পাঁচ কবির ৫ কবিতা
প্রকাশিত : নভেম্বর ১১, ২০১৮
শাহরুখ পিকলু
ভোট
জোয়ারে ভাসছে সব
বন্যা নয়, উন্নয়নের রব।
ভোট আসছে, ভোট এসেছে
দিকে দিকে লোক ছুটেছে,
চায়ের দোকানে কাপে কাপে ঠোকাঠুকি
হালের চাষা ভাবে, এবারে কপালে কী!
রিকশা রেখে শোনে সে কিছুকাল
লাগবে নাকি আবার হরতাল।
উৎসব, ব্যাটা উৎসব, ভোটের মেলা
শুনে ভাবে, আবার সেই পুরান খেলা!
মেলায় যেয়ে পাব কি এবার টিকিট
নাকি সেবারের মতো আগে থেকেই সব ফিট।
মুখ সামলে ব্যাটা, কি কইতে তুই চাস
ভোট না দিলে কেমনে তুই কিছু পাস!
পাই নাকি? বলে রিকশায় ফিরে
একই কাণ্ড তো দেখছি বারে বারে।
কেমুন? কি কছ? হুঙ্কার দিয়ে ওঠে
প্যাডেল মারে আর বুলি তার ঠোঁটে,
এক হুণ্ডা, দুই গুণ্ডা ভোটের কেন্দ্র পুরা ঠাণ্ডা!
ফরিদ সুমন
একদলীয় জোট
আঁচলের ব্যারিকেড তুলে নাও
বুকের দেয়ালে সেঁটে দেব
সমঝোতার রাঙা পোস্টার।
আঙুলে আঙুলে সংলাপ হবে।
দাবি-দাওয়া টুকটাক; বেশি কিছু নয়
ঘুম ঘুম বালিশের কাজলছায়ায়
আমি শুধু খুঁজে নেব সোহাগী প্রণয়।
এইসব অবরোধ-হরতাল চাই না আমি
অভিমানের মেঘ প্রত্যাহার করে দেখো
কবিতার ইশারায় থেমে যাবে লংমার্চ।
সমস্ত বিপ্লবী শব্দেরা আমার
মুহূর্তেই হয়ে যাবে ইরানি গোলাপ।
আর কোনো অভিযোগ নয়
অনুরাগের আঁচে জ্বলে উঠুক রাত।
সবটুকু দূরত্ব মুছে গেলে পরে
আমরা দুজনে হবো ষোলো কোটি ভোট।
ক্ষতি কী, কী-ই বা লোকসান
কাঁপা ঠোঁটের যৌথ ইশতেহারে
এক অধিবেশনেই যদি পাল্টে দিতে পারি
সাতচল্লিশ বছরের পুরনো সংবিধান!
রিফাত বিন সালাম
কবি বন্ধুর মৃত্যু বিষয়ক শোকগাথা
এইমাত্র এক কবির মৃত্যু হলো
উনি আমাদেরই বন্ধু ছিলেন
ভালো ছিলেন
সরল ছিলেন
সৎ ছিলেন
গতকাল এক রাজনৈতিক কর্মীর
হত্যার ঘটনায় উনি নিশ্চুপ ছিলেন
উনি অরাজনৈতিক
রাষ্ট্রীয় লুটপাটে উনি কোনো অংশ নেননি
অতএব পক্ষে-বিপক্ষেও যাননি
তার আগে আজ সকালে সরকারি হরতালে
এক নবজাতকের মৃত্যু হয়
ওই শিশু এই কবির বংশের অংশ না
কবি ওই শিশুকেও চিনতেন না
উনি স্রেফ খবরটা পড়েছিলেন
কাউকে অভিযুক্তও করেননি
সাহিত্য নিয়ে বেশ ভালোই ছিলেন
কবিতায় ছন্দও ছিল
নির্বাচনে ভোট দিতেন
ট্যাক্সও সব পরিশোধ আছে
একটা ছোট চাকরি
তিন রুমের বাড়ি
এক পুত্র সমেত নারীবাদী-স্ত্রী
সৎভাবেই জীবন কাটিয়েছেন
এইমাত্র জ্যোছনা বিষয়ক
কবিতাও লিখেছেন
এইমাত্র তার মৃত্যু হয়েছে
আমরা শোক জানাচ্ছি
নাঈমুল হাসান হিমেল
ভ্রুণ হত্যা
গত পরশুর কথা মনে আছে তোমার?
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা
তারপর, তারপর অন্ধকার
মিষ্টি জোনাকি নয়
নয় জ্যোছনার মৃদু স্পর্শ
আমার হাতে জুটেছিল একরাশ ভেজা ঘাস
মনে আছে তোমার?
ঘাসগুলোতে শিশিরের কোমল স্পর্শ ছিল না
ছিল কিছু উষ্ণ রক্ত
সেই রক্তে আমার কেঁপে উঠেছিল প্রাণ
মনে আছে তোমার?
আমি আঁতকে উঠেছিলাম
প্রিয়তমা, লাল টিপ পরে ছিল হয়তো
হয়তো খোঁপার ফুলগুলোর স্নিগ্ধতা
রাঙিয়ে ছিল তার সমস্থ মুখাবয়ব
হয়তো কম্পমান ঠোঁটগুলো
লজ্জায় আরও লাল হয়েছিল।
হয়তো ওড়নাটা মৃদু বাতাসে উড়ছিল
সামলাতে হিমসিম প্রিয়তমা।
নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ প্রিয়তমা।
যৌবন যার প্রখর যথার্থই ধৈর্য তার কম।
তুমি কল্পনা করেছ?
গভীরে গিয়েছিলে তুমি?
আমি চোখ বুলিয়ে ছিলাম সে ঘরে
ঘরের ভেতর যে প্রাণ ছিল
প্রাণের ভেতর কি আশাই না ছিল
কি স্বপ্নই না ছিল
কি ঘোরেই না মিলে ছিল তারা
ভালবাসা ভালবাসা আর ভালবাসা
পবিত্র বহিঃপ্রকাশ
কি লোভই না ছিল চার চোখে
শুধু উপেক্ষিত ছিল বাস্তবতা।
মৃদু হাসিতে, লাজুক চোখে
প্রস্থান হয়তো প্রিয়ার,
কে জানে হয়তো অজানা গৌরব
মাখা হাসি ছিল প্রিয়ার ঠোঁটে।
হয়তো যৌবনের সুখ
গৌরব করে বলেছিল বন্ধুদের
যৌবন সুখের গল্পের ভাবনার
উল্লাস করেছিল সদ্য
যৌবন বিজয় করা ছেলেটা
আমি তাকে দেখতে চাই।
হ্যাঁ,আমি তোমাকে বলছি
আমি তাকে দেখতে চাই।
তুমি ভেবেছ কখনও
এই গৌরব এই আনন্দ এই লোভ
এই ভালবাসা
কত দিন স্থায়ী হয়েছিল?
কি নির্মম বাস্তবতা ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল?
হয়তো কয়েক মুহূর্ত
প্রিয়ার লাজুক চোখে ভয় জেগেছিল
অনুভব করেছিল বাস্তবতার অস্তিত্ব।
নিজের ভেতরে এক অচেনা সত্তা।
হয়তো ভয়ে ভয়ে হয়তো
সুখের ছটায় বলেছিল প্রিয়কে
সে অস্তিত্বের কথা
প্রিয় কি গ্রহণ করেছিল?
ভেবে দেখেছ তুমি?
আমি বলছি একবার ভাবো
আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না
আমার চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে
কি পাপ ছিল সে বাস্তবতার?
পলিথিনে মুড়ে পরে রয়েছে এই মাঠে
এই ঘাসে,
বাস্তবতা মুখ থুবড়ে পরে রয়েছে।
একটা ফুলের কলি
ফোটার আগেই বোঁটা ছিড়ে ফেলা হয়েছে।
যার রক্ত আমার হাতে
ঘাসে, পথে
আমি ভাবতে পারছি না
একটা জীবন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে
হত্যা করা হয়েছে তাকে
কোনো থানায় মামলা হয়নি
কোনো আদালতের নথিতে লিপিবদ্ধ হয়নি
এই হত্যার কথা
কেউ শাস্তি পায়নি।
তুমি ভেবে দেখেছ?
যে গর্ভে আমি তুমি
নিরাপদ ছিলাম
সেই গর্ভেই তাকে হত্যা করা হয়।
পাপ মুক্ত হতে
কি পাপই না করি আমরা।
সৈয়দ রিয়াদ হোসেন আকাশ
বাঁধন হারা
চলে যেতে চাও?
যেতে দেব না দূরে,
যত দূরে যাবে, আমিও যাব তোমা সাথে।
যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম
যা চেয়েছিল আমাদের হৃদয়
তা কেন থামিয়ে দিলে মাঝপথে?
সুর বেঁধেছিলে এ বেসুর হৃদয়ে,
কেন থামিয়ে দিলে সুর ছিন্ন করে?
বাঁধন কেন গেল ছিড়ে
যা ছিল না ছেড়ার
কেন ঝড় তুললে আমার অন্তরে?
আগে তো বেশ ছিলাম দুঃখকে সাথি করে
কেন ভালোবেসে আবার নতুন স্বপ্ন দেখালে?
কেন বান্ধন ছিন্ন করে বেঁধে দিলে দুঃখ?























