জগলুল আসাদের প্রবন্ধ ‘গণতন্ত্র কারে কয়’

প্রকাশিত : মার্চ ২৯, ২০২৬

গণতন্ত্রকে কেবল ভোটের রাজনীতি বা সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন  হিসেবে না দেখে এর গভীরে নিহিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, আইনি শাসন এবং সামাজিক সংস্কৃতির জটিল সমীকরণকে উন্মোচন ও বোঝা প্রয়োজন ।  গণতন্ত্র এখানে কেবল জনগণের সাধারণ ইচ্ছা বা জেনারেল উইলের প্রতিফলন নয়, বরং এটি  এমন এক ব্যবস্থা যা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জন-আবেগকে পরিশোধিত করে জনকল্যাণে রূপান্তরিত  করে।  আবার,  আধুনিক রাষ্ট্রের জটিলতায় গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা লুকিয়ে থাকে জনপরিসরের সক্রিয়তা এবং লিগাল-র‍্যাশনাল প্রতিষ্ঠানসমূহের  সক্ষমতার ওপর।

জোসেফ শুম্পিটার ও রবার্ট ডাল, ডগলাস নর্থ, মন্টেস্কু ও জেমস মেডিসন, ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা ও মাক্স ভেবার, রবার্ট পুটনাম, ইউর্গেন হাবারমাস, জন ডিউই, মার্শাল সাহলিনস-এর বইপুস্তক ও তত্ত্বাদি ব্যবহার করে এই লেখায় এটা দেখিয়েছি যে, গণতন্ত্র সফল হতে হলে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিকভাবে পারস্পরিক আস্থার সংস্কৃতি—এই দুইয়ের সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

গণতন্ত্র কী, এটার আসলে এক কথায় উত্তর নাই। তবে এটা বলা যায়, গণতন্ত্রের সাথে জনগণের ইচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সম্পর্ক আছে। গণতন্ত্রের একেবারে মিনিমালিস্ট ডেফিনিশন দিয়েছেন জোসেফ শুম্পিটার তাঁর Capitalism, Socialism and Democracy বইয়ে। তাঁর মতে, গণতন্ত্র হলো একটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা যেখানে জনগণ নেতা বছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচনের মাধ্যমে। গণতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটা প্রাতিষ্ঠানিক মডেল। এলিটরা ভোট পাবার  জন্যে প্রতিযোগিতা করবে, এবং এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটা ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসবে গণতন্ত্র।

শুম্পিটারের এই সংজ্ঞায় জনগণ শুধুই বাছাইকারী, নেতাকে নির্বাচনকারী। আর গণতন্ত্র হচ্ছে সেই নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা। শুম্পিটার গণতন্ত্রকে মোরাল আইডিয়াল হিসেবে না দেখে প্র‍্যাকটিকাল একটা মেথড হিসেবে দেখেন।

রবার্ট ডাল তাঁর বই Polyarchy: Participation and Opposition তে গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসি না বলে বলেন পলিআর্কি, অর্থাৎ রুল বাই ম্যানি। তিনি গুরুত্ব দেন অংশগ্রহণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর দায়িত্বশীলতার ওপর। পলিআর্কিতে অনেকগুলো জিনিস নিশ্চিত করতে হয়: একটা সুষ্ঠু নির্বাচন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্য সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা, সর্বজনীন ভোটাধিকার ও বিভিন্ন সংগঠন করবার স্বাধীন এখতিয়ার। তিনি শুম্পিটার কর্তৃক প্রদত্ত গণতন্ত্রের এলিট-সেন্ট্রিক ডেফিনিশনের বাইরে এসে একগুচ্ছ তৎপরতা ও প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি হিসেবে গণতন্ত্রকে দেখতে চান।

তাঁর কাছে গণতন্ত্রের বিমূর্ত সংজ্ঞায়নের চেয়ে গণতন্ত্র কী করে কাজ করে, সেটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। জোসেফ শুম্পিটার যেখানে গণতন্ত্র বলতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া বোঝেন, সেখানে ডাল গণতন্ত্র বলতে প্রতিষ্ঠানের সমাহার বোঝেন যারা অংশগ্রহণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দায়বন্ধতা নিশ্চিত করবে। রবার্ট ডালের কাছে, জনগণ সার্বভৌম নয়, বরং অ্যাক্টিভ পার্টিসিপ্যান্ট। তো এক্ষেত্রেঅর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ও প্রতিষ্ঠান বিশেষজ্ঞ  ডগলাস নর্থ-এর  Violence and Social Order বইয়ের কথা বলতে পারি। এখানে তিনি  যুক্তি দেন যে, একটা দেশকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হতে হলে তাকে কতগুলো কন্ডিশন তৈরি করতে হবে, যেগুলোর নাম তিনি দেন Doorstep Conditions।

এই শর্তগুলো পূরণ না করেই যদি নির্বাচন হয় তাহলে রাষ্ট্রের ভেতরে ভায়োলেন্সের সম্ভাবনা বাড়ে। একটা শর্ত হচ্ছে, এলিটদের জন্যে ‘রুল অব ল’ যেগুলো তারা মেনে  নেবে যে, এগুলো তারা ও অন্যরা মানবে। দুই নম্বর শর্ত হচ্ছে, পারপিচুয়ালি লিভড অর্গানাইজেশনস। ব্যক্তি বা সরকার পরিবর্তন হলেও কতগুলো প্রতিষ্ঠানকে সর্বদা থেকে যেতে হবে । নর্থের মতে, প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একটা সমাজের  rules of the game এংব humanly devised constraints that shape human interactions। তিন নম্বর শর্ত, সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ।

ম্যাক্স বেবার কথিত monopoly on the legitimate use of violence এর ব্যাপারে একমাত্র এখতিয়ার রাষ্ট্রের যেটা তদারকি করবে সিভিল গভার্নমেন্ট। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে আইন ও প্রতিষ্ঠান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। গণতন্ত্র জনগণের অভিপ্রায়ের বহিপ্রকাশ, রুশো যেটাকে জেনারেল উইল বা জনগণের সাধারণ ইচ্ছার বহিপ্রকাশ বলেন। এই  অগণিত কেওটিক ইচ্ছার মধ্য থেকে সাধারণ ইচ্ছাকে নির্ধারণ করবার জন্যে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন দরকার পড়ে । রুশোর মতে, সকলের ইচ্ছা নয়, বরং সেই ইচ্ছাই গণতান্ত্রিক ইচ্ছা যা common good কে ট্র‍্যাক করতে পারে।

গণতন্ত্রের লিবারেল সংজ্ঞায় জন লকের অধিকার সংক্রান্ত বিবৃতিকে মাথায় রেখে বলা যায়, গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা যা মানুষের লাইফ, লিবার্টি ও প্রপার্টি রক্ষা করে। জনগণের কর্তৃত্বকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত করতে হয়, আবার ওই প্রতিষ্ঠানগুলোই ছেঁকে আনে বিবাদমান  অনেকানেক ইচ্ছা থেকে সাধারণ ইচ্ছাকে। বিবিধ প্রকারের ক্ষমতার পৃথক এখতিয়ার নিরূপন করতে হয় যেন রাষ্ট্রের ভেতরে কর্মবণ্টন নীতি রক্ষিত হয় এবং জনগণের ক্ষমতা ও ইচ্ছার ধারক হিসেবে তারা কাজ করতে পারে। মন্টেস্কুর  সেপারেশন অব পাওয়ার নীতির কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। যেখানে আইনবিভাগ, বিচারবিভাগ ও শাসন/নির্বাহী  নিভাগের ক্ষেত্রকে আলাদা করা হয়েছে।

আধুনিক রাষ্ট্র এই ত্রিবিভাগের বাসনা রাখে, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে;  কার্যত শাসন বিভাগ প্রায়শই অন্য দুই বিভাগকে প্রভাবিত করে ফেলে। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতার  চূড়ান্ত পৃথকীকরণ প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই আলাদা রাখাকে আদর্শ গণতন্ত্রের জন্যে আবশ্যক মনে করা হয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্যে ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার মতে, দরকার শক্তিশালি রাষ্ট্র। অর্থাৎ, যে রাষ্ট্র আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে সমর্থ; আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতার একটা মেকানিজম। এই তিনটি ছাড়া কোনো পলিটিকাল অর্ডার গড়ে উঠতে পারে না। পলিটিকাল অর্ডারের এই ধারণা ফুকুইয়ামা নিয়েছেন তাঁর ওস্তাদ স্যামুয়েল হান্টিংটনের কাছ থেকে।

ফুকুইয়ামা একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে, পড়তে পারেন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে, ইন্সটিউশনাল-ইম্পারসনাল অর্ডার হিসেবে দেখতে চান, যেখানে নৈর্ব্যক্তিক আইনেরই প্রধান্য থাকবে। এই ক্ষেত্রে আমাদের মনে পড়বে মাক্স ভেবারের কথা যিনি আমলাতন্ত্রকে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড মনে করতেন এবং এই আমলাতন্ত্র হচ্ছে একটা লিগাল-র‍্যাশনাল অথরিটি। কিন্তু ফুকুইয়ামা মনে করেন, পলিটিকাল অর্ডার যখন পলিটিকাল ডিকেই বা অবক্ষয়ে পরিণত হয়, পড়তে পারেন গণতন্ত্রের যখন অবক্ষয় হয়, তখন রি-প্যাট্রিমোনিয়ালিজম ঘটে। প্যাট্রিমোনিয়ালিজম মূলত ম্যাক্স বেবারের টার্ম, যেটি দ্বারা স্বজন ও আত্মীয়প্রীতি বোঝায়।


প্রাগাধুনিক কালের মতো আধুনিক কালেও এই প্যাট্রিমোনিয়ালিজম দেখা যায়, যখন নানামুখী আনুগত্যের বন্ধনের কারণে রাষ্ট্রীয় পদপদবি লাভ করা যায়। এই ইনক্লুসিভ ফিটনেস  গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কালে দেখা যায়। যখন ব্যক্তিমানুষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে মর্যাদা পায় না তখন ওই ব্যক্তিমানুষ নিজেকে নানা পরিচয়বর্গ ও গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করে পরিচয়ের রাজনীতি বা আইডেন্টিটি পলিটিক্সে শামিল হয়। পরিচয়ের রাজনীতি ফুকুইয়ামার মতে, অবক্ষয়িত ব্যবস্থার চিহ্ন।

জনগণের প্রাকৃতিক বা স্বভাবজাত বিভিন্ন আবেগ অনেক সময় নানা ফ্যাকশন ও ক্রাইসিস তৈরি করে। স্বার্থের সংঘাতে ‘সাধারণ ভালো’ করার লক্ষ্য  বিঘ্নিত হতে পারে। তাই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দরকার জনগণের ইচ্ছাকে বা জনমতকে ফিল্টার করার জন্যে। রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও আমেরিকার অন্যতম স্থপতি ও চতুর্থ প্রেসিডেন্ট জেমস মেডিসন ‘দ্য ফেডারেলিস্ট পেপারস’-এর ১০ ও ৫১ নং লেখায় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছেন জনমতকে রিফাইন করবার জন্যে। এই জন্যে সংবিধান ও শক্তিশালী জুডিশিয়ারি লাগে, চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস লাগে, জনগণের অ্যাম্বিশন ও ইম্পালসগুলোকে একটা র‍্যাশনালিটির মধ্যে নিয়ে আসার জন্যে।

প্রতিষ্ঠানসমূহ গণতন্ত্রের সক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে জনমতকে আইন ও যুক্তির মধ্য দিয়ে পরিশোধিত করে। ৫১ নং পেপারে ম্যাডিসন এবং ৭৮ নং পেপারে আলেক্সেন্ডার হ্যামিল্টন মনে করেন, আইন-আদালত কোর্ট কাচারি জনগণের ‘ইল হিউমার’ বা বদ ইচ্ছার পথে বাধা হয়; পাবলিক উইল ও অপিনিয়ন উড়ু উড়ু হইলেও সকলের সাধারণ ভালোর জন্যে আইনের স্ট্যাবিলিটি দরকার হয়। এই চিন্তাকে গণতন্ত্রবিরোধী বলে মনে করা হয় না, বরং গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্যে জরুরি ভাবা হয়।

এক্ষণে ইউর্গেন হাবারমাসের শরণ  ও স্মরণ করতে পারি। তিনি গণতন্ত্রের ডেলিবারেটিভ রূপের কথা পাড়েন। গণতন্ত্র হচ্ছে পাবলিক পরিসরে একটা ফ্রি অ্যান্ড  রিজন্ড ডিবেইট বা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছা। জনগণকে রিজন্ড সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করা। এই মতে, গণতন্ত্রকে শুরু হতে হয় ভোটের মেলা আগে থেকেই। এবং এর সাথে গণতন্ত্রের দাবিদারদের নির্বাচনবর্তী কার্যক্রমের সম্পর্কও আছে।

অন্যদিকে, রবার্ট পুটনামের বই রাষ্ট্রদর্শনের মনোযোগ আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরিয়ে কালচারে, অর্থাৎ মানুষের জীবনযাপনের প্রাত্যহিকতায় নিয়ে আসেন। পুটনাম মনে করেন, গণতন্ত্রের সফলতা আইন, সংবিধান, বাজেট ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে না। এর সফলতা নির্ভর করে সামাজিক পুঁজি বা সোশাল ক্যাপিটালের ওপর। সোশাল ক্যাপিটাল বলতে তিনি মানুষের পারস্পরিক আস্থা, আচার মেনে চলা, সম্পর্ক করা ও রক্ষা করাকে বোঝেন। গণতন্ত্র সফলভাবে কাজ করতে পারে যদি এই সোশ্যাল ক্যাপিটাল থাকে এবং যার ফলে একটা ‘সিভিক কমিউনিটি’ গড়ে ওঠে, যেখানে পারস্পরিক সহনশীলতা,আস্থা ও সৌহার্দ্য  আছে, সাহায্য-সহয়াতার পারস্পরিকতা আছে এবং জনপরিসরে লোকজনের সক্রিয় অংশগ্রহণ আছে।

যে সমাজে মানুষে মানুষে পারস্পরিক আস্থা নাই, সেখানে স্বার্থপর সিদ্ধান্তই যুক্তি। এইসব ক্ষেত্রে সোশাল ক্যাপিটাল থাকলে ক্ষতিকর স্বার্থপরতা থেকে সমাজ মুক্ত থাকতে পারে। মার্শাল সাহলিন ব্যবহৃত Generalised reciprocity টার্মটা রবার্ট পুটহাম তাঁর Making Democracy Possible ও Bowling alone বইদ্বয়ে ব্যবহার করেছেন। এটি দ্বারা তিনি বোঝান, সমাজের একজন আরেকজনকে সহায়তা করে তাৎক্ষণিক কোনো বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়াই। কিন্তু এটাতে আস্থা রাখে যে, সমাজের ভেতরে কেউ না কেউ, কখনো না কখনো এটার বিনিময় তাকে দেবে। এ কারণে পারস্পরিক সহায়তা সমাজের ভেতরে থাকে। এই ধরনের ‘হরাইজন্টাল কোঅপারেশন’র ফলে আধুনিক গণতন্ত্র কাজ করে যেতে পারে।

পুটনাম বলতে চান, গণতন্ত্র মানে সংবিধান রচনা বা ইলেকশন করা নয়। বরং এটা দীর্ঘ মেয়াদে পারস্পরিক আস্থা তৈরি ও নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপার। রবার্ট পুটমান উত্তর ও দক্ষিণ ইতালির সিভিক লাইফ নিয়ে একটি এক্সপেরিমেন্ট হাজির করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, উত্তর ইতালির জনগণের ভেতরে হাই ট্রাস্ট থাকার কারণে সেখানে গণতন্ত্র সফল হয়েছে। উত্তর ইতালিতে, ক্লাব, সংগঠন ইত্যাদি এসোসিয়েশনাল কর্মকাণ্ড অনেক বেশি। এগুলো তাদেরকে গগণতান্ত্রিক যাত্রায় সফলতা দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে আমরা আলেক্সি দ্য তকভিলের Democracy in America বইটির কথা স্মরণ করতে পারি। আমেরিকতা তিনি এমন অনেক ক্লাব ও অ্যাসোসিয়েশন দেখেছিলেন। যাই হোক, রবার্ট পুটনামের কাছে গণতন্ত্র হচ্ছে আস্থা ও সহায়তাশীল সামাজিক জীবনপ্রণালি।

জন ডিউইয়ের কাছেও গণতন্ত্র একটা জীবনপ্রণালি ও সামাজিক প্রক্রিয়া। গণতন্ত্রের দুর্বলতা ও সংকট সম্পর্কে তিনি সচেতন। কিন্তু তিনি মনে করেন, যা প্রবাদের মর্যাদা পেয়েছে, গণতন্ত্রের সংকট দূর করতে তিনি আরও বেশি গণতন্ত্র চান। এই কথা দ্বারা তিনি বেশি বেশি নির্বাচন বা এ রকম কিছু বোঝাননি। বরং যোগাযোগ বৃদ্ধি  ও অধিক স্বাধীন ইনকোয়ারি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন তাঁর The public and its problems বইয়ে।

এ প্রসঙ্গে জন ডিউই ও ওয়াল্টার লিপম্যানের বিতর্ক মজাদার। তাদের বিতর্ক হয়েছিল: পাবলিক কি নিজেদের শাসন করতে সক্ষম, জনমতের কী বিশেষ কোনো মূল্য আছে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কী এক্সপার্টদের উপর নির্ভর করা উচিত নাকি জনগণের অংশগ্রহণের ওপর—এই প্রশ্নত্রয় ঘিরে। তো, লিপম্যানের অবস্থান ছিল এই যে, জনগণের কাজ শুধু নেতা নির্বাচন করা আর কিছু নয়। কারণ জনগণ একটা সুডো-পরিবেশে বসবাস করে। সে দুনিয়াকে বোঝে নানা ইমেজ, স্টেরিওটাইপ, মিডিয়া ইত্যাদি দ্বারা। জটিল অর্থনীতি, ফরেন পলিসি, ব্যবসানীতি ইত্যাদি বিষয় পাবলিক জানে না, বোঝে না। তাই, জনগনের মূল্যের চেয়ে শাসনে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এক্সপার্টগণ। জনগণের কাজ নেতা নির্বাচনের অধিক হওয়া উচিত নয়।

অন্যদিকে ডিউই মনে করেন, জনগণের অজ্ঞতা ও অনবগতিকে শিক্ষা দ্বারা দূর করা সম্ভব, অনুসন্ধানী মন তৈরি করে তাদেরকে মিডিয়া ম্যানিপুলেশন হতে রক্ষা করা সম্ভব৷ ডিউই অনেকটাই ডেলিবারেটিভ ডেমোক্রেসির পক্ষে, আর লিপম্যান ট্যাকনোক্রেটিক গভার্নেন্সের পক্ষে৷ জন ডিউই-এর পাবলিকের সংজ্ঞায়ন বোঝার ব্যাপার। ‘পাবলিক’ এর উদ্ভব তখনই হয় যখন ‘পিপল’ পরিবেশ দূষণ, নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব ও অর্থনৈতিক সংকট দ্বারা আক্রান্ত হয়। জন ডিউই গ্রেট সোসাইটির পরিবর্তে ‘গ্রেট কমিউনিটি’র কথা বলেন। এবং স্থানীয় পরিসরেই ‘পাবলিক’-এর আবির্ভাব হয় বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্র শিখতে হয় ঘরে, স্কুলে, প্রতিবেশীদের সাথে মুখোমুখি সংযোগে। স্থানিক ও  সম্মিলিত জীবন যদি হারিয়ে যায় তাহলে ‘পাবলিক’ নামক ব্যাপারটা ভৌতিক হয়ে ওঠে।

তিনি যে গ্রেট কমিউনিটির কথা বলেন, সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ব্যাপারে সচেতন থাকে এবং তারা তাদের ব্যক্তিগত ও মানবিক মূল্যবান ও প্রয়োজনাদি শেয়ার করতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সার্ভ করবে পাবলিককে।  গণতন্ত্রের উপরোক্ত লিবারেল ব্যাখ্যার বাইরে এসে হানা আরেন্ট ও রোজা লুক্সেমবার্গ-এর সহায়তায় ভিন্নতর ভাষ্যের দেখা পেতে পারি আমরা। হ্যানা আরেন্ট গণতন্ত্রকে দেখেছেন মানুষের `একত্রিত হওয়ার ক্ষমতা` হিসেবে। তাঁর কাছে রাজনীতি মানেই হলো জনপরিসরে মানুষের উপস্থিতি। বলপ্রয়োগ বা ভায়োলেন্সের কাজ মূলত একক প্রচেষ্টা, কিন্তু প্রকৃত `রাজনৈতিক ক্ষমতা` তখনই তৈরি হয় যখন মানুষ একত্রে কাজ করে act in concert। রাজপথের বিশাল গণ-জমায়েত হলো এই গণক্ষমতার সবচেয়ে জীবন্ত ও দৃশ্যমান উদাহরণ।

অন্যদিকে, রোজা লুক্সেমবার্গ মনে করতেন, সাধারণ জনগণের `স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থান`-ই হলো গণতন্ত্রের প্রকৃত ও বিশুদ্ধ রূপ। তিনি লেনিনের `দলকেন্দ্রিক` বা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া শাসনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, রাজপথে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই আমলাতান্ত্রিক জড়তা ও স্থবিরতাকে ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রকে পুনরুজ্জীবিত করে। রোজা লুক্সেম বার্গের The Russian Revolution ও  The Mass Strike, the Political Party and the Trade Unions বই দুটিতেই এই তত্ত্বালাপ পাওয়া যাবে। সুতরাং, গণতন্ত্রকে শুধু জনগণের ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্বের প্রত্যক্ষ প্রকাশ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা আকারে পাঠ করা এবং সমাজ বা সামষ্টিক পরিসরে পারস্পরিক আস্থা ও সকলের পরামর্শ, অংশগ্রহণ ও যৌক্তিক আলাপচারিতার ব্যবস্থা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়।

গণতন্ত্রের লিবারেল তাত্ত্বিকরা একে এভাবেই দেখেন। কিন্তু বিপ্লবী ব্যাখ্যায় অভ্যুত্থান, যখন-তখন গণ-জমায়েত এবং জনগণের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও সার্বক্ষণিক কণ্ঠ শোনাবার ব্যবস্থাকেই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি মনে করা হয়। তবে ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা এই যে, বিপ্লব বা সংগ্রামের সেই উত্তাল মুহূর্ত পার হওয়ার পর, জন-আকাঙ্ক্ষাকে টেকসই করতে সকলকেই শেষ পর্যন্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও জবাবদিহিতার কাঠামোর ভেতরে থিতু হতে হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক