুইজন দেহ ছাড়া
          আত্মা কি বায়বীয়?
               বিষয়টা মরমীয়।
                    মিলেমিশে দুই দেহ
                         এক হলে, সন্দেহ
                              আত্মায় কান পেতে
                                   দেহ ফুঁড়ে চায় যেতে।
                                        পাঁচভূত এই দেহে
                                             থাকতেছে সন্দেহে।
মিলেমিশে নেড়ে ঘাড়
     বলতেছে, যার যার
          জগৎটা বহুরূপী
               বলে রাখি চুপিচুপি।
                    যে দ্যাখে যেই চোখে
                         জগৎটা ভাবে লোকে
                             এই তো...
                                  যার যার আয়নায়
                                       জগতের ভাবনায়
                                          সেই তো...
মিলে আর মিশে তারা
     জগৎটা করে ভাড়া
          এরপর গোলগাল পৃথিবী নিয়ে
               ফুটবল খেলে তারা মাঠ পাড়ি দিয়ে
                    মাঠে মাঠে ছড়ানো কত কত গ্রহ
                         আয় তো, এইসব করি সংগ্রহ...

ধ্বংসের গান

লাল মোরগের কণ্ঠ চিরে           ফুটতেছে লাল ভোর
ডেকে হয়রান বধু হে পরাণ         রাত কেন ঘনঘোর?
জ্যোছনা গলে হতেছে তরল          দ্রবীভূত শীতরাত
হিমে ভিজে যায় সাপিনীর দেহ       প্রেমিকের দুই কাঁধ।
দুই কাঁধে দুই দেবদূত খাঁড়া         ঘুম তো আসে না ভবে
সাপিনীর দেহ চকচকে আর         পিচ্ছিল কেন হবে?
বিস্ময়ে দেখি, লাল বিছানায়        সাপিনীর গড়াগড়ি
শীতের শীৎকার শুনে আমি তার    বক্ষ চাপিয়া ধরি।
মুখ ঘষি তার শীতল ফণায়        চুমু খাই তার ঠোঁটে
বিড়বিড় করে বলি খুব প্রেমে,      গোলাপ কেন গো ফোটে?
আমাকে তুই গিলে ফ্যাল সখা       আরো লাল দে আমাকে
যত লাল আছে এই ভবদহে         সাঁইজি বাড়ির তামাকে।
জ্যোছনার রঙ হতেছে তরল        মাতাল তরণী বেয়ে
আসতেছে র‌্যাঁবো, সাপিনীর ফণা    ফোঁস ফোঁস আসে ধেয়ে।
রাতের পোশাক খুলে ফেলো হে       ন্যাংটো রাত্রি দেখি
লাল শরাবের নেশায় চড়ে          ধ্বংসের গান লেখি।
                  শরাব দাও গো সাকি
                  রাতের এখনো বাকি...

আমাকে তুই খেয়ে ফ্যাল

আমাকে তুই খেয়ে ফ্যাল রিপা     হজম করে নে পেটে
ভবে দিগদারি আলাঝালা লাগে    কী হবে হৃদয় ঘেটে?
হৃদয়ের খুব ভেতরে গোলাপ      ফুটে আছে নিশ্চুপ
দৃশ্যত সে অদৃশ্য আর          টকটকে লাল খুব।
আমি তো ফুলের ভেতর জন্ম     নিতে চাই এই ভবে
এই ফুল দিয়া প্রেমিক তোমার    নিকটবর্তী হবে।
রক্তকোরক হৃদয় ক্ষরিত        অন্তর্গত খুন
অস্ফুট স্বরে প্রার্থনা করো,      ইন্না... হি... রাজেউন!
আমি তো দেখে ফেলেছি সে লাল  মুগ্ধতা তাই ভবে
গোধূলিরাঙা নদীর তীরে       আমাদের দ্যাখা হবে।
আমাকে তুই মশলা মাখিয়ে     সুস্বাদু কর দেখি
এই রন্ধন শিল্পকাহিনি         পদ্য আকারে লেখি।
যত স্বাদ তোর জিহ্বায় আছে    চেখে দ্যাখ ভবে দেহ
কাঁটা চামচের কাঁটায় গেঁথে     খেতে থাক সন্দেহ।
আমার হাড়ের ভেতর দিয়া     প্রবাহিত মজ্জা
খেতে থাক বধু, কৃষ্ণপক্ষে      ঢাকা থাক লজ্জা।
কবরখানায় মাঝরাতে একা     জেগে ওঠে ছায়ানারী
হাতে তার হাড়, শিঙার মতো  ফুৎকার ওঠে তারই।
খুঁজে আনে সে নাভির অস্থি    চিতা যা করেনি দাহ
প্রাণের কেন্দ্র ভর করে বায়ু    অথচ তা হিমবাহ।
এই আস্বাদে রক্ত ফেনায়       ধোঁয়া কেন ওঠে বধু?
হাড়ের ভেতর মজ্জার স্রোত     চেটে দ্যাখ, পাবি মধু।
আমাকে তুই ভেজে ফ্যাল সখা   গরম তেলের কড়াইয়ে

তোর চোখে চোখ, চেয়ে আছি দ্যাখ     তেলের ভেতর গড়ায়ে।
আমাকে তুই এইভাবে বধু            রেঁধে ফ্যাল তাড়াতাড়ি
নীলিমা খাতুন হাসতেছে আর         পরতেছে শাদা শাড়ি।
শাড়ির ভেতর লুকনো অস্ত্র           বিষ মাখানো তাতে
এসব জেনেও ভয়ে শীৎকারে         হাত রাখি তার হাতে।
আমার হাতের নিচ দিয়া নদী        বয়ে যায়, আর দ্যাখো তুমি যদি
আমাকে তবে মশলা মাখিয়ে         খেয়ে ফ্যাল প্রিয়তমা
আমি তো শূন্য হৃদয় নিয়া          চাইতেছি ভবে ক্ষমা।
শূন্য হৃদয় মন্দিরে                মানুষ কেন বন্দি রে...!

মৃত্যুর মতো সত্যি      

মৃত্যু আমাকে ডেকে নেবে ভবে          অনিবার্য সে, তাই
তুমিও আমাকে ডাক দেবে ভেবে         কিছু আনন্দ পাই।
এই যে সত্যি নিয়া জীবপ্রাণ            ভবে ঘুরতেছে আবছায়া ম্লান
নানা রঙছবি এঁকে তুমি তার          এঁকে দাও তো, কিছু হাহাকার!

তুমি আর আমি পৃথিবীর ছাদে         গন্ধম খেয়ে পা দেব ফাঁদে
বিতাড়িত হবো গ্রহ থেকে গ্রহে          এইসব ছবি রেখো সংগ্রহে।
আমাকে বলো তো, তুমিও আমাকে      মৃত্যুর মতো ডাকবে
গাঢ় বেদনায় ফুটিবে হে ফল            জ্ঞানযোগ তাতে থাকবে।

ডাকবেই তুমি, নির্ধারিত হে           মৃত্যুর মতো সত্যি
অনিবার্য এই নিয়তির খাতা           শূন্যতা দিয়ে ভর্তি।
বলো তো নীলিমা, পৃথিবীর সীমা       কোথায় গিয়েছে ঠেকে?
তারও ওইপারে জগতের ছবি          দ্যাখাও তো কিছু এঁকে।

সংশয় নয়, শূন্যতা ভেঙে            ডেকে নাও বিবিজান
মৃত্যু যেমন ডাকবে হঠাৎ            দেহ ছেড়ে যাবে প্রাণ।
মৃত্যু যদিও অমোঘ রাত্রি             অসীমের গহ্বর
তবু তা সত্যি, তুমিও এমন          ডাকো তো জাতিস্মর।

ঘোর ঘোর চাঁদ, আর নিচে তুমি      অন্ধকারে একা
বলো তো নীলিমা, এই অনুভূতি       কার কলমের লেখা?
আমাকে বলো তো, আয়নার দেশে     আছেন কে জাদুকর
প্রতিদিন তার সাথে দ্যাখা হয়        পাশাপাশি কার ঘর?

সুন্দর থাকে গোপন গুহায়           সব মানুষের দেহে
যদি চিনে থাকো, অনিবার্য তা       বাধা দেবে আর কে হে?
মৃত্যু আমাকে ডেকে নেবে বুকে       তুমিও এমন হও
নিশ্চিত থাকি, তুমি ও মৃত্যু        আলাদা কিছুই নও।
আমি তোর ঘ্রাণে উন্মাদ হবো       হেঁটেই বেড়াবো ভবে
ডাক দিবি তুই, কথা দে, নইলে     উলটপালট হবে।