পলিয়ার ওয়াহিদের কবিতা ‘দোআঁশ মাটির কোকিল‘

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২০

অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে কবি পলিয়ার ওয়াহিদের নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘দোআঁশ মাটির কোকিল’। বইটি প্রকাশ করেছে অনুপ্রাণন। প্রচ্ছদ করেছেন আল নোমান। মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণের ২৩১-২৩২ নং স্টলে পাওয়া যাচ্ছে বইটি। ৮০ পৃষ্ঠার এ বইয়ের মূল্য ১৮০ টাকা। ‘দোআঁশ মাটির কোকিল’ থেকে ১১টি কবিতা পাঠকদের উদ্দেশে:

এক.
খেঁজুর রসের মতো আমাদের বাংলা ভাষা সুমিষ্ট মিহিন
আখের গুড়ের মতো লাল এ জনপদের বিপ্লব সংগ্রাম
গমের রুটিতে তবু ফুলে ওঠে স্বপ্ন আশা আহত গ্রামীণ
তবুও যুদ্ধেই কাবু কেন আজো এই বাংলা কৃষকের গ্রাম!

সরিষা ফুলের দেশে সকালের শিশিরের ভেজা মাকড়সা
পাতাঝরা গাছে গাছে কান পেতে শোনা যায় বসন্তের গান
প্রকৃতির অপরূপ সুষমা দুচোখে মেখে বুক টানটান
আমের মুকুলে ওড়ে— পুরুষ মৌমাছি একি আশার ভরশা?

ডাকে পাখি ভাষা যেন আমাদের কাছাকাছি যুদ্ধের পুরাণ
পাশাপাশি দাঁড়ায়েছে মসজিদ ও মন্দির মানুষ নূরান
কাঁঠালিচাপায় ঘেরা এই দেশ— মানচিত্র মাটির ভূগোল
মায়ের পুত্রের মতো প্রেমিক ও প্রেমিকায় আমরা যুগল

দোআঁশ মাটির ছেলে আমি বীজ পুতে করি প্রভুর অর্চনা
মাংসের কুড়ালে কাটি হাওয়াদের আলো— মাটি প্রেমের বন্দনা।

দুই.
গমবনে মানুষ হলাম— আমি ভেতোশাক
আকাশ উত্তীর্ণ হয়ে বুঝি
ভুলে গেছি— মাটিবর্তী মানুষের গান!

বেলেশাকের কথায় ধরো—
নিজেকে বিছিয়েছে সে— মাটির বিছানা
ভালোবাসি থানকুনি পাতা
তবুও বন্ধুরা হলো— শিয়ালের কাঁটা!

হাঁটি— জাজিমের মতো রক্তিম আকাশ
আবার মুখস্ত করি গাভীন যে গমক্ষেত!

তিন.
আমার প্রেমিকার মুখ পাকা ধানক্ষেতের মতো সচ্ছল
প্রতিমার মতোন নিখুঁত তার চোখ ও নাকের গড়ন
যাকে পাঠের পর ধানের শীষের ন্যায় নুয়ে পড়ে মন
মন খারাপের মৌসুমে তার চোখ ও মুখের বীজতলায়
জমাট বাধে সদ্য লাঙলে চষা নরম থলথলে কাদা
যেন এখনি চুমু রোপণের সমূহ ছলছল হাতছানি
তালপাখার বাতাসের মতো ঠাণ্ডা তার বুক!
যেখানে সকল দীর্ঘশ্বাস কলমিফুলের মতো নীলাভ কোমল
শারীরিক ঘ্রাণে শিশুর মতো অবুঝ হয়ে পড়ি!
যেন এখনি সব ক্লান্তি তার সবুজ ব্লাউজে মুখ থুবড়ে পড়বে!

তার গায়ের রঙ রসালো আপলের মতোন কোমল
সে যখন অভিমানে সোনালু লতার মতো দোল খায়
রক্তজবা ফুলের মতো তার নাভিতে ঝড়ে পড়ে স্বাদের ঠোঁট
তবু তার বটের পাতার গাঢ় গায়ে ল্যাপ্টানো তুলতুলে মন
শারীরিক ছায়ার আবডালে লুকানো অন্য রহস্যের ইশারা
মহুয়ার ঠোঁট গমের রুটির মতো সুস্বাদু এবং তার কপালে বসানো
মধু সঙ্গী পুরুষ মৌমাছিকে ক্ষমা করার মতো উদার তার টিকলি
আর চোখের ভ্রু যেন পানসি নৌকো!
এখনি চড়তে না পারলে শিওর স্বর্গ্ন হারানোর আফসোস!

সে আমার পৌরুষ ডালে ফুটে আছে ভুঁইচাপা ফুলের মতো
যেন পৃথিবীর অন্যকোনো ভূমির চেয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল!

চার.
বলতে পারবে নাকি যাযাবর উড়ন্ত আকাশ
কেন বা পেলাম আমি ভবঘুরে পাখির স্বভাব
বসন্তে কেন যে বলতে গেলাম বেদনা নিজের
গোপন ডালে কি তবে বাঁধা ছিল সুরের নূপুর
জীবনে পাবে কি তারা কোনো রূপ; উজ্জ্বল দুপুর
বলতে পারবে ওগো ভোরেরও মুখরা বাতাস
কেমনে পেলাম আমি বিদ্রোহী ডানার স্বভাব?

সাধনা করেই তবে হলে মিথ্যে রঙের মানুষ
জানতে পারিনি কেউ তাহাদের চরিত্রের ছায়া
বুকের পাথরে তবু ঘষে ছিলাম দূরন্ত মায়া
কেন আমি মিল খুঁজি অন্য রঙের ভেতর
কী করে জুটলো তবে এতসব বিরাট অমিল
বলতে পারবে কীগো ভাষাহীন সূর্যের চাষারা
কেন যে পেলাম আমি নবান্নের আলোর স্বভাব?

পাঁচ.
সমস্ত দিনটা গেল খাঁটি বর্ষা ঋতুর মতো
অতীব রমণীয়
আকাশে দেমাকি ঘ! এই বুঝি ফেটে পড়বে আমার উপর!
ধরণী শীতল হলেন—
আকাশের শরীরে ধবল রোগীর মতো ছড়িয়ে আছে মেঘ
যেন সমস্ত দুধে কেউ ঢেলে দিছে টক!

ছয়.
মায়ের কথা খুউব... মনে পড়ছে। মাটির কথাও। বাবার মাঠের ধান কেমন আছে? খুব ইচ্ছে করছে তাও জানতে। দাদির তইতইগুলো; সারাদিন কানের কাছে প্যাক প্যাক করে। নানির হাতের চুড়ি দুটো; নানা মরার পর কেমন যেন রংচটা হয়ে গেছে! পীরো চাচা মরলো— মনা কবরে গেল— আলি হাসানের টুকটুকে মেয়েটাও নাকি চলে গেছে জম্মের মতো! কাউকে দেখতে পেলাম না।

মা, আমি তোমার কাছে থাকবো— আর মাটির ঘরে শোবো। আমার আর কোনো চাওয়া নেই। আমি কৃষকের ছেলে মা— মাটিজলকাদা ছাড়া কীভাবে বাঁচি?

বাবা; তুমি মন খারাপ করলে নাকি? তুমি মাটিতে বীজ দাও— আমি এসে মমতার মই দেব।

সাত.
এইসব পাতাঝরা দিনে
মায়ের স্নেহের স্মৃতি সাঁতরাই মনে
কত কত শীত খেয়ে গেছে
বয়ে গেছে দক্ষিণা সময়—
কবে থেকে ঝরে পড়ে আছি!

জামের পাতার মতো জড়ো;
শীতের রসের মতো গাঢ়
ভোরের আগুনে পোড়ে নাড়া
কোকিলের মুখে মুখে সাড়া

আমি তো ভুলেই গেছি প্রতিবেশী নাচ
আমার গতরে মাখা শহরের কাচ!
দাদির শিয়রে বসে স্বজনেরা আজ
পাড়ার মহিলা ফেলে রেখে সব কাজ
আমার মুখের কথা—
আমার চোখের ভাষা
বুঝে ফেলে তারা
কতদিন দেখি নাই অন্ধকার!
মিটিমিটি জ্বলে থাকা আকাশের তারা

কইমাছ দুধ-দই
আমন ধানের খই
সরু পিঠের নকশাগুলো
চালকোটা ঢেঁকি-কুলো
পড়ে আছে বড় অবহেলা
যশোর জংশন শুয়ে
আমার অপেক্ষা গুণে কাটায় সে বেলা!

আট.
ধানচাষ করা লস
তারচেয়ে লাভ চাল কিনে খাওয়া
একথা আব্বাকে বলি আমি
আমার নিরিখে তিনি বললেন—
তোমরা শিক্ষিত অঙ্কে পাকা!
লাভ-লসের হিসেব
সহজে কষতে পারো তাই
আমি তো কৃষক; ফসল প্রেমিক মন
প্রেমিকা গাভিন ধান ছাড়া
দেহের গোলা কি দিয়ে ভরবে বাজান!

নয়.
চাষ করে আব্বা শুকনো মাটি ও জল
চারা পেতে বীজ দেন আকাঙ্ক্ষার ফল
ধান বুনা শেষ
শালিকে শালিকে ক্ষেত মেতে ওঠে বেশ
সবুজে সবুজে ঘেরা ছোট ছোট মাঠ
আলবাঁধা ভূঁই যেন জলে আঁকা খাট
এই বুঝি মা এলেন, মার নাম শোরা
থালে পান্তাভাত নুন-নারকেল কোরা
খেঁজুর গুড়ের মতো কাদা
বাবা চেয়ে চেয়ে দেখেন মা যেন রাধা
সে কাঁদায় গা এলিয়ে শুয়ে আছে ধান
ভেজানো সুপোরি দিয়ে বাবা খান পান

পৌষে মোষ মাঘে বাঘ ফুলে ফাল্গুন
চৈত্রের গরম ঠোঁটে বাবা দেন চুন
কীভাবে কাটছে ধান বোশেখের মাস
ফসলের গন্ধ মেখে বাড়ি ফেরে হাঁস
ঘরের চালের ’পর বাঁকা ভুরু চান
আমার গ্রামের নাম বাজান... বাজান...

পৃথিবী লাগছে পিছু বাঁচান বাঁচান
গ্রামকে শহর নয়, সিটি হোক গ্রাম

দশ.
ঝিনুক কুড়াতে গিয়ে মুক্তার লোভ চোখে জমে গেলে কতটা অন্যায়?
এমন কবিতা লেখার পর চিঠি এলো— সাদা কাগজের উপর
ভাভি ঠোঁটের নিরেট ছাপ।
খোসা ছোলা কমলার কোয়ার মতো চুপচাপ বসে আছে।
সিজেনালি তরমুজ কাটার মতো ফালি করে রাখা রক্ত—
কেউ তোমাকে খুনি ডাকবে না!
আমি জানবো— তুমি ঘাতকদের সময়ে জন্ম নেয়া দূর্বাঘাস।

এগার.
এখন ধানকাটার দিন। ফল পাকার কাল। সময়ে অসময়ে বটের লালচে ফলগুলো ঝরে পড়ছে। ডালে বসে কাকা করছে বিভ্রান্ত কাকিনী। শীতল ছায়ায় বসে কয়ে কটা বিষণ্ণ কৃষক নিরিখ করে তাকিয়ে আছে পাকাক্ষেতের দিকে। শহরের সাইন দেখে একজন কৃষক আমাকে জিগাই— তবু দেশটাকে বিক্রি করতে চাইছে কারা? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হলে আমার কি উত্তর থাকে বলুন? কি খড়খড়ে রোদ! আকাশে তবু মেঘের ডাকাত। এত প্রেম কেন ধানে? গান গাইছে লাঙ্গল কাকা। আবাদের ভূঁইয়ে। দূরের মাটিয়ালি গানে হৃদয় ভেঙে যায়। সুর ছাড়া তখন পৃথিবীর সবকিছু পর মনে হয়। মরা থুড়ে মাছের ঠোঁট দেখে তবু জীবনে ফিরে আসতে হয়!

দেশপ্রেম, সেতো— দাদির পানের বাটা থেকে চুরি যাওয়া মুনিয়ার টুকটুকে ঠোঁট।


কবি পরিচিত: জন্ম: ১৩৯১ বাংলা সনের ২৬ ফাল্গুন, পাঁজিয়া, কেশবপুর, যশোহর। মনোবিজ্ঞানে লেখাপড়া শেষে ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে কর্মরত। প্রকাশিত বই: পৃথিবী পাপের পালকি (কবিতা; মপ্রকাশন, ২০১৫), সিন্ধ ধানের ওম (কবিতা; দোয়েল প্রকাশনী, ২০১৬), হাওয়া আবৃত্তি (কবিতা; ষোলপৃষ্ঠা প্রকাশ, ২০১৬), মানুষ হবো আগে (কিশোর-কবিতা; দোয়েল প্রকাশনী, ২০১৭) এবং সময়গুলো ঘুমন্ত সিংহের (কবিতা; অগ্রদূত এন্ড কোম্পানি, ২০১৮)।