করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৬৫৬১৮ ৭৬১৪৯ ২০৯৬
বিশ্বব্যাপী ১১৫৭১৭২২ ৬৫৪২৭০৯ ৫৩৭০৪৫

জগতে মানুষই সবচেয়ে মজার প্রাণী

মারুফ ইসলাম

প্রকাশিত : অক্টোবর ২০, ২০১৯

যে যাই বলুন না কেন, জগতে মানুষই সবচেয়ে মজার প্রাণী। একবার হয়েছে কী, মোবাইল ফোন মারফত আমার কানে খবর এলো, আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর মা মারা গেছেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়ার মতো ঘটনা নিঃসন্দেহে। হলামও তাই। এখন বন্ধুকে তো ফোন করে সান্ত্বনা দেয়া লাগে। সেটাই কর্তব্য। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, সান্ত্বনার কোনো ভাষাই আমার আয়ত্বে নেই। যে কষ্টের মুখোমুখি আমি এখনো হইনি, সেই কষ্টের সান্ত্বনা দেব কীভাবে? কেমন মেকি মেকি লাগে না? অভিনয় অভিনয় মনে হয় না? মনে হয়, মুখোশ সেঁটে বন্ধুর সামনে দাঁড়িয়েছি কিন্তু বন্ধু ঠিকই দেখতে পাচ্ছে মুখোশের অন্তরালের চেহারা। কি লজ্জা! কি লজ্জা! এসব ভণ্ডামির মানে হয়?

কিন্তু জগতের নিয়ম হচ্ছে, বিপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে হয়। তাকে দু‘চারটে সান্ত্বনার কথা শোনাতে হয়। যুগ যুগ ধরে এ-ই হয়ে আসছে। আমি কোন বিপ্লবী বিপিন বিহারী যে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাব? আমি তাই নিয়ম মেনে বন্ধুকে ফোন করি। মনে মনে প্রস্তুতি নিই, কীভাবে কোন ভাষায় বন্ধুকে সান্ত্বনা দেব। নিশ্চয় অশ্রুতে বাষ্পরুদ্ধ হয়ে থাকবে তার কণ্ঠ। কথাই বলতে পারবে না হয়তো। কান্নার শব্দ ছাড়া হয়তো শুনব না কিছুই। ভাবছিলাম এসব। রিং বাজছিল ফোনের ওপাশে। কিছুক্ষণ পর ফোন রিসিভ হলো। এবং আরেক দফা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হলাম। বন্ধুটি বেশ স্বাভাবিক এবং স্পষ্ট গলায় বলল, কী অবস্থা মারুফ, আছ কেমন? বললাম, আমি তো আছি একরকম, কিন্তু তুমি...। কথা শেষ করতে পারলাম না, ওপাশ থেকে বন্ধুটি বলল, আমার অবস্থা আর বলো না। একটু আগে আম্মু মারা গেছে, শুনেছ বোধহয়। এখন যাচ্ছি সাত মাথায় কাফনের কাপড় কিনতে। তারপর গোলাপজল এটা সেটা। কবর দিতে হবে গ্রামের বাড়িতে। অনেক কাজ রে ভাই।

আরেক দিনের ঘটনা। আবারো মোবাইল ফোন মারফত খবর পেলাম, আমার এই বন্ধুটির সর্বশেষ প্রেমিকা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। প্রেমাভিধানের ভাষায় `ব্রেকআপ` আর কি! ভাবলাম, এরচেয়ে দুঃসময় কোনো তরুণের জীবনে আর আসতে পারে না। এই দুঃসময়ে বন্ধুর পাশে থাকা উচিত। বন্ধুত্বের পরিচয় দেয়ার এমন সুযোগ জীবনে আর না-ও আসতে পারে। আমি সুযোগ কাজে লাগাতে বন্ধুকে ফোন করি। বন্ধু আবারো অতিশয় স্বাভাবিক গলায় বলল, কী অবস্থা মারুফ, কী মনে করে ফোন দিলা? বললাম, তোমার কী মন খারাপ? সে বলল, তা তো কিছুটা হয়-ই। আমি বললাম, তোমার মন ভালো করার জন্য কী করতে পারি? উমমম... কয়েক সেকেন্ড ভেবে বন্ধু উত্তর দিলো, ভালোমন্দ খাওয়াতে পারো।

সে যাত্রায় আমরা হাজির বিরিয়ানি খেলাম। তারপর বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার প্রেমিকার নাম কী? সে নাম বলতে পারল না। ভুলে গেছে!

এমনই বন্ধুটি আমার। এমন হাজারো ঘটনা আছে তার। জীবনের যে কোনো পরিস্থিতিতে অতিমাত্রায় স্বভাবিক থাকতে পারে সে; তা মায়ের মৃত্যুই হোক আর প্রেমিকার বিচ্ছেদই হোক। স্বাভাবিক থাকার এই বিরল গুণ সৃষ্টিকর্তা সবাইকে দেন না। যাদের দেন তারা ভাগ্যবান নিঃসন্দেহে। আমার খুব ইচ্ছা, হাজির বিরিয়ানি খাওয়াতে খাওয়াতে একদিন ঠিকই তার কাছে থেকে জেনে নেব, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে স্বাভাবিক থাকার এই গোপন রহস্য।