করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৩৪৫৮০৫ ২৫২৩৩৫ ৪৮৮১
বিশ্বব্যাপী ৩০৩৭৫৩৯৭ ২২০৬০০১৬ ৯৫০৯৮৮

কামরুল আহসানের গদ্য ‘প্রেমের কেন দরকার’

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০

প্রেম ছাড়া আপনি ভালো থাকবেন। সুখেই থাকবেন। স্বাধীন থাকবেন। নিজের মতো থাকবেন। কেউ নেই আপনাকে ঘাটানোর, ভাবানোর। আপনার রাজ্যে আপনিই রাজা। আপনার নিজের সৌন্দর্য নিয়ে যেমন ভাবতে হবে না, ভাবতে হবে না নিজের কুৎসিত রূপ নিয়েও। যা যেমন আছে, তেমনভাবেই সই। আপনি তো তখন কোনোকিছু কেয়ারই করেন না। কারণ আপনি একা।

তাহলে প্রেমের কেন আবার দরকার হয়? যৌনতার কথা বাদ দিলাম। ওটা খুবই সহজ আর ফাজিল কাম। চাইলেই করা যায়। সেক্স করতে আর কী লাগে? চাইলে একটা যৌনসঙ্গী যোগাড় খুব কঠিন কিছু না। বিয়ে করে, অন্তত টাকা দিয়ে, কিংবা কিছু ছলচাতুরি করে হলেও তা যোগাড় করা যায়। এটা তো পশুপাখিও করে। তারাও সময়মতো তাদের যোগ্য, উত্তম যৌনসঙ্গী পেয়ে যায়, মোটামুটি শারীরিকভাবে খুব দুর্বল না হলে। মানুষও খুব ব্যর্থ না হলে একটা বিপরীত লিঙ্গ যোগাড় করতে পারে।

কিন্তু প্রেম চাইলেই পাওয়া যায় না। কাড়ি কাড়ি টাকা, সম্মান, সফলতা এমন কি রাজ্য বিলিয়ে দিলেও না। এটা একটা ভাগ্যের ব্যাপার মানুষের জীবনে। এটা হয়, হয়ে যায়, এবং কখন হয় তাও টের পাওয়া যায় না। এবং হয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় যাবতীয় অশান্তি আর অসুখ। প্রথম সমস্যা যেটা হয় আপনি তখন আর নিজের মধ্যে থাকবেন না। সারা শরীরে একটা ঝাঁকুনি পড়বে। পৃথিবীটা প্রতি মুহূর্তে দুলতে থাকবে পায়ের নিচে। আপনার তখন মনে হবে, আগে তো ছিলাম ভালো, এখন আমার কী যে হলো!

অথচ আপনি প্রেম চাইছিলেন। প্রাণ দিয়ে চাইছিলেন। আধুনিক মানুষ বুঝজ্ঞান, বিদ্যাবুদ্ধি হওয়ার পর সবচেয়ে প্রবলভাবে যা চায় তার নাম প্রেম! এর নানা কারণ আছে। এটা শুধু সাংস্কৃতিক না, শৈল্পিকও, প্রেম একটা শৈল্পিক, সৃষ্টিশীল ব্যাপার। আধুনিক মানুষের যে প্রেমের জন্য এত হাহাকার কারণ আধুনিক মানুষ মোটামুটি এভারেজে আদিমমানুষের চেয়ে শৈল্পিক হয়ে উঠছে, এর সঙ্গে অনেক ফিলোসফিক্যাল ব্যাপারও আছে। কারণ শিল্পকে আলটিমেটলি ধারণ করে ফিলোসফি। এটা ব্যক্তি সচেতনভাবে নাও জানতে পারে। তার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলই এটা তাকে জানায়। সময়ের কারণেই এটা হয়। কিন্তু অনেকে যেহেতু, বেশির ভাগই মানুষই যেহেতু এটা সচেতনভাবে জানে না, তাই প্রেমের নামে সে তৈরি করে সম্পর্ক। যদিও সম্পর্ক মানেই প্রেম নয়। সম্পর্ক মানে বন্ধন। বন্ধন মানে কিছু দায়দায়িত্ব, কর্তব্য, নিরাপত্তা, আশ্রয়। প্রেমের মধ্যেও আমরা কিছু দায়িত্ব, কর্তব্য চাই বটে, তবে সেগুলো মানেই প্রেম না।

এসব নিছক বন্ধুত্বের মধ্যেও থাকে। যে কোনো ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যেই এগুলো থাকে। প্রেমের চেয়ে এজন্য ভালোবাসা আরামদায়ক, বন্ধুত্ব স্বস্তিকর। কিন্তু প্রেম বড় অরাজক, বিশৃঙ্খল, উদভ্রান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ভালোবাসাকে ব্যাখ্যা করা সহজ, প্রেমকে নয়। প্রেম তাহলে কী? আমরা সত্যিই তা জানি না প্রেম আসলেই কী। ঠিক কী প্রকার বায়োলজিক্যাল বা স্পিরিচুয়াল রিএ্যাকশন হয়! আমরা শুধু জানি, প্রেম ছাড়া আমরা বেঁচে থাকতে জানি না। এটা একটা অচেনা নদী, যার মধ্যে আমরা কেবল ভেসে যাই।

কথা ছিল এক তরীতে কেবল তুমি আমি
যাব অকারণে ভেসে কেবল ভেসে...
ত্রিভুবনে জানবে না কেউ আমরা তীর্থগামী
কোথায়, যেতেছি কোন দেশে সে কোন দেশে...

এই ভেসে যাওয়ার তাড়না কেন জন্মায় মানুষের জীবনে! আন্না কারেনিনার মনে হয়েছিল, তার তো সবই ছিল, সুন্দর সংসার, সম্মান। কেবল ছিল না প্রেম। মনে হচ্ছিল সে মরে যাচ্ছিল। বাঁচার জন্য সমাজ সংসার ছেড়ে ভ্রনস্কির হাত ধরে ঘর ছেড়ে পালাল। কিন্তু সেই প্রেমও বাঁচাতে তাকে পারল না। প্রেমের জন্যই মরল সে। প্রেম মানে মরণই। প্রতি মুহূর্তে মরণ। মওলানা রুমি বলছেন,
Die now! Die now! Die now, in this love!
When you die in this love, new life, you will receive.
Die now! Die now! Do not fear this death.

প্রেমের সবচেয়ে বড় ভয় মরণকে ভয় পাওয়াই। কিন্তু মরণ তো অনিবার্য। এম্নিতেও ওম্নিতেও। আমরা কি কোনোভাবেই মৃত্যুকে এড়াতে পারি? আসলে ওই মরণ ভাবনাই আমাদের প্রেমের মরণের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ প্রেমের মড়া জলে ডোবে না।

তবে প্রেমের মরণে বারবার নবজন্ম হয়। প্রেম হচ্ছে একজীবনে বহুজীবন যাপন করা। প্রেমের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের বায়োলজিক্যাল, প্রকৃত মৃত্যুকে সহনশীল করি। এ কথা সত্য, প্রেম অনেকগুলা কাণ্ড ঘটায় ভিতরে।

এক. প্রেম সমগ্র জগতের সাথে ক্যানেক্ট করে। এবং আমরা জগতের সাথে ক্যানেক্টেড হতে চাই। কারণ জগতের সাথে যুক্ত হওয়ার আগপর্যন্ত আমরা নিঃসঙ্গ বিচ্ছিন্নতা বোধ করি। সে আপনার যতই  অর্থবিত্ত, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, সম্মান, সফলতা থাকুক, প্রেম ছাড়া আপনি জগতের সাথে একীভূত হতে পারবেন না। এটা একটা বিশ্রী বিরক্তিকর ব্যাপার বটেই। কারণ অন্যগুলো চাইলেই আপনি  অর্জন করতে পারবেন, কিন্তু প্রেম আপনি কোনোকিছু দিয়েই জয় করতে পারবেন না। এটা একদমই ভাগ্যের ব্যাপার, ম্যাজিকেল একটা ব্যাপার। এমন কি দুজন নারীপুরুষ পরস্পরের প্রতি মায়া দেখাতে পারে, মায়া হয় অভ্যাসবশতও, তারা সব দায়-দায়িত্ব পালন করে একসাথে সারাজীবন থাকতেও পারে, কোনো ঝামেলা ছাড়াই, সেটাও প্রেম নাও হতে পারে।  

দুই. প্রেম ইগোর বিলোপ করে। ফলে নিজের অস্তিত্ব ভুলে থাকা যায়। প্রেম মানেই নিজের অস্তিত্ব কারো ওপর আরোপ করা। এ এক প্রকার দাসত্ব, ভয়ঙ্কর অসহায়ত্ব। মানুষমাত্রই যেহেতু স্বাধীন থাকতে চায় এই পরাধীনতাও সে মেনে নিতে পারে না। আবার সে এই দাসত্ব চায়। দাসত্বের সঙ্গে সে এখানে প্রভুত্বও চায়। অন্যকে সম্পূর্ণরূপে অধিকারও করতে চায়। শুধু শারীরিকভাবে না, তার ভাবনাচিন্তাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তুমি আমাকে ছেড়ে অন্য কারো কথা ভাববে তা হবে না। প্রেম মানে ওই ভাবনাই। আমি যেমন তোমাকে নিয়ে ভাবছি, আমি চাই তুমিও আমাকে নিয়ে ভাবো। আমার অস্তিত্ব তোমার ভাবনার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হোক। এটা আমাদের অবচেতন বাসনায় থাকে। এর কারণ আমাদের নিজেদের নিয়ে ভাবনা করার মতো কিছু থাকে না। নিজেকে নিয়ে ভেবে আমরা কোথাও পৌঁছুতে পারি না। নিজের অস্তিত্বের ভাবনা থেকে মুক্তি চাওয়ার জন্যও আমরা প্রেম চাই।

তিন. প্রেমের মধ্যে আমরা বারবার মরি। বারবার মরি কারণ একবার যেমন আমি নিজেকে কারো কাছে সমর্পণ করি, তেম্নি আবার তার একটু প্রশ্রয়ে গহীন সমুদ্র থেকে ভেসেও উঠি। প্রায় মাতৃজঠর থেকে বেরিয়ে আসার মতো অনুভূতি হয় তখন। ওই নবজন্ম লাভের আকঙ্ক্ষাই হয়তো প্রেমের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। তবে প্রথমে মরতে হবে। তারপরে না জন্ম। কিন্তু আমরা মরতে ভয় পাই, মরতে ভয় কারণ আমাদের বাস্তববুদ্ধি আমাদের সেই ভয় দেখায়। এই জন্য প্রেমিকপ্রেমিকারা বাস্তববুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। বাস্তববুদ্ধি না হারালে সেই ভয় কাটানো যায় না। বাস্তববুদ্ধি হারানোর নামই প্রেম। কিন্তু বাস্তববুদ্ধি হারাতে আমরা ভয় পাই। কারণ আমরা জানি তাহলে আমরা সমাজে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারব না। তাই প্রেম একটা অত্যন্ত সাহসের কাজ। পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসের কাজ। পুরো সমাজকাঠানোর বিপরীতে চলে যাওয়া সহজ কথা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক