অলঙ্করণ: পাপিয়া জেরিন

অলঙ্করণ: পাপিয়া জেরিন

আবু তাহের সরফরাজের প্রেমের কবিতা

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৪, ২০১৮

দুই মানুষ

দুই মানুষের হাঁটাচলা
আগুন এবং শিল্পকলা
দুই মানুষের ঘর
কাঁপতেছে থত্থর।

এক মানুষের ইচ্ছেগুলো
পথের বারুদ পথের ধুলো
আরেক কণ্ঠস্বর
তবু, মাথার ওপর ঝড়।

আরেক মানুষ শস্যমোদির
গেরস্ত সে, হয় না অধীর
তৈরি করে ঘর
তবু, ভাঙে তাহার পর।

দুই মানুষের পরম্পরা
শরীর ভেঙে শরীর গড়া
শিল্পিত সুন্দর
তবু, দ্বন্দ্ব পরস্পর।

দম্পতি

আহত ব্যাকুল নক্ষত্রেরা
ঘুম ছড়িয়ে দিচ্ছে
টগর-নোলক দম্পতি এক
তাই কুড়িয়ে নিচ্ছে।

ঘুম কুড়ানো মহৎ রীতি
ঘুমেই তো আশ্রয়
একজীবনে বয়েস কিছু
হয় যদি সাশ্রয়।

জঙ্ঘমে আর ঘামের দেহে
দাঁড়াচ্ছে ওই নারী
খুলতে হবে খেতের বেড়া
ফসল তোলা গাড়ি।

ঘরের ভেতর উঁইয়ের ঢিবি
খেতে এবার খরা
নারী হচ্ছে প্রশ্নবোধক
যায় না তাকে পড়া।

ঘুম ছড়ানো মাঠের ওপর
ঘুমোচ্ছে দম্পতি
শরীর জেগে আছে তবু
নেই কারও সঙ্গতি।

ঘর ভাঙে না, মানুষ ভাঙে
ভাঙাই সহজ রীতি
ঘুম কুড়োতে মাঠে এসে
কুড়োয় তারা স্মৃতি।

শিল্পাঞ্চলে তোমার বাড়ি

শিল্পাঞ্চলে তোমার বাড়িটি কাঠের দোতলা, বেশ ছিমছাম আর নিরিবিলি
গাছপালায় ঘেরা... ঝুলবারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যায় নদী, তাই
প্রতিদিন তুমি দাঁড়িয়ে থাকো ঠিক গোধূলির সময়টায়
শিল্পাঞ্চলে শিল্প হয়ে তুমি দাঁড়িয়ে থাকো চোখের উদাস দৃষ্টি ছড়িয়ে
শিল্পাঞ্চলে আর যারা যারা থাকে, শিল্পের সুষমা তারা বোঝে না
ফলে তাদের হৃদয় আজ ঘাস; শরীরের ছায়া হয়ে তারা ঘুরে বেড়ায় শিল্পাঞ্চলে
আর আমি বেঁচে থাকার সৌন্দর্যশিল্প হারিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখি,
শিল্পাঞ্চলে মানুষেরা শরীরের ভাঁজ খুলে, হৃদয় খুঁড়ে বের করে আনে খুচরো পয়সা
ভীষণ চকচকে আর লোভনীয় জীবনের এই জৌলুস, শিল্পাঞ্চলে তাই
জীবন অর্থনৈতিক এক যন্ত্রের নাম, বিষাক্ত কেমিকেল দেয়া কাঁচাবাজারের
সবজির মতো দীর্ঘস্থায়ী মানুষের কৃত্রিম অনুভূতি, সতেজ আর টাটকা

শিল্পাঞ্চলে আমি হেঁটে বেড়াই আর দেখি, শিল্পাঞ্চলে তুমি যেন স্বয়ম্ভু
সুন্দরের একক, ফলে আমার মুগ্ধতা বাড়ে
হৃদয়ের টলটলে আয়নায় আর কোনও সুন্দর থাকে না. তোমাকেই
কেবল মনে হয় প্রাকৃতিক। তোমাকেই মনে হয় শিল্পের উৎস
অনন্তে বয়ে যাওয়া রক্তস্রোত। শিল্পের ইতিহাসে তাই তুমি কবিতার রক্তমাংস
এবং শব্দের কাঠামো।
তোমার ঝুলবারান্দাকে আমার মনে হয় পৃথিবীর নির্জন কোনও দ্বীপ
যখন চেয়ে থাকো গোধূলির আকাশে
মনে হয়, তুমি যেন নক্ষত্রনারী। নীলিমার নীল শাড়ি পরে আছো, কানে
টলটলে শিশিরের দুল।

শিল্পাঞ্চলে গোধূলি রঙের বাড়িতে তুমি সবুজ নিসর্গ, দিগন্তের নীলিমা
যখনই দ্যাখা হয় আমি চেয়ে থাকি চুম্বকচোখে আর টের পাই,
হৃদয়ের খুব ভেতরে ঘটে চলেছে রক্তক্ষরণ
আমার স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে চলেছে যেন শিল্পের উড়োজাহাজ
থত্থর কেঁপে ওঠে হৃদপি- আর কাঁপতে থাকি আমি
প্রতি মুহূর্তের রক্তক্ষরণ
প্রতি মুহূর্তের অনুভূতি
শব্দের গাঁথুনি দিয়ে আমি বুনতে থাকি, আসলে
আমার কবিতার ভেতর তোমার শুরু আমার কবিতার ভেতর তোমার শেষ।
শিল্পাঞ্চলে শিল্প সৃষ্টির উত্তেজনা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে দিনের পর দিন
রাতের পর রাত স্বপ্নের ভেতর আমরা মুখোমুখি বসে থাকি। কথা বলি না
শুধু বুকের ফিসফাস শুনতে পায়। আর তখন মুখ নয়,
আমাদের ঘিরে থাকে মুখরতা।

শিল্পাঞ্চলে তোমার বাড়িটি কাঠের দোতলা, বেশ ছিমছাম আর নিরিবিলি
গাছপালায় ঘেরা... ঝুলবারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যায় নদী, তাই
প্রতিদিন তুমি দাঁড়িয়ে থাকো ঠিক গোধূলির সময়টায়, আমিও
তোমার উদাস দৃষ্টি ছুঁয়ে এক সূর্যাস্তে বললাম, এসো, পান করি জীবনের দ্রাক্ষারস
চুপ থাকলে তুমি। চাঁদ উঠল শিল্পাঞ্চলের মাথায়
আকাশে সংখ্যাতীত গ্রহ-নক্ষত্র, যার কোনো কোনোটা কয়েক হাজার বছর আগে  মরে এতদিনে হেজে গেছে, আর তার আলো এখন এসে
ঝলমল রাঙিয়ে তুলছে শিল্পাঞ্চল; শিল্পাঞ্চলে তুমি শিল্প
তাই হালকা স্বরে বললে, আমার ভয় করে। জিগেশ করলাম, কীসের ভয়?
বললে, তা তো জানি না। তবে কী যেন এক দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব।
আমি বললাম, দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব দুজনেই অন্ধ।

আরকিছু তুমি বললে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলে নীলিমার নক্ষত্রের দিকে চেয়ে
শিল্পাঞ্চলে তোমার বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ আমি উপলব্ধি করলাম,
শিল্পাঞ্চলে হৃদয়ের কারখানায় যে যে শিল্প আমি এতদিন সৃষ্টি করেছি
গল্পে আর কবিতায়, তুমি ছিলে সেসবের কাঁচামাল।
তোমার ভেতর সুন্দরের শেষ উপাদানটুকুও আমি বের করে নিয়েছি।
তৈরি করেছি অনুধ্যানের শিল্প। সুতরাং শিল্পাঞ্চলে কাঠের ছিমছাম দোতলা
বাড়িতে তুমি এখন সুন্দরের ছিবড়ে
বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারলেও, তুমি তা নিশ্চিত জানো।

আমার মৃত্যু

রাত্রি তোমার নিকষ কালো অন্ধকারের থাবা
ভয় করি না, আমার বুকে সুরক্ষিত কাবা।

ইটের ওপর ইট সাজানো ইট মানে ঈমান
বিশ্বাসে তার দৃঢ়তা আর চরিত্রে ধীমান।

সমাজ এবং মানুষ নিয়ে আবার সামাজিক
এক মানুষের ভাঙাগড়া, এই তো নানাদিক।

রাত্রি আমি নতজানু বিনয় এবং ধ্যানে
হঠাৎ হঠাৎ ভাঙে সে ধ্যান, হঠাৎ পাওয়া জ্ঞানে।

জ্ঞান তো আছে নানারকম, বিভিন্ন তার মানে
সকল জ্ঞানের দাড়িপাল্লা সব মানুষই জানে।

রাত্রি আমার বুক পকেটে ভোরের সুর্যোদয়
দূর নীলিমার বুকেই যেন আমার মৃত্যু হয়।