করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৯৬৭৯ ৭০৭২১ ১৯৯৭
বিশ্বব্যাপী ১১২০৫০০৫ ৬৩৫৪২৬৯ ৫২৯৩৮০

আমি কোনও দলের পেইড লেখক নই: শামীমা জামান

প্রকাশিত : মার্চ ১০, ২০২০

কবি, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট শামীমা জামানের আজ জন্মদিন। বিশেষ এ দিনে তার সঙ্গে গপসপে মেতে ওঠেন ছাড়পত্রের নির্বাহী সম্পাদক আবু তাহের সরফরাজ। লেখালেখির জগৎ ও সাম্প্রতিক নানা বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। দেশের সাহিত্য জগৎ নিয়ে কিছু অপ্রিয় সত্য বচনও তিনি করেছেন। শামীমা জামানের সেইসব কথামালায় পাঠককে স্বাগতম।

আবু তাহের সরফরাজ: আপনি মূলত কথাসাহিত্যিক। গল্প বা উপন্যাসের চাইতে আজকাল কলাম লিখছেন বেশি। দেশের সমসাময়িক সমস্যাগুলো নিয়ে আপনাকে সোচ্চার দেখা যায়। গল্পকার থেকে কলামিস্ট হওয়ার চিন্তা কিভাবে এলো?
শামীমা জামান: কোনোকিছু হওয়ার চিন্তা থেকে আসলে কোনোদিন লিখিনি। গল্প-উপন্যাসেই ছিলাম। কলাম যে আগে একেবারে লিখিনি তা নয়। প্রথম আলোসহ বিচ্ছিন্নভাবে আরো কিছু পত্রিকায় সেগুলো ছাপা হয়েছে। কিন্তু চার বছর ধরে নিয়মিত কলাম লিখছি বলেই হয়তো সবার চোখে পড়েছে। কয়েক বছরে জাতীয় জীবনে এত এত চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে যে, ওই সময়ে শুধু গল্প-উপন্যাস বা কবিতা নিয়ে পড়ে থাকাটা স্বার্থপরতা হতো। বিবেকের তাড়না থেকেই প্রথম দুয়েকটা লেখা লিখেছিলাম। সেগুলো অনেকের ভালো লাগে। এরপর যে কোনও আলোচিত সংবাদ নিয়ে পত্রিকা কিম্বা পোর্টালের সম্পাদকরাই জানিয়ে রাখেন সেটা নিয়ে লেখার জন্য। এখন তো অনেক স্বনামধন্য সম্পাদকই প্রতি সপ্তাহে কলাম চান। যদিও সময়ের অভাবে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সবার কথা রাখা হয় না।

আবু তাহের সরফরাজ: আপনার লেখা থেকে আপনার রাজনৈতিক অবস্থান বোঝা যায় না। অনেক সরকারবিরোধী কথাবার্তাও আপনি অবলীলায় লিখে ফেলেন। এক্ষেত্রে আপনি অনেক সাহসী। আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে বলুন।
শামীমা জামান: এ ব্যাপারে অনেকেই ভুল বোঝে। যখন সরকারের সমালোচনা করে লিখি তখন একদল সেটা পছন্দ করে না। পারলে রাজাকার, এন্টি আওয়ামী তকমা বসিয়ে দেয়। আবার যখন কোনও লেখায় সরকার প্রধানের প্রশংসা করি তখন আরেক দল গালি দিয়ে যায় নিউজ পোর্টালের কমেন্ট বক্সে। রাজনৈতিক মতাদর্শ তো প্রতিটি মানুষেরই থাকে। আমারও আছে। সেটা আমার নিজেরই থাক। আমি যখন কোনও রাজনৈতিক দলের পেইড লেখক নই তখন সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে সমস্যা কোথায়? আমাদের দেশের বেশিরভাগ কলামিস্টই এই জায়গা থেকে বের হতে পারেন না। যারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে প্রতিবাদে মুখর হন তারা ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ এর বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় নীরব থাকেন। যারা ২৫ ফেব্রুয়ারি নিয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন তারা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে জায়েজ মনে করেন। অথচ দুটি ঘটনাই জাতীয় জীবনে ভয়ংকর অন্ধকারময় ইতিহাস। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে তো কারোই কিছু বলার নেই। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে এত এত সংবাদ মাধ্যমের আদৌ কি কোনও প্রয়োজন আছে?

আবু তাহের সরফরাজ: আপনার শেষ বই ‘কীটপতঙ্গদিন’ বেরিয়েছিল চার বছর আগে। সম্ভবত গল্পগ্রন্থ ছিল। সেটি নিয়ে কিছু বলুন। পাঠকের সাড়া কেমন ছিল এ বইটা নিয়ে? এরপরে আর বই করেননি কেন?
শামীমা জামান: ‘কীটপতঙ্গদিন’ প্রকাশ করেছিল ভাষাপ্রকাশ। সেই সময় বোদ্ধামহলে প্রশংসিতও হয়েছিল। তবে কেমন কাটতি ছিল সেই খোঁজ আমি কখনো নেয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। প্রকাশককে জিজ্ঞাসা করব, ‘ভাই আমার বই কেমন যাচ্ছে?’ কোনও মানে আছে? বেচারা এমনিতেই একগাদা ভালো মানের লস প্রজেক্টে ইনভেস্ট করে বসে আছে। তবে খারাপ যে যায়নি সেটা পরে জানা গেছে। প্রতি বছরই ভাষাপ্রকাশের কর্ণধার কবি মিজান রহমান পাণ্ডুলিপির জন্য তাড়া দেন। এছাড়া আরো অন্তত তিন চারজন প্রকাশক ক’বছর ধরে পাণ্ডুলিপি চান। সময় এবং উৎসাহের অভাবে হয়ে ওঠে না। অল্প বয়সে লেখার যে উৎসাহ পেতাম এখন সেটা পাই না। যখন ভালো লাগে তখন লিখি।

আবু তাহের সরফরাজ: প্রথম বই নিয়ে বলুন।
শামীমা জামান: আমার প্রথম বই ‘আঁধার ঘুঁজির অরণ্য’ বের হয়েছিল ২০০৬ সালে। বইপত্র আয়োজিত ‘সেরা পাঁচ ২০০৫’ পাণ্ডুলিপি পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে এর প্রকাশ ঘটে। সেটিকে উপন্যাস আমি বলব না। নভেলা বলা যায়। এরপরে আরো দুটি উপন্যাস ‘ঘুম ভেঙে’ ও ‘যুগলবন্দিনী’ বের হয় কথাপ্রকাশ থেকে। এই বইগুলো যাদের কাছে পৌঁছেছে তাদের কাছ থেকে অনেক প্রশংসা পেয়েছি। যেহেতু সেগুলো ফেসবুকে এত প্রচারের আলো পায়নি, তাই সেই প্রশংসাগুলো অনেক মূল্যবান আমার কাছে। অনেকে পড়ে খামে করে চিঠি লিখেছে। কেউ বইয়ের চরিত্র নিয়ে কবিতা লিখে পাঠিয়েছে। ইনবক্সে যদিও এখনো অনেক লেখার প্রশংসা পাই, কিন্তু ওই রকম আনন্দ আর লাগে না।

আবু তাহের সরফরাজ: লেখালেখির শুরুর দিকের কথা বলুন।
শামীমা জামান: শুরুর দিকের কথা জানতে চাইলে সবাই শৈশবের দেয়াল পত্রিকা, পাড়ার পত্রিকা এইসব টেনে আনে। আরে ভাই, ওইসব তো সবাই-ই করেছে। ইয়ে মানে আমার আসলে ওসব করা হয়নি। পাড়ার বড়রা যখন ওসব বের করতো আমি তখন করুণ চোখে কেবল দেখতামই। কখনো বলার সাহস হয়নি আমিও লিখতে পারি। সেই অর্থে জাতীয় দৈনিকেই আমার প্রথম প্রকাশ হয়। সেটি ১৯৯৭ সাল। এরপর লিটল ম্যাগেও লিখতে থাকি। প্রথম আলোর প্রথম সময়ে সেই ১৯৯৮ সাল। এক একটা লেখা ছাপা হলে সে কী আনন্দ হতো! ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার আনন্দ ফেসবুক কেড়ে নিয়েছে।

আবু তাহের সরফরাজ: আপনার প্রিয় লেখক কারা? সমসাময়িক কাদের লেখা ভালো লাগে?
শামীমা জামান: সব সময়ের প্রিয়, আমি যাকে গুরু মানি তিনি মানিক বন্দোপাধ্যয়। বিভূতিভূষণ। কৈশোরের হিরো চার্লস ডিকেন্স। তরুণ বয়সে সমরেশ মজুমদারের সব বই ভালো লাগতো। সেই উনার বই এখন কেন জানি আগের মতো ভালো লাগে না। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির। সমসাময়িক অনেকেই দারুণ লিখছেন। অনেকের নামই নেয়া যায়। তবে আমাদের সময়ের সেরা কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ। লেখক কুলদা রায়।

আবু তাহের সরফরাজ: আপনাকে সাদাত হোসাইনকে নিয়ে কটাক্ষ করতে দেখা যায় প্রায়ই। এটা কেন?
শামীমা জামান: ওই যে বললাম, সমসাময়িক কিছু লেখক অসাধারণ লিখছেন। মুল্যায়ন না হলে তারা হারিয়ে যাবেন। কারো কারো লেখা পড়ে বিস্মিত হই। সেই হিসেবে সাদাত অত্যন্ত সাধারণ মানের লেখক। তার পুতুপুতু ভাষা অজস্র পাঠক লুফে নিয়েছে। কাশেম বিন আবুবাকার সাহেবকেও এই পাঠকরা নিয়েছিল। কিন্তু আপনি বোদ্ধা মিডিয়া, আপনি কেন তাকে মাথায় তুলে নাচবেন? পুরস্কারের পর পুরস্কারের বন্যা বইয়ে দিয়ে বেচারাকে মানুষ থেকে সুপারম্যান বানিয়ে ফেলবেন? তার মানে কি এই সময়ে সাদাত ছাড়া আর কেউ ভালো লেখেন না? অথচ এই সময়ের ভালো লেখকদের লেখার ধারেকাছেও সাদাতের লেখা নয়। আমার বিরক্তিটা এখানেই। মানুষ হিসেবে সে অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ হয়তো। আমার সাথে তার পরিচয় নেই। হুমায়ূন আহমেদকে অনুকরণ করে সে লিখছে। অনেকে তাকে হুমায়ূন ডাকাও শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের লেখার মূলশক্তি সূক্ষ্ম রসবোধ, তা সাদাতের লেখায় কোথায়?

আবু তাহের সরফরাজ: আজ আপনার জন্মদিন। শুভ জন্মদিন আপা।
শামীমা জামান: অশেষ ধন্যবাদ আর শুভ কামনা সব সময়। ছাড়পত্রের জন্যে ভালোবাসা।