নজরুল হায়াতের ৩ কবিতা
প্রকাশিত : জুন ০৫, ২০২০
দরোজার ওপারে
সবগুলো দরোজা একে একে খুলে যাচ্ছে
গিনিপিগের মতো ধেয়ে আসছে মানুষ
ভেতরে অদৃশ্য সিরিঞ্জ হাতে নিশ্চিন্ত আজরাইল
তার ওষ্ঠচূড়ায় শরাবন তহুরা
চুম্বনের ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে সমগ্র ভূভাগ,
হে মর্ত্যপিয়াসী মানুষ, বেহেশতি দরোজায়
লেলিহান অগ্নি হাতে হুরিরা দাঁড়িয়ে
তাদের মসলিন-সদৃশ পোশাকে
প্রেমের নিগূঢ় আমন্ত্রণ,
দরোজার ওপারেই মোহন প্রস্রবণ
কুলকুল করে বইছে প্রতিশ্রুত নহর
শুধু জনারণ্যে মিশে যাও
জনারণ্যে বিশুদ্ধ বাতাসের মসৃণ হুল
তোমাকে পৌঁছে দেবে হুরির দরোজায়।
বৃষ্টির পদাবলি
সকাল থেকেই বৃষ্টিবিহীন—সারাটাদিন,
এমনকি এই নিশুত রাতেও
বৃষ্টি ওড়ে দূর আকাশে শুকনো শাড়ি
ঘুরে বেড়ায় এলোমেলো জলের পরি,
রূপসী সে রুপোর পালক ডানায় পরে
চোখের কোণে কাজল এঁকে, বাদল মেখে,
বৃষ্টি আমার প্রেমিকা, তার শীতল ওমে
অবগাহন, ঘাম-দুপুরে তপ্ত চুমু
রোদের ছলে জড়ায় ঠোঁটে বাজায় বেণু
বৃষ্টি আমার পাপড়ি মেলা ফুলের রেণু
তোমার চুলে এলোমেলো খোঁপায় দোলে,
বৃষ্টি আমার ধানের খেতে মগ্ন শালিক,
ফড়িং ওড়া গুনগুনানি ভ্রমরজোড়া
রুপোর ইলিশ নদীর জলে, ঘোলা স্রোতে
শুশুক ভাসে, পদ্মবিলে বালিহাঁসের
ডানায় ফোটা জলের ধোঁয়া
বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে চিল্লাঘুড়ি
ঘুঘুর পায়ে চঞ্চলতা নিঝুমপুরি
রাতদুপুরে হৃদয় খুলে খোঁড়াখুঁড়ি
টাপুর টুপুর জলের নূপুর টিনের চালে
শাপলাপুকুর খোকাখুকুর নিটোল গালে
সোনারঙা হাতের কাঁকন গলার মালা
চিকন কালার গরল জ্বালা সরল বালা,
সকাল গেল, দুপুর এলো, সন্ধ্যা নামে
রাত্রিযামে, ভোরের আলো সবুজ খামে দোয়েল পাখি
বৃষ্টি তবু দূর আকাশে কালো শাড়ি, মেঘের বাড়ি
গভীর ঘুমে শিলের নুড়ি কুড়ায় হেসে ভালোবেসে
স্বপন চুমে দুঃখগুলো চাষির ঘরে গোলায় ভরে,
বৃষ্টি তোমার দেমাগ ভারি, তোমার সাথে ভীষণ আড়ি
ভীষণ আড়ি, ভীষণ আড়ি, কঠিন আড়ি।
বাড়ি যাব
বাড়ি যাব, বাড়ি যাব
বাড়ি আমার অনেক দূরে
পাশের বাড়ির শীতল ছায়ার মতো
নয় তো মোটেও কাছে,
ইচ্ছে হলেই ফুড়ুৎ উড়াল, ছেলেবেলার
পাখি যেমন গাছের ডালে `পলানখেলা`রত
এখন আমি অনেক বড়ো
ঘর বেঁধেছি আরেক পৃথিবীতে;
বাড়ি যাব, বাড়ি যাব
বাড়ি আমার অনেক দূরে
যেখানে মাটির মমতায় আমার বাবার কবর শয়ান
আমার মায়ের শাড়ির আঁচল বাবার কবর ছুঁয়ে
শীতের রাতের `উষে`র মতো ছড়িয়ে আছে
ধানের খেতের কাছে মসজিদের মিনার চুঁয়ে চুঁয়ে
বাড়ি যাব, বাড়ি যাব
আমার মায়ের রঙিন কাঁথার ওমের পরশ পাব;
আমি জানি এখনো পড়শি বাড়ির
উঠোন জুড়ে করবীফুল
থোকায় থোকায় ঝরে পড়ে
কেউ সেখানে সন্ধ্যারতি, তুলসিতলায়
রূপের মাখন মাখে
ফাগুন আঁকা আগুন জ্বলা
কেউ সেখানে করবীফুল
বিচির ফাঁকে বিষের বড়ি রাখে
বাড়ি যাব, বাড়ি যাব
আমি সেই বিষমাখানো ফুলের সুবাস নেব;
বাড়ি যাব, বাড়ি যাব
বাড়ি আমার অনেক দূরে
শুক্রবারের হাটের দিনে
রাতের পিদিম জ্বলে,
জিলিপির ম ম গন্ধ
নিশিরাতে `বন্দ` ফু্ঁড়ে কবন্ধ গানের বাঁশি বাজে;
বাড়ি যাব, বাড়ির পাশে পুকুর পাড়ে আঁশটে গন্ধ
মাছের জোয়ার আসে
বিলের মধ্যে ভূতের বাড়ি
মধ্য বিলের ভূত আমাকে
আগুন জ্বেলে বোয়াল সেজে ডাকে
আমি কানাঅলার সে ডাকটাকে ভুলতে পারি না যে;
বাড়ি যাব, বাড়ি যাব
বাড়ি আমার অনেক দূরে
আমি জানি বাড়ি যেতে আরেক জনম লাগে
নিশির ডাকের শেষে আমি কি আরেক জনম পাব?























