চিত্রকর্ম: ভ্যান গঘ
আবু তাহের সরফরাজের বিরহের কবিতা
প্রকাশিত : এপ্রিল ২১, ২০১৮
আরও কয়েকটি নিঃশ্বাসের জন্যে
বেশি তেমন কিছু নেই যা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারি
ঝিরঝির বিষটি দেখতে দেখতে
একটি কবিতা লিখতে লিখতে
কেউ কেউ তো বেঁচে থাকতেই পারে
চারদিকে মানুষের কোলাহল
ত্রস্ত নীলিমার নিচে ভেঙে পড়ে চারিত্রিক খুঁটি
মানুষ হাসে
দাঁতগুলো ধারালো, আর মুখের ভেতর থেকে
ছুটে বেরিয়ে আসতে থাকে কথার বাণ
মানুষ পুলসিরাত পেরোচ্ছে
অথচ মানুষ বুঝতেও পারছে না জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানে
বাঁশের নড়বড়ে একটা সাঁকোর ওপর সে দাঁড়িয়ে আছে
অথচ দ্যাখো, কী লাফালাফিটাই না সে করছে
আরও কয়েকটি নিঃশ্বাসের জন্যে মানুষ চোখের রঙও বেচে দিচ্ছে।
এমনও দিনে চলে যাওয়া ভালো
যাচ্ছি তবে, যাই
পেছনে সবুজ সবুজ গ্রাম, গাছপালা
বিজন নদীর ওপর মরাপাতা...
যুবক দাঁড়িয়ে আছে চেনা কোনও যুবতীর মুখে
থুতু ছুঁড়বে বলে
যুবতী দাঁড়িয়ে আছে চেনা কোনও যুবককে
ভেলকি দ্যাখাবে বলে
কাক চিল আর শকুনের মতো
উঠে দাঁড়াচ্ছে কৃষি-সন্তানেরা
সার দিয়ে বের হয়ে আসছে শিল্প-সন্তানেরা
কারখানার ধোঁয়া বন্ধ হয়ে গেছে
ঘুঙুর হাতে মেয়েটি ভাবছে, নাচবে না এই দৃশ্য দেখবে
এইভাবে চলে যাওয়া সহজ, বলোনি তো হে
আহা, নরম রোদের দিন
হাওয়ার জীবন
এমনও দিনে তবে চলে যাওয়া ভালো
শুনুন, যাচ্ছি তবে।
গোলকধাঁধা
কোথাও শূন্যতা তৈরি হয়ে আছে আমার জন্যে
আমি গেলে এরপর পূর্ণ হবে
যেতে পারছি না তবু কোথাও
ধু ধু শূন্যতা
গোলকধাঁধা
রঙের এক চক্র কেবলই
অসীমের পথে আমাকে দেরি করিয়ে দ্যায়।
কখনও কখনও মনে হয়
আমি হয়তো জীবনকে বহন করতে পারিনি
জীবন তো আসলে নানা রঙে তৈরি একটা ফানুস
আমি যে তার হঠাৎ জ্বলে উঠে
আবার হারিয়ে যাওয়া দেখেছি!
আমি তাই একজীবন নির্ভার থেকে গেলাম।
মরুরাত্রির ঝড়
উটের গ্রীবার নিচে মরুরাত্রির ঝড়
বয়ে যায়, আর কাঁপে থত্থর।
কাঁপতেছ তুমি
সমতল ভূমি
পেরিয়ে এসেছো বলে
পৃথিবীর আদি
বাদী ও বিবাদী
বাস করে স্থলে।
তোমার গ্রীবার নিচে শীতের দৃশ্য
মুগ্ধতা হয়ে বধূ মুছে দ্যায় বিশ্ব।
ভাবো তো এবার
দৃশ্যে কে আর
দৃশ্যায়িত থাকে!
ইথারে ইথারে
ভেসে থাকা ছবি
ভ্যানগগ কেন আঁকে?
গোধূলির নদী
আমাদের খুব কাছাকাছি এক নদী আছে গোধূলির
ঝিরঝির তার ঢেউগুলি আর ¯িœগ্ধ দুই তীর।
গোধূলির মুখোমুখি দ্যাখা সূর্যবানের সাথে
গোধূলির মধ্যে দিয়ে সে এসে দাঁড়ালো ওইপারে
নেমে এলো পানির কাছাকাছি
আর, এইপারে আমি বসে আছি।
পানিতে সাঁতরে চলা হাঁস
ডেকে ডেকে তুলে নিল সে
এরপর হাঁসের পিছু পিছু গোধূলিরঙা মেয়েটি চলে গেল
হাঁসেরা সূর্যবানের বাড়ি নিয়ে গেল ডানায় লেগে থাকা
গোধূলিরাঙা নদী
আমাদের খুব কাছাকাছি এই নদী
আমাদের খুব ইচ্ছে হলো তাই
নদী সাঁতরে যাওয়ার
আমাদের নদী উত্তেজনায়
কাঁপতেছে তিরতির
সূর্যবান স্রোতোস্বিনী, এখন
আমার উন্নত হবে শির।
ফেনায়িত জল
নদী টলোমল
এরপর ঘুঘুর ডাক নদীতীরে একটানা।
বিদায়পর্ব
সে চলে যাচ্ছে- ওই মেয়েটি, এই যে দুপুর সঙ্গে নিয়ে একা একা
চলে যাচ্ছে ছায়া ফেলে যাবে বলে
শ্যাওলা ধরা দেয়াল, ভাঙা জানলা আর চেনা মানুষের মুখ
গলির বাতাসে কিছু পুরোনো গন্ধÑ নতুন কণ্ঠ
শরীর নিয়ে চলে যাচ্ছে যে
মাদুরে শুয়ে থাকা ভঙ্গি বদলে নিয়ে
এই যে বিদায়- দুপায়ে
এ বিদায়ে তোর কোনও অংশগ্রহণ নেই।
তুই কেন ডাক দিলি...
তুই কেন ডাক দিলি তোর নিজের ভাষায়?
ছেলেটির হাতে বারুদ
আর মেয়েটি প্রসবোত্তর বিপ্লব।
তুই কেন পেতে চাইলি ওই আগুন
লাল তোর স্বপ্নের রঙ তবে
প্রেমেরও?
রবিশংকর বল
ঘুমের ভেতর লুকিয়ে ছিল পান্থ
ঘুম ভেঙে আর পাই না তাকে
যে আমার কথা জানতো।
রাতবিরেতে ডাকছে ডাহুক
বাঁশবাগানে চাঁদ
যাচ্ছি, তবে যাবার আগে
খুলতে হবে ফাঁদ।
চেনা মানুষ বসতভিটে রক্তবীজের ফল
আড়াল থেকে চেনান সবই রবিশংকর বল।
প্রেমের ভ্রুণ
এই প্রেম পাথরের ভেতর থেকে এসেছে। জগতের রোদ-হাওয়ার বাইরে পাথরের খুব ভেতরে ছিল প্রেমের ভ্রুণ। এরপর কত কত কোষ বিভাজন হয়ে, কীভাবে কীভাবে যেন সে প্রাণ পেল। এরপর লতার মতো পেঁচিয়ে উঠে এলো আমাদেও শরীরে। বিভাজনের প্রতিটি বাঁকে যে যে স্মৃতি, এই প্রেম তা ছড়িয়ে দিল আমাদের ভেতর। আমরা তাই দুজন দুজনকে মুগ্ধতার কথা বলাবলি করলাম। এবার এসো, পরস্পরকে আমরা খুন করি। আর দেখি, আমাদের রক্ত থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে... এরপর রক্তের কোষে সঞ্চিত স্মৃতি ওম শান্তি হয়ে যাচ্ছে...























