কাজী জহিরুল ইসলাম

কাজী জহিরুল ইসলাম

কাজী জহিরুল ইসলামের আত্মগদ্য ‘আমার বিচিত্র জীবন’

পর্ব ২৬

প্রকাশিত : জুলাই ৩০, ২০২৫

জসীম উদদীন পরিষদে একদিন এক পাগল এসে ঢোকে। পাগলের পরনে একটা গামছা, উর্ধাঙ্গ উদোম। গামছাটিও ভেজা, টপটপ করে পানি পড়ছে। দরোজার আলোটাকে আড়াল করে দু`পা ছড়িয়ে সে এমনভাবে এসে দাঁড়ায়, গামছার নিচের জিনিসপত্র সব দেখা যাচ্ছে।

বয়সে কিশোর হলেও, বেশ শক্ত চোয়াল, দারিদ্রের সুস্পষ্ট ছাপ ওর চোখে-মুখে। ডাক্তার জিয়ার দিকে তাকিয়ে সে চিৎকার করে বলছে, কাকা, আমি লেইখ্যা ফালাইছি। আমি কবিতা লেইখ্যা ফালাইছি।

ঘরে যে আরো কয়েকজন মানুষ আছে সেদিকে তার বিন্দুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ নেই। ডাক্তার সাহেব বেশ বিরক্ত হন, পাণ্ডে, আগে মানুষ হও, ভদ্র সমাজে কীভাবে আসতে হয়, কীভাবে কথা বলতে হয় সেটা শিখো, তারপর কবি হওয়ার চেষ্টা করো।

কে শোনে কার কথা। কবিতা লেখার উত্তেজনায় সে নাচতে শুরু করে। আমি কবি হইয়া গেছি কাকা, আমারে আর পিছে ফালাইয়া রাখতে পারবেন না।

আমরা পাণ্ডের উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনা দেখে বেশ মজাই পাচ্ছি। ডাক্তার সাহেব কিন্তু ওকে ঘরে ঢুকতে দিলেনই না। একরকম ধাক্কা দিয়েই বের করে দিলেন।

পাণ্ডে মনোক্ষুণ্ণ হয়ে বেরিয়ে গেলে আমিনুল হক আনওয়ার ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে একটু রাগ করেন, বলেন, কবির উচ্ছ্বাসকে এভাবে হত্যা করতে নেই।

আরে রাখেন আপনের উচ্ছ্বাস। আজকে ওকে এভাবে আসতে দিলে দেখা যাবে কাল সাহিত্যসভায়ও এভাবে চলে আসবে। আগে ওকে মানুষ বানাই পরে কবিতা লেখবে।

ডাক্তার সাহেব পাণ্ডেকে বিশেষ স্নেহ করতেন। তার বাড়িতেই থাকত পাণ্ডে, ওর বড় বোন আর মাকে নিয়ে। কখনো ভাড়া দিত, কখনো দিত না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ পাণ্ডে। বেঁচে থাকার জন্য পাণ্ডে সুইপারের কাজও করেছে। এখন সে ঠোঙা বানায়, সেই ঠোঙা মাথায় করে গুলশান, মহাখালীসহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিক্রি করে। ঘরে বসে ঠোঙা বানাতে সাহায্য করে ওর মা ও বোন। পরে অবশ্য ওর বোন একটা গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি নেয়।

পাণ্ডের আচরণ উন্মাদের মতো। সভ্যতা ভব্যতার ছিটে ফোঁটাও নেই ওর মধ্যে। একটা জিনিস ও বেশ ভালো বোঝে তা হচ্ছে পয়সার হিসাব, প্রতিটি পাই পয়সারও হিসাব ও ঠিকঠাক মতো রাখে। এটা ওকে পারতেই হয়, বেঁচে থাকার জন্যই জীবন ওকে এই শিক্ষা দিয়েছে।

এসব করেও কিন্তু এই পাগল একদিন এসএসসি পাশ করে ফেলে। আমরা তো বিশ্বাসই করতে পারিনি ভবানী শংকর পাণ্ডের মতো একটা পাগল এসএসসি পাশ করতে পারবে। ও যতটা খুশি হয়েছে, আমরা খুশি হয়েছি তার চেয়েও অনেক বেশি। গুলশান, মহাখালি তো খুব একটা দূরে না, হেঁটে হেঁটে ঠোঙ্গা বিক্রি করতে যাওয়াই যায়। আজকাল ও ঠোঙার বোঝা মাথায় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সদরঘাট চলে যায়।

আমি একদিন পাণ্ডেকে ডেকে জিজ্ঞেস করি, এত দূরে যাও কেন?
ও বলে, দাদা, ঠোঙাগুলি বিক্রি কইরা লঞ্চঘাটে যাই। কিছুক্ষণ বইয়া থাহি। বুড়িগঙ্গার জলের দিকে চাইয়া থাকলে পরানডা শীতল অয়। মনে অয় আমগো গেরামডা দেহা যায়। মাঝে মৈদ্যে ইচ্ছা করে ফাল দিয়ে লঞ্চে উডি। মার কথা, বৈনের কথা মনে অইলে আর ওডা অয় না, বাড্ডায় আইয়া পড়ি।

পাণ্ডের বাড়ি বরিশাল। কেন সে তার মা, বোনকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিল সেই খোঁজ কোনোদিন নেওয়া হয়নি। পাণ্ডে নিয়মিত জসীম উদদীন পরিষদের আড্ডায় আসতে থাকে। যদিও আমরা প্রতি ১৫ দিন পরপর একটি বড় ঘরে সভা করার জন্য সবুজ সেনা কিণ্ডারগার্টেনে যাই, মূলত ডাক্তার জিয়ার টিনশেডের এই ঘরটিই আমাদের পরিষদ। এখানেই সকাল থেকে রাত অব্দি নানান ধরনের লোক আসতে থাকে।

জিয়াউদ্দিন সাহেব পাণ্ডেকে যখন বলেন, ভদ্রসমাজের পোশাক পরে এখানে আসবে, তখন কিন্তু তার নিজের পরনে একটি চেক লুঙ্গি ও হাতাওয়ালা স্যান্ডো গেঞ্জি। অবশ্য এটি তার নিজের ঘর, সারাদিন তিনি এখানেই বসে থাকেন।

তিনি কম্যুনিটির নানান বিচার-শালিশও করেন। বারো রকমের মানুষ এখানে আসে। কারো সংসার ভেঙে যাচ্ছে, কারো ভাড়াটিয়া ৩ মাস ভাড়া দিচ্ছে না, কারো বাড়ির মুরগী চুরি হয়ে গেছে, কারো টিনের চালে রাতের বেলায় কারা যেন ঢিল মারে, কেউ বউ পিটায়, কত রকমের সমস্যা নিয়ে যে শালিশ বসে এই ঘরে তার শেষ নেই। তবে তিনি চেষ্টা করেন এইসব সামাজিক বিষয়গুলো বিকাল ৩টার আগেই মিটিয়ে ফেলতে। ৩টার পরে এই ঘরটি শুধুই কবি-সাহিত্যিকদের জন্য।

নানান রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকও আমাদের সঙ্গে আছে। ফজলুর হক গুলশান থানা বাকশালের সভাপতি, গল্পকার সাইদুর রহমান কামরুজ সাধারণ সম্পাদক, ডাক্তার সাহেব নিজেই তো গুলশান থানা বিএনপির সভাপতি, আওয়ামী লীগ করেন এরকমও বেশ ক`জন আছে, যেমন মুনীর হাসান চৌধুরী তারা, মোস্তফা ব্যানার্জি জাসদের নেতা, ছাত্র ইউনিয়নের ডাইহার্ড কর্মী সবুক্তগীন এবং শামীম চৌধুরী, গল্পকার লিয়াকত আলী জামায়াতে ইসলামীর রোকন। কোন দলের লোক নেই এখানে?

কিন্তু ডাক্তার সাহেবের কথা একটাই, আমরা যখন জসীম উদদীন পরিষদে ঢুকবো আমাদের একটাই পরিচয়, আমরা লেখক, অন্য সব পরিচয় বাইরে রেখে এখানে ঢুকবেন। এবং বছরের পর বছর আমরা সেই নীতি মেনে চলেছি। কাইয়ুম ভাই যখন দলের কোনো বিষয় নিয়ে ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করতে আসতেন, কথা বলতেন খুব নিচু স্বরে যাতে আমরা না শুনি, যাতে আমাদের সাহিত্য-চিন্তায় ব্যাঘাত না ঘটে, এবং প্রায়শই আমাদের দেখলে তাদের আলোচনা শেষ না করেই কাইয়ুম ভাই উঠে চলে যেতেন।

লেখকদের তিনি ভীষণ সম্মান করতেন। মাঝে মাঝে সামাজিক কোনো কারণে গুলশান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি আসতেন কিন্তু লেখকদের আড্ডার সময়ে বেশিক্ষণ ভাগ বসাতেন না।

জসীম উদদীন পরিষদের কিছু কঠোর আইন-কানুন ছিল। সাহিত্য সভায় পঠিত প্রতিটি লেখার ওপর নির্মম ও নির্মোহ সমালোচনা করা হতো। এই সমালোচনাকে সমর্থন করে রম্যকার জিয়াউদ্দিন সাহেব সব সময় বলতেন, এটি হচ্ছে পাঠশালা, এখানে আমরা সকলেই শিখতে আসি, সমালোচনা না হলে শিখবো কেমন করে।

লেখকদের মধ্যে যারা আলোচক থাকতেন তারা নিজের লেখা নিয়ে কোনো কথা বলতে পারতেন না এবং কারো লেখার কঠোর সমালোচনা হলে কোনো লেখক আত্মপক্ষ সমর্থন করে কথা বলার সুযোগ পেতেন না, কাজেই সমালোচকেরা কথা বলতেন ইচ্ছা মত, প্রাণ খুলে এবং প্রায় যা খুশি তাই। সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে কোনো কোনো লেখক কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেছেন, এমন ঘটনাও অনেক ঘটেছে। কখনো কখনো নিয়ম ভঙ্গের কারণে কোনো কোনো লেখককে সভা থেকে বহিস্কার করা হয়েছে, তিনি সভা চলাকালীন পুরো সময় সভার বাইরে কোথাও, কোনো রেস্টুরেন্টে বসে, অপেক্ষা করেছেন, সভা শেষ হওয়ার পর আমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।

কাউকে কাউকে শাস্তি স্বরূপ এক বা দুই সভার জন্য নিষিদ্ধও করা হয়েছে। এত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরেও কারো সঙ্গে কারো কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা তৈরি হয়নি। সভার বাইরে আমরাই এই সমাজের সবচেয়ে আপনজন। একজনের দুঃখে অন্যজন ঝাঁপিয়ে পড়েছি।

জসীম উদদীন পরিষদ প্রতি বছর জসীম উদদীন সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করত। তখন এই পুরস্কারটি খুব দামী একটি পুরস্কার বলে বিবেচিত হতো। সম্ভবত সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন প্রাপ্ত সাহিত্য সংগঠন ঢাকায় তখন আর একটিও ছিল না। বাংলা একাডেমি পুরস্কারের পরেই জসীম উদদীন পুরস্কার বিবেচিত হতো। তখন বিসিএস পরীক্ষার গাইড বইয়ে এই বছর কে কে জসীম উদদীন পুরস্কার পেয়েছেন তা লেখা থাকত এবং বিসিএস পরীক্ষার্থীরা সেইসব নাম মুখস্ত করতেন।

প্রথম বছর যৌথভাবে জসীম উদদীন পুরস্কার পান কবি আল মুজাহিদী এবং আমিনুল হক আনওয়ার, পরবর্তীতে আল মাহমুদ, আশরাফ সিদ্দিকী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আলী ইমাম, রাবেয়া খাতুন, আতাহার খান, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানসহ বাংলা সাহিত্যের অনেক বরেণ্য লেখক এই পুরস্কার পেয়েছেন, আমাকেও এক বছর এই বিশেষ পুরস্কারটি দেওয়া হয়। আমরা সারাদিন এক সঙ্গে আড্ডা দিলেও এ-বছর কে পুরস্কার পাবেন তা কিছুতেই জানতে পারতাম না। পুরস্কারের জন্য একটি নির্বাচক মণ্ডলী ছিল, যদিও, তাদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমি তা মনে করি না, প্রস্তাবগুলো পরিষদের সভাপতি, মহাসচিবের কাছ থেকেই যেত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরস্কার কমিটি রাবার স্ট্যাম্পের মত শুধু সই করতেন, তবে মাঝে মাঝে তারা কোনো কোনো নাম বাদ দেননি, বা নতুন নাম যুক্ত করেননি সেটিও বলা যাবে না।

একদিন দু`জন মজার মানুষ এসে সাহিত্য সভায় হাজির হন, একজন কবি ও অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিক, অন্যজন গল্পকার ও সাংবাদিক অভিনয় কুমার দাশ। দুজনই ভীষণ গপ্পোবাজ মানুষ। তারা এরপর থেকে নিয়মিতই আসতে থাকেন। চলবে