আবু তাহের সরফরাজের সুফিকবিতা

প্রকাশিত : আগস্ট ১৩, ২০১৮

আমি কী আর জন্মেছিলাম

আমি কী আর জন্মেছিলাম
মানুষ হিশেবে?
জন্মেছিল আবু তাহের
এই লোকটা কে?

মুখ চিনি না তবু মুখের
আদল ধরে হাঁটি
শরীর খুলে বাইরে এসে
ছায়ায় পরিপাটি।

আমি হয়তো ছায়ার মানুষ
শরীর আরেকজন
তার শরীরেই আড়াল হয়ে
বাঁচার আয়োজন।

কার সে জীবন আমার কাঁধে
আমি-ই যে হায় কার
একই সাথে খাচ্ছি-দাচ্ছি
ঘুমোচ্ছি আবার।

আমার যে, সে কোথায় থাকে?
কোথায় বাড়িঘর?
তার সাথে কী বদলেছে এই
আমার টিনের ঘর?

আবু তাহের সরফরাজ

আমার নাম আবু তাহের সরফরাজ
আমি একটি প্রাণ
মহাপ্রাণের একটি অংশ আমি
যদি আমি এই বাক্য লিখি, আমার নিরাপত্তা কোথায়
এরপর কী চিহ্ন দেব
তা নিয়ে ভাবনা এলো, এলোমেলো

আমার নিরাপত্তা কোথায়?
আমার নিরাপত্তা কোথায়!
একই বাক্য দুরকমের মানে প্রকাশ করছে কেবলমাত্র যতিচিহ্নের কারণে
আমাকে দোলাচ্ছে দুটো বাক্য
প্রশ্নবোধক চিহ্ন তীরের ফলার মতো ছুটে এলো আমার দিকে
বুঝলাম, প্রশ্নবোধক মানে কাউকে দোষারোপ করা
মহাপ্রাণ প্রবাহের এই অনন্ত মহাবিশ্বে
দোষ আর অদোষের কোনও ভাষাই
                                              খুঁজে পেলাম না
অতএব, ফিরে এলাম বিস্ময়কর চিহ্নের কাছে
অনন্ত মহাবিস্ময়ের মধ্যেই যার হারিয়ে যাওয়া...

দুই পথিক

দুই পথিক চলেছেন রাস্তা দিয়ে, খা খা দুপুর
ঝলমলে রোদ আর ছায়ার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে রাস্তা, যেন
তারা হাঁটছেন আর তাদের পায়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে রাস্তা
আর দুই পথিক হারিয়ে ফেলছেন পেছনের পথ

যেন তারা পর্যটক
তাদের ঝুলি ভরে ওঠে জগতের টুকিটাকি দিয়ে
যেতে যেতে তারা ক্লান্ত হয়, বসে
গোধূলি-নদীর তীরে

তারপর তাদের ঘুম পায়, তবে তারা উঠে পড়ে নদী পেরোবে বলে
দুই পথিক সাঁতরে নদী পেরোতে থাকে
তবে একজন ডুবতে থাকে
তার ঝুলিতে জগতের এত ভার যে, সে ডুবতে থাকে
আরেক পথিক দিব্যি সাঁতরে যেতে থাকে, কেননা

পৃথিবীর কিছুই সে জমা করেনি, তার
অস্তিত্বের অনুভূতি ছাড়া।

পৃথিবীর পথে পথে

আমি মারা যাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি মৃত্যুদূত
বিশাল দুই ডানায় ভর দিয়ে ছুটে আসছেন আমার দিকে
তারমানে আমি মরে যাব, আর কিছু সময়

এরপর আমি আর বেঁচে থাকব না, এতদিন
কত কত মৃত্যু চোখের সামনে দেখেছি
দেখেছি কীভাবে কতভাবে মানুষ মরে যায়
এইসব দেখতে দেখতে এইসব ডালভাত মনে হতো এতদিন

এখন আমি দেখছি, ওই তো
আমার মৃত্যু ছুটে আসছেন আমার দিকে
আমি ভয়টয় পেলাম না, হাহাকার টের পেলাম
চোখের সামনে দেখতে পেলাম ছায়াবীথির মুখ
রিপা খাতুনের মুখ, এক চিলতে ছায়ার মতো আমার বসতভিটে

আমি মারা যাব। যেতে তো হবেই, তবে
কীভাবে হে চলবে আমার ফেলে যাওয়া সংসার?
কে তাকে ঠেলে নেবে নাভিশ্বাস তুলে?
আল্লাহ?
আমি কি সারা জীবনে তার প্রতি একাত্ম হতে পেরেছি?
পারিনি তো হে, তবে কেন আমি তার কাঁধে তুলে দেব আমার বোঝা?
অথচ এই বোঝা বইতেই আমি আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে
বন্দি থাকলাম এই মহাবিশ্বের ছোট্ট এক বিন্দুর ভেতর
চোখ তুলে দেখলাম না পর্যন্ত জগৎ-সংসার, আর এখন
বুঝতেছি, এক জীবন দিয়েও আমি নিরাপত্তা তৈরি করতে পারিনি

ওই তো ছুটে আসছেন মৃত্যুদূত
আমি বুঝতেছি যে. পৃথিবীর পথে ঘুরে আশা-আকাঙ্ক্ষার রেণু
পথে পথে ছড়ানোই আসলে মানুষের কাজ, এছাড়া
মানুষের আর তো বিশেষ কোনো কাজটাজ নেই
পৃথিবীর পথে পথে...

প্রতিটি জ্ঞানই এক একটি বিভ্রান্তি

প্রতিটি জ্ঞানই এক একটি বিভ্রান্তি
কেননা তা জগৎ ও মানুষের নিজের বিষয়ে
অনেক মত আর চোরাগোপ্তা নানা পথ তৈরি করে
তারমানে, যত জ্ঞান তত গোলোকধাঁধা  
আজ পর্যন্ত বিশেষ কোনো মতে একপথে পৃথিবীর সব মানুষ হাঁটেনি
হাঁটলে পৃথিবীর আরেকদিক হেলে পড়ত
আর তাই
জগতে চূড়ান্ত কথা কিছু নেই
জ্ঞান মানুষকে গোলোকধাঁধায় ঘুরিয়ে শেষপর্যন্ত
এই একই সত্য প্রকাশ করে, যেন সাইনবোর্ড
‘প্রতিটি জ্ঞানই এক একটি বিভ্রান্তি’

জীবন ও জগতের দিকে সহজ চোখে তাকাও
যা দেখছ, তা এমনই
যা দেখছ না, তা তুমি
তোমার ভেতরই অদৃশ্য সেই দৃশ্যের জগৎ

অদৃশ্য এ জগৎ জগতের সব মানুষের ভেতরই আছে
তবে আলাদা আলাদা, কেননা
জগতে যত মানুষ তত চিন্তা

সুতরাং জীবন সহজ
জীবনের দিকে সহজ চোখে তাকাও।