করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৯৩৭০০ ১৫৫০৯০৫ ২৮১০২
বিশ্বব্যাপী ৩১৭৮৩৩৪০৩ ২৬৩০৭২৫৩৬ ৫৫৩২৯৫২
এলাঁ রব-গ্রিয়ে

এলাঁ রব-গ্রিয়ে

এলাঁ রব-গ্রিয়ের গল্প ‘গোপন কক্ষ’

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১০, ২০২২

এলাঁ রব-গ্রিয়ে ফরাসি নয়া গল্প উপন্যাসের অন্যতম তাত্ত্বিক ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি উপন্যাসে চরিত্র নির্মাণ, কাহিনি ফাঁদা ও সময় ধারাক্রম মানা ইত্যাদির বিরোধিতা করেন। তার সহযোগিদের কয়েকজন: নাথালি সারাওয়াত, ক্লদ সায়মন, মিশেল ব্যুতোর, জঁ পিজে। তাদের হাতে রচিত হয় অ্যান্টিগল্প অ্যান্টি উপন্যাস। এসব লেখায় কোনো বিষয়ের অনুভব ও খুঁটিনাটি পাখি-দৃষ্টিতে নয়, বরং আণুবীক্ষণিক পর্যায়ে নেমে আসে। এ লেখাটি থেকেও তা কিছুটা অনুভব করা যাবে।

প্রথমেই চোখে পড়বে, লাল একটা ধারা, ঘন, গভীর ও ঝলমলে, লাল, প্রায়কালো ছায়াসহ। অনিয়মিত রসেটির দেহকাঠামোর ধরনে, তীক্ষ্ম নকশাকৃত, নানাদিকে ছুটে যাওয়া নানা দৈর্ঘ্যর প্রশস্থ এক ধারা, এরপর বিভাজিত হয়ে, এঁকেবেঁকে একাকী প্রবহমান রেখাগুলো। পুরো জিনিসটা একটা মসৃণ, নিস্প্রভ তলের ওপর, গোলাকার, একইসাথে ম্যড়মেড়ে ও মুক্তোসদৃশ, একই রঙের বিবর্ণ বিস্তৃত সুবঙ্কিম রেখাসমুহ একটা সমতল অংশকে ঘিরে রেখেছে— শাদা কালচে হয়ে ওঠেছে জায়গাটির ছায়াচ্ছন্নতার কারণে: একটা কারাকক্ষ, ডুবন্ত একটা কক্ষ, কিংবা চার্চ একটা— আধো অন্ধকারে ঘন আলোয় বিচ্ছুরণময়।

আরো পেছনে, স্থানটি বেলনাকার খিলানে ভরা, খিলানগুলোর একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিতে পাথরের একটা বিস্তৃত সিঁড়ির মুখে গিয়ে পৌঁছেছে, এটা একটু উঁচু হয়েই ধীরে ঘুরে গেছে, ক্রমে সরু আরো সরু হয়েছে, যতক্ষণ উঁচু ভল্টের দিকে সিঁড়িটা এগিয়েছে, যেখানে পৌঁছে অদৃশ্য হয়েছে সিঁড়িটা।
পুরো কাঠামোবিন্যাস ফাঁকা, সিঁড়ির ধাপগুলো, কলোনেডও। একা, সম্মুখভূমিতে, ছড়িয়ে থাকা শরীরটা ঝলমল করছে।

তীব্রভাবে ঝলমল করছে, লাল ধারার মাঝে চিহ্নিত হয়ে আছে— একটা শাদা শরীর যার নরোম মাংস পুরো অনুভব করা যায়, কোমল, নিঃসন্দেহে, এবং নাজুক। রক্তাক্ত জায়গা বরাবর সামনে সুগোল আরো একটা কিছু, একেবারেই নিরাঁচর, প্রায় একই কোণে দৃশ্যমান; কিন্তু এর কেন্দ্রে আলোকময় বিন্দুটি, যা আরো ঘন লাল, এই ক্ষেত্রে বেশ ভালোভাবেই লক্ষ্য করা যায়, যেখানে অন্যটি একেবারেই ছেতরে গেছে, কিংবা আহত জনের নিচে একেবারেই ঢাকা পড়ে গেছে।

পেছনে এই সিঁড়ির ওপরে শেষমাথায়, একটা কালো ছায়ামূর্তি ছুটে যেতে দেখা গেল, একটা লোক, দীর্ঘ, ফ্লটিং ক্যাপে মোড়ানো, এদিক ওদিক ভ্রুক্ষেপ না করেই শেষ পদক্ষেপ ফেলছে, তার কাজ শেষ। একটা পাতলা ধোঁয়া এঁকেবেঁকে উপরে উঠছে, একটা রুপালি আভার কাজ করা লোহার একটা স্ট্যান্ডে জ্বলতে থাকা আগরবাতি থেকে। নিকটেই দুধশাদা শরীর, বামস্তন থেকে ছড়িয়ে পড়েছে একটা প্রশস্ত ধারা, রক্তের, পাঁজর বরাবর এবং কোমরের ওপর দিয়ে।

একটা গোলগাল মহিলা শরীর, কিন্তু ভারী নয়, একেবারেই নগ্ন, চিত হয়ে শুয়ে থাকা, বুক উচুঁ হয়ে রয়েছে কিছুটা, মোটা একটা বালিশ মেঝে শরীরটার নিচে পড়ে থাকায়, প্রাচ্য-রীতির কারুকাজ করা একটা রুমালে বালিশটা ঢাকা। শ্রোণী খুবই সরু, গলা লম্বা, এবং হালকা, একদিকে বেঁকে আছে, মাথা বেঁকে অধিক ঘন ও ছায়াচ্ছন্ন স্থানে পড়ে রয়েছে, এরপরেও যেখানে মুখের গড়ন-রেখা লক্ষ্য করা যায়, মুখটা খোলা একটু, তাকিয়ে থাকা চোখগুলো, স্থির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে, এবং দীর্ঘ কালো চুলের স্তূপ, কুকড়েমুকড়ে থাকা কাপড়ের ওপর আঁকাবাঁকা ঢেউয়ের মতো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। কাপড়টা ভেলভেটের নিশ্চয়, এই কাপড়ের উপর বাহু এবং কাঁধও পড়ে রয়েছে।

ঘন লাল রঙের ভেলভেট, খুবই নিখুঁতভাবে রাঙানো, এমনই মনে হয় আরো, এই আলোর নিচে। কিন্তু টকটকে লাল ধূসর নীল বালিশের রংগুলোতে মনে হচ্ছে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে_ বালিশের একাংশে ভেলভেট কাপড়ের নিচে, বুকের পিঠের, —যেমনটটা প্রাচ্যের নকশা, যেমনটা রুমালে দৃশ্যমান, মেঝের নিচে। এরও পেছনে, একই ধরনের রঙগুলো দেয়ালে এবং খিলানের পাথরগুলোতেও, ভল্টের পথে সিঁড়ির ধাপে, এবং স্বল্প দৃশ্যমান পৃষ্ঠতলে, যেটা রুমের শেষমাথায় গিয়ে হারিয়ে গেছে।

রুমটার বিভিন্ন ডাইমেনশন নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন; তরুণ আক্রান্তদেহটা প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয়, কক্ষের বেশ বড় এক অংশ দখল করে আছে, কিন্তু দেহের কাছে নেমে আসা বিশাল সিঁড়িটা এ-ও মনে করিয়ে দেয়, কক্ষের সবটা তা নয়, ডানে বামে, দূরে, ধূসর ও নীলের দিকে, যেমন বিস্তৃত হয়ে আছে কক্ষটা, সারি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খিলানগুলোর ভেতর দিয়ে, প্রত্যেক দিকেই, বস্তুত, অন্য অনেক সোফা, ভারী কার্পেট, বালিশের আর কাপড়ের স্তূপ, আরো অনেক কুচকানো শরীর, আরো অনেক আগরবাতির ভেতর দিয়ে।

বলা কঠিন কোথা থেকে আলো আসছে। কোনো চিহ্নই নেই, না খিলানগুলোতে, না মেঝে, যা আলোর উত্স ও দিক সম্পর্কে একটু ইশারা দেবে। না আছে কোনো দৃশ্য, তার সবটা বুকজুড়ে, জংঘার বাঁক, গোল উদর,  স্তন বৃন্তের সবখানে, ছড়ানো পা দুটো, একেবারে ছিটানোছড়ানো, দৃশ্যমান যৌনতার কালো উঁচুভূমি, আকর্ষণহীন, বাতিল, ব্যবহার অযোগ্য, এখন।

লোকটা এরই মধ্যে বেশ কয়েক পা পেছনে। এখন সে সিঁড়ির প্রথম ধাপে, উপরে যেতে প্রস্তুত লোকটা। নিচের পদক্ষেপগুলো প্রশস্থ, গভীর, বড় ভবন, মন্দিরের দিকে এগোলে যেমন পদক্ষেপগুলো পড়ে; যতই এগোনো যায়, পদক্ষেপ ছোট হয়ে আসে, এবং একই সময়ে প্রশস্থ একটা পাকখাওয়া বাঁক ফুটিয়ে তোলে। ক্রমশ এমনভাবে, তখনো সিঁড়িটা আধপাক ঘুরেনি, যখন সিঁড়িটা ভল্টের নিকটে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে পড়ে, তারপর একটা সরুচিকন পথে পরিণত হয়ে; সিঁড়িটি হাতল ছাড়াই, আধোগোচর, তদুপরি, ঘন হয়ে আসা অন্ধকার পেরিয়ে।

কিন্তু এই দিকে লোকটি ভ্রুক্ষেপ করে না, তার পদক্ষেপ তাকে যেখানেই নিয়ে যাক, দ্বিতীয় ধাপে তার বাম পা, এবং ডান পা এরই মধ্যে তৃতীয় ধাপ ছুঁয়েছে, তার গলা বাঁকিয়ে, এদিক ওদিক তার চশমাটা খুঁজলো, শেষবারের মতো। তার দীর্ঘ ফ্লটিং কেপটা তার কাঁধে ছিটকে পড়লো, এক হাত তার বুক আঁকড়ে রইলো, চক্রাকার গতিতে পাক খেয়ে টুপিটা ছুটে গেল দূরে, দ্রত, এ ব্যপারটায় মাথা ও বুক বিপরীত দিকে ঘুরতে বাধ্য হলো, এবং কাপড়ের কোনাটা উঁকি দিয়ে স্থির হয়ে রইলো, যেনো কাপড়টার উপর দিয়ে এক ঝলক বাতাস বয়ে গেলো; এই কোনাটা নিজের উপর বাঁক খেয়ে রইলো, একটা ঢিলেঢালা s এর মতো। রেশমের লাল বুনন, সোনার এমব্রয়ডারিকে ফুটিয়ে তুললো।

লোকটার চেহারা নির্বিকার কিন্তু উদ্বেগময়, যেন আশা করা যায়_ কিংবা, বস্তুত ভয়_ কোন আকস্মিক ঘটনার, কিংবা দৃশ্যের সমস্ত নিথরতাকে খুঁটিয়ে দেখা, শেষ একটা ঝলকে। যদিও সে পেছন দিকে তাকিয়ে রয়েছে, সারাটা শরীর তার সামনে একটু ঝুঁকে রয়েছে, যেন তখনো সে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে ওঠছে,  তার ডান বাহু কেবল টুপির প্রান্তটা ধরে রেখেছে এমন নয়, স্পষ্টতই তা বাম দিকে বাঁক খেয়ে আছে, ফাঁকা স্থানের সেই বিন্দুর দিকে, যেখানে ঝুলবারান্দাটা থাকার কথা;  এমন একটা কিছু যদি থাকতো এই সিঁড়ির,  একটা বাধাগ্রস্থ ভঙ্গি, বোধের অতীত প্রায়, সেই না-থাকা অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরতে, যদি-না প্রবৃত্তিগত ঝাঁকুনি থেকে তা উত্গত হতো।

তার দৃষ্টি যে-দিক বরাবর, বালিশের ওপর শুয়ে থাকা শিকার হওয়া দেহটার দিকে নিশ্চিত, যার প্রসারিত বাহুগুলো ক্রুশের আকারে ছড়ানো, যার বুক উত্থিত, আর মাথা বাঁক খাওয়া পেছনের দিকে। কিন্তু মুখটা খিলানের আড়ালেই পড়ে আছে, লোকটির দৃষ্টির বাইরে, আর সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে খিলানটা। তরুণী মহিলাটির ডান হাত খিলানের পাদদেশের মেঝেয় স্পর্শ করে আছে। তার কোমল কব্জিটা একটা লোহার ব্রেসলেটে আটকা। বাহুটা প্রায় আচ্ছন্ন অন্ধকারে, পর্যাপ্ত আলো পাচ্ছে শুধু হাতটাই, ছড়ানো পাতলা আঙুলগুলোকে খুবই দৃশ্যমান করে রেখেছে, পাথরের খিলানটির বৃত্তাকার ঘূর্ণনের বিপরীতে। একটা কালো ধাতব শেকল খিলানের গায়ে পাকখেয়ে একটা আংটার ভেতর দিয়ে গড়িয়ে ব্রেসলেটে গিয়ে শেষ হয়েছে, খিলানের সাথে কব্জিটাকে দৃঢ়ভাবে বেধে রেখেছে।

বাহুর শিকলে গোলগাল একটা কাঁধ, বালিশের কারণে উত্তোলিত, বেশ আলোকিত জায়গাতেই, যেমনটা গ্রীবা, গলা, এবং অন্য কাঁধটি, বগল তার নরোম চুল সহ, বাম বাহু এভাবে পেছনে ঠেসে রয়েছে, কব্জিটা আরেকটা খিলানের পাদদেশে আবদ্ধ হয়ে আছে, একবারেই সম্মুখ ভূমিতে, এখানে লোহার ব্রেসলেট এবং শেকলটা পূর্ণভাবেই উপস্থাপিত, খুঁটিনাটি সহ, নিখুঁত ও স্পষ্টভাবে।

একই কথা সত্য, তখনো সম্মুখভাগে, কিন্তু অন্যপাশে, একই শেকলের, কিন্তু ততটা ভারী সেটা নয়, গোড়ালির দিকে, শিকার সরাসরি ফেরানো, খিলানের চারপাশে দুবার পাক খেয়ে, এবং মেঝে পড়ে থাকা একটা বড়োসরো লোহার আংটায় যুক্ত হয়ে শেষ হয়েছে। আরো এক ইয়ার্ড পেছনে, কিংবা বস্তুত কিছুটা পেছনে, ডান পা’টি স্পষ্টই শেকলে বাধা। কিন্তু এটা বাম পা এবং এর শেকল, উপস্থাপিত খুবই নিখুঁতভাবে।

ছোট্ট পা, আকর্ষর্ণীয়, নিখুঁত মডেলের। ত্বকের অনেক জায়গায় শেকলটা দাগ ফেলেছে, বেশ লক্ষ্যযোগ্য, যদিও খুব দেবে যায়নি। শেকলের সংযোগগুলো গোলাকার ও পুরো, চোখের আকারের সমান। আংটা, মেঝে পড়ে রয়েছে, যেসব আংটায় ঘোড়া বাধা হয়, সেসবের কথা মনে পড়িয়ে দেয়, পাথরের পেভমেন্টে বেশ স্পর্শ করে আছে আংটাটি, বিশাল লোহার পেরেকে এটি যুক্ত। কয়েক ইঞ্চি দূরে মাত্র, রুমালের প্রান্তটা; সাদামাটাভাবেই ওই জায়গায় জ্বলমল করছে রুমালটা, নি:সন্দেহে, একটু উত্থিত, ঠিক অনুপাতেই নিয়ন্ত্রিত, আক্রান্ত লড়াইয়ের শেষ চেষ্টা করতে যাওয়ার কারণেই এমন হয়েছে।

লোকটা এখনো এক ইয়ার্ড দূরে দাঁড়িয়ে, আধোঝোঁকা তার উপরে। তার মুখের ওপর সে তাকিয়ে, ওপর থেকে নিচে তাকালে দেখা যায়, তার কালো চোখ, প্রয়োজনের চেয়ে আকারে বড়ো, আইশেডো ছাওয়া বলেই, একেবারেই হা হয়ে পড়েছে তার মুখ, আর্তচিত্কার করছে। লোকটার ভঙ্গি তার মুখের দৃঢ় গড়নকেই অষ্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলেছে। কিন্তু এর মধ্যে ত্রাস সৃষ্টিকারী একটা অনুভূতি, কঠোর মনোভাব সত্ত্বেও, একটা নীরবতা, একটা স্থবিরতা। তার পিঠ একটু বাঁক খেয়ে আছে, তার বামহাত, একমাত্র দৃশ্যমান বস্তু, শরীর থেকে একটু দূরের একটা কাপড় আঁকড়ে রয়েছে, গভীর রঙিন কাপড়ের এক খণ্ড, যেটা কার্পেটের মাঝে খেচড়ে রয়েছে এবং এর দীর্ঘ খুঁটে সোনালি এমব্রয়ডারি।

বিশাল ছায়ামূর্তিটা উন্মুক্ত মাংসের প্রায় সবটা ঢেকে রেখেছে, এর উপর লালের স্রোত, বুকের গম্ভুজ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে, দীর্ঘ ধারায়, শাখায় প্রশাখায়, সরু, আরো সরুহয়ে, বুকের ঝাপসা পটভূমির উপর এবং পাশ দিয়ে। একটা ধারা বগলে গিয়ে পড়েছে, বাহুবরাবর প্রায় ঋজুভঙ্গিতে এগিয়েছে; অন্য ধারাগুলো কোমরের দিকে বয়ে গেছে, উদর, কোমর, ঊরুর উপর দিয়ে ছাপ ফেলে, অনেকগুলো রেখা এর মধ্যে ছুটে গেছে। তিন-চার রেখা দুপায়ের ফাঁকের শূন্য জায়গায় গিয়ে একটা চিকন রেখার সাথে মিলেছে, v আকারের স্থানটি ছুঁয়েছে, বাহিরের দিকে ছিটকে পড়া পা দুটি তেমন আকৃতির জায়গাটি বানিয়েছে। কালো যৌনচুলের ভেতর দিয়ে সে রেখা অদৃশ্য হয়ে গেছে।

এখন দেখো, এখনো মাংস অক্ষত: কালো যৌনবন, সাদা উদর, কোমরের কোমল বাঁক, বুকের নিতম্বের চিকন প্রান্তর, এবং আরো উঁচুতে মুক্তোর মতো স্তন, উঠছে নামছে, দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাস ফেলার সমান্তরালে, এর গতি আরো দ্রুত দ্রততর হচ্ছে। লোকটি, তাকে ঘেষে, এক হাঁটু মেঝের উপর, তার উপর ঝোঁকে রয়েছে। মাথাটি দীর্ঘ ও তরঙ্গময় চুলে ভরা, যা একমাত্র বাঁধাহীন দুলছে, কিছুটা, এক থেকে অন্য পাশে ফিরছে, চেষ্টা করছে; শেষপর্যন্ত, মহিলার মুখ একটু খুলে গেছে, রক্ত নরোম ত্বকের উপর ছিটকে বেরিয়ে আসছে, টানটান হয়ে পড়ে রয়েছে দেহটা, ছায়ায় ঢাকা চোখ দুটো সতর্ক, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিস্ফারিত, বড়ো, মুখটি আরো বেশি খুলে গেছে, মাথাটি ঝাকি খাচেছ, ত্রাসে, একবার, শেষবার, ডান থেকে বামে, তারপর রয়েসয়ে একটু, ঝুকলো আবার, শেষাবধি এবং নিথর হয়ে পড়লো, ভেলভেটের কাপড়ে ছড়ানো-চুলের স্তুপের মাঝে।

পাথরের সিঁড়ির সবচেয়ে উপরের ধাপে ছোট দরজাটি খুলে গেলো, হলুদাভ কিন্তু স্থিরতর একটা আলোর গুচ্ছ ভেতরে আসার সুযোগ পেল, যার বিপরীতে সেই লোকটির ছায়ামূর্তিটি দাঁড়িয়ে, লম্বাটে ঘড়িটাকে মুড়ে রেখেছে। মাত্র কয়েকটা ধাপ তাকে পেরোতে হবে, চৌকাঠে পৌছে যেতে।

তারপর, শূন্য, খা-খা পুরো জায়গাটি, বিশাল আকারের এই কক্ষটা, লাল টকটকে ছায়াগুলো নিয়ে, পাথরের খিলানগুলো নিয়ে, যেগুলো প্রতিটি দিকেই ছড়ানো, স্থাপত্যময়, সিঁড়ির ধাপ, হাতলহীন, উপরের দিকে বেঁকে ঘুরে উঠে গেছে, ক্রমে সুরুহয়ে, আরো ঝাপসা হয়ে অন্ধকারের ভেতর, যতোই উঠেছে, ততই ভল্টের দিকে এগিয়ে গিয়ে একসময় সিঁড়িটা হারিয়ে গেছে।

শরীরটার কাছেই, শিকার শক্ত অনড়, যার উজ্জ্বলতা এরই মধ্যে ম্লান হয়ে গেছে, আগরবাতির ধোঁয়ায় স্থবির বাতাসে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে জটিলতর হয়ে উঠেছে: প্রথমে ভূমির সমান্তরালে পাক খেয়ে, তারপর কিছুটা বঙ্কিমতা হারিয়ে, কিছুটা উপরে উঠে গিয়ে, পরে আগের উত্স-পথে ফিরে, পুনরায় ডানে যেতে যেতে ঐ পথকে অতিক্রম করেছে, তারপর আবার আগের দিকে ঘুরে গেছে, পেছনে ফিরে যেতে, এভাবে অনিয়মিত একটা প্যাচানো রেখার সৃষ্টি করেছে, ক্রমে সরল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, ও একেবারে উপরের দিকে উঠে গেছে, ক্যানভাসের।