আল্লামা ইকবালের যবুর-ই-আজম
অনুবাদ
প্রকাশিত : মার্চ ৩০, ২০১৮
এক.
মানুষের ধূলি একদা ফেরেশতার
আলোকের চেয়ে উজ্জ্বলতর হবে
জানি আমাদের ভাগ্যের পথে ধরা
তারকাদীপ্ত আকাশের রূপ লভে।
মস্তিষ্কের সহস্র কল্পনা
(ঝঞ্ঝা তাহার খাদ্য যোগায় ভাই)
জানি একদিন উঠবে আকাশ পথে
ধরা-আবর্ত ছেড়ে পাবে রোশনাই।
কেন জিজ্ঞাসা করছ আমার কথা?
মানুষের কথা ভাবো আর দ্যাখো চেয়ে,
এ হৃদয় আরও উন্নত হলে পরে
হবে সে মহান স্বর্গধারায় নেয়ে।
সময় মতোন মামুলি চিন্তাধারা
যদি বিকাশের মহান সুযোগ পায়
তবে তার রূপ আনন্দ উচ্ছ্বাসে
জানি ঠাঁই পাবে খোদার মহান ছায়।
দুই.
চলেছিল বিশ্বজুড়ে সন্ধান প্রেমের
অবশেষে জন্ম আদমের
পানি থেকে, থেকে মৃত্তিকার
প্রকাশ তাহার।
চন্দ্র সূর্য সুদূরের তারকার দল
প্রতিষ্ঠায় লাগেনি কৌশল।
জীবনের হাটে তাই ক্রয়ের ইচ্ছায়
একট হৃদয় দিলো আদমের ধূলি-কণিকায়।
তিন.
কি এ জীবন? একটি মুক্তো
বইবে শুধু তোমার ঝিনুক-দিলে
ছড়িয়ে দেবে শিখার বুকে
নয়তো যাবে হাওয়ার সঙ্গে মিলে।
ছিন্ন ধরার প্রভাব ছেড়ে
তীব্রগতি ছোটাই ভালোবাসা
চাঁদের উজল গেলাসখানি
স্বচ্ছ আকাশ বক্ষে ছুঁড়ে আসা।
শক্তি- সে তো ছুঁড়েই ফেলা
নগদ টাকা মন আর ঈমানের
রাজার মতোন রাজ্য শাসন
বীরের মতোন বওয়া মৃত্যু-জের।
দর্শনেরই শিক্ষা হবে
কেবলমাত্র দীপ্ত জোশের বলে
চিন্তাধারার ক্ষুর শানানো
ধরার বুকে নিপুণ কৌশলে।
জীবন্ত এই আত্মাখানির
ঈমানটুকু বাজে স্বপ্ন নয়
ছড়ানো এই ধুলো দিয়েই
নকশা গড়া অধিক শক্তিময়।
চার.
দীর্ঘ শীতের দিনগুলো হলো শেষ
শাখায় শাখায় কাঁপছে গানের রেশ।
নদীতীর থেকে বইছে মলয় বায়
গোলাব যে হলো সুন্দরতর তায়।
রূপসী লালার কলি মরু বিয়াবানে
বসন্ত বায়ে হেসে ওঠে গানে গানে।
গোলাবকুঞ্জে বিরহী আমার মন
মাঠ হতে দ্যাখো মৃগ করে পলায়ন।
বিরহ-ব্যথায় খানিক ভুলি যে দুখ
আবার পাহাড়ি নদীর মতোন শোক।
এই প্রাণাবেগ হ্রাস পায় যদি পাছে
জানাবো না ব্যথা বিশ্বাসী যারা আছে।
পাঁচ.
ভাড়াটিয়ার রাঙা খুনে দ্যাখো
ধনিক বানায় উজল মানিক যত
ধনের লোভে অত্যাচারী তাই
মাড়ায় চাষির ক্ষেতকে অবিরত।
ইনকিলাব
বলছি ডেকে!
ইনকিলাব
দাঁড়াও রুখে!
ইনকিলাব
বাঁচার সুখে!
তসবিহ হাতে শহর-মোড়ল আজ
বিপদগামী করছে হাজার মন।
পৈতাগলে ভোলায় বামুন দ্যাখো
কত সরল হিন্দু অনুক্ষণ।
ইনকিলাব
বলছি ডেকে!
ইনকিলাব
দাঁড়াও রুখে!
ইনকিলাব
বাঁচার সুখে!
জুয়ায় মত্ত কুমার এবং রাজা
ফেলছে তারা বিরাট বিরাট দান
ঘুমের ঘোরে বেহুঁশ যখন প্রজা
দিচ্ছে তখন পরাণ ধরে টান।
ইনকিলাব
বলছি ডেকে!
ইনকিলাব
দাঁড়াও রুখে!
ইনকিলাব
বাঁচার সুখে!
ধর্মনেতা মসজিদে, তার ছেলে
কিন্ডারগার্টেন পথের বুকে নিত্য যেন পাই
ধূসর পাখি ছোট্ট শিশু জানি,
শিশু যখন ধূসর পাখি, ধিক তাহারে ভাই।
ইনকিলাব
বলছি ডেকে!
ইনকিলাব
দাঁড়াও রুখে!
ইনকিলাব
বাঁচার সুখে!
মুসলিম সব! আজ আমাদের তাই
বৃথা আশা বিজ্ঞানের এই সর্বনাশা দানে
আহরেমান খুব সহজলভ্য আজ
দুষ্প্রাপ্য আজ খোদা, তাঁরে কেউ তো নাহি মানি।
ইনকিলাব
বলছি ডেকে!
ইনকিলাব
দাঁড়াও রুখে!
ইনকিলাব
বাঁচার সুখে!
মিথ্যা কথার চাটুকতায় দ্যাখো
পড়ছে ঢাকা সত্য কেমন করে
অন্ধ বাদুড় জটলা পাকায় বুঝি
সূর্যালোকে নিভিয়ে দেয়ার তরে।
ইনকিলাব
বলছি ডেকে!
ইনকিলাব
দাঁড়াও রুখে!
ইনকিলাব
বাঁচার সুখে!
গির্জাঘরে খৃস্ট কেমন দ্যাখো
ক্রুশের ওপর হচ্ছে বলি আজ
খোদার কালাম এবং রসুল তাঁর
নেই তো এখন কাবাঘরের মাঝ।
ইনকিলাব
বলছি ডেকে!
ইনকিলাব
দাঁড়াও রুখে!
ইনকিলাব
বাঁচার সুখে!
যুগ দিয়েছে আত্মাকে আজ যত
পাত্র, তাহা দেখেছি সব আমি
তাদের বুকের বিষের জ্বালায় জানি
সাপগুলো সব মৃত্যুপথগামী।
ইনকিলাব
বলছি ডেকে!
ইনকিলাব
দাঁড়াও রুখে!
ইনকিলাব
বাঁচার সুখে!
সিংহ-সাহস, বাঘের শক্তিটুকু
দুর্বলেরা পাবেই অবশেষে
হয়তো বা এই নিভু নিভু দীপে
উঠবে আবার একটি শিখা হেসে।
ইনকিলাব
বলছি ডেকে!
ইনকিলাব
দাঁড়াও রুখে!
ইনকিলাব
বাঁচার সুখে!
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত আবদুর রশীদ খান অনুদিত ‘ইকবালের যবুর-ই-আজম’ বই থেকে পুনর্মুদ্রণ করা হলো
কবি পরিচিতি
আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল ৯ নভেম্বর ১৮৭৭ সালে পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ। তার ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইকবাল তার ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও বিশেষভাবে সমাদৃত। ইকবালের পিতা শেখ নুর মোহাম্মদ ছিলেন শিয়ালকোটের নামকরা দর্জি। আল্লামা ইকবাল অমর হয়ে আছেন তার কয়েকটি কবিতা ও রচনার জন্য। এরমধ্যে আসরার ই খুদি, শিকওয়া ও জবাবে শিকওয়া, দ্য রিকনস্ট্রাকশন ওফ রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম, বাআল ই জিবরাইল, জাভেদ নামা ইত্যাদি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক ভাব সমৃদ্ধ রচনা। তার যে ইসলামি পুনর্জাগরণের আওয়াজ উঠেছিল তা সমসাময়িক অনেক ব্যক্তি ও আন্দোলনকে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত করেছে। ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল ইকবাল মৃত্যুবরণ করেন।























