অলঙ্করণ: পাপিয়া জেরিন
পাপিয়া জেরিনের একগুচ্ছ কবিতা
প্রকাশিত : এপ্রিল ২৮, ২০১৮
প্রজায়িনী
জানি তুমি ধ্যানী, প্রেমিক। চার্চে গিয়ে শুধু আমাকেই চেয়ে এসেছো। তোমার কাছে পৌঁছে দিতে আমাকে
কত ধ্বংসযজ্ঞ মেনে নিতে হলো পৃথিবীর;
আমার অবুঝ শিশুরা! নধর ডাহুক ভেবে ওরা জাপটে ধরেছে কয়েকটা উড়ুক্কু মিসাইল; পোড়া পালকের মতো খসে গেছে ওদের পেলব আঙুল। বিষণ্ণ স্তনের পাশে ওরা নুড়ির মতো ঝরে আছে, দ্যাখো!
তুমি ধ্যানী। শুধুমাত্র আমাকেই চেয়ে বসে আছো ঈশ্বরের কাছে। অথচ শিশুরা ছিল, আরও প্রজনিকা
বৃক্ষ, জল, পাখি,পতঙ্গ;
দ্যাখো, শুধু আমাকে পৌঁছে দিতে
কতশত শহর গুড়িয়ে দিলো ঈশ্বর!
এখন এই ক্ষীরোদতনয়া চাঁদ, তার নিচে একা দাঁড়িয়ে আমি। পাশে বিদীর্ণ স্তন-ধোয়া নদী, আর এই ন্যুব্জ প্রত্ননগরী!
ঠিক এইভাবে চেয়েছিলে?
ক্রসফায়ারের আগে
প্রেমিকা বলেছে, আমি পলায়নপর
বাবা বলেছে, পালিয়ে যা তুই!
আজ, একশত ষোলো দিন পর
প্রেমিকার শরীরের মতো কবরের ফাঁদে
পড়ে আছি;
ওরা আমার দাঁতগুলো ভেঙে দিয়েছে
পা দুটো দুমড়ে মুচড়ে...
মেহগনি বনে শুয়ে আছি অবসন্ন কাঠ
এইসব বনের ভিতর আমি কতবার কেটে রেখেছি মানুষ
রক্তের বুদ্বুদ দিয়েছি শিকড়ে
আজ সেই রক্তের কাছে একশত ষোলো দিন শেষে
পড়ে আছি অবসন্ন কাঠ!
পাতা ফুটো করা রোদের বুলেট
সারি সারি অস্ত্র ঝুলে আছে মাটির উপর
প্রেমিকা বলেছিল, আমি পলায়নপর,
পুলিশও জানে;
পড়ে আছি ভাঁজ হয়ে মায়ের জঠরে যেমন,
যেমন কবিতা শেষে যতিচিহ্ন পড়ে থাকে শেষ অবসাদে,
আর অতীত পাশে ধাত্রীর মতো স্থির-
দেখি, হাঁটু গেড়ে বসে আছি মাঠে
সেইখানে ফুলভরা ফ্রক তুলে ধরে আছে মেয়ে
ব্যথার মতো ফুল, ফুলের মতো কীট!
জিভের প্রাচীরে লবণ জমে আছে
আর কিছু রক্তের কালো দানা
এমন লবণ নিয়েছি ঝিনুকের মুখ শুষে
দেবদারু পায়ের ভিতর!
বাবা বলেছিলো, `পালিয়ে যা`
প্রেমিকা বলেছে, আমি পলায়নপর
স্মৃতিরা চলে যাচ্ছে রেলগাড়ি
আমি পড়ে আছি অবসন্ন প্ল্যাটফর্ম
রাইফেল তাক করা আছে
অপেক্ষিত মিনিট-সেকেন্ড-বিট
মনে হলো মেলায় দাঁড়িয়ে আছি
হাতের মুঠোয় চিনি-গড়া বাঘ, হাতি
বাবা বলছে, হারিয়ে যাবি, খোকা!
মরে মাছি হয়ে গেছি
তোমার পেটের উপর পাতা আছে ভ্রমজাল
সেটা নাভি নয়, ঊর্ণনাভি
সেইখানে চোখ মরে কবে মাছি হয়ে গেছে,
এইভাবে কে বলেছে আগে!
তুমি জানো, আমি কবি!
সঙ্গম শেষে আমার প্রেমে জাগে মৃতকল্প চর
স্নেহ শেষে ঘুমায় শিশু মৃতবৎ
রাতের ভিতর শুধু জেগে থাকি রাত হয়ে
এইভাবে কে বলেছে আগে!
তোমার অর্গল খুলে দেখাও লেবুফালি চাঁদ
তোমার দেরাজের ভেতর আছে মৌন সরোবর
কৌটার ভিতর পতঙ্গ অসুরবিনাশী
এইভাবে কে বলেছে, বলো?
প্রিয়তম, বয়সের খোসা ভেঙে জেগে ওঠে রাত
তার ভিতর তুমি সময়ের দাগ
সেই দাগের কাছে ভ্রমজাল পেতে আছো
সেইখানে চোখ মরে কবে মাছি হয়ে গেছে;
এইভাবে কে দেখেছে আগে?
সকালে হতে থেকেছি গোপন রোদ
সকালে হতে চেয়েছি গোপন রোগ
সেই কবে চোখ মরে মাছি হয়ে গেছে
এইভাবে কে হয়েছে আগে!
এইভাবে কে বলেছে, বলো!
যেতে যেতে
এই পায়েহাঁটা পথে কতদূর চলে আসি
দেখি, আরো কত লোক হাঁটে দ্বিধাহীন
তারা কেউ ভীত নয়,
পথের পাশে পা মেলে অপ্রকৃতস্থ মেয়ে
ফুলে ওঠা লাশের মতো তার পোয়াতি শরীর
কারো ছুড়ে দেয়া রুটি খেতে খেতে
সেও ভেবে বসে মারিয়ামের মতোই
এ সকল শিশুর পিতা আর কেউ নয়, অদ্বিতীয় ঈশ্বর;
আরো দূরে আসি,
দেখি মাঠে মাখা শৈশব
কিশোরীর বুকে হুড তুলে রাখা কুচি
উড়ে যাচ্ছে উড়ে যাচ্ছে,
ফুঁড়ে ঢুকছে বয়স্ক-যুবক ও তার নাভিশ্বাস।
পেছনে সারি সারি গাছ
উঠানে শত শত বেজোড় শালিখ,
এ পথে যেতে যেতে দেখেছে কেউ
অসংখ্য রমণীর ধসেপড়া বুক
পৌত্তলিক পুরুষেরা নাকি
দলে দলে যোগ দিচ্ছে ক্রুসেডে,
তাদের ঝোলার ভেতর ঝুকে আছে সেক্সডল;
এই পায়েহাঁটা পথে জানি না কতদূর এসে গেছি
হাঁটতে হাঁটতে দেখি...
চলে এসেছে ভবিষ্যৎ!
উত্থিত উত্থান
দেখেছি ভাস্কর
তোমার শরীরের ভিতর উত্থিত হার্পুন
তাক হয়ে আছে ফঁ-দ্য-গউমের দেয়ালে দেয়ালে;
নিসর্গ থেকে টেনে তোমাকে করেছি টানটান
প্রতিটা মোচড়ে, ভাঙনে- প্রতিটা বিন্দুর উলম্ব রেখায়,
উৎক্ষিপ্ত জলের পিঠটানে বেঁকে গেছে তোমার চারপায়া জলপোকা!
তোমাকে দাঁড় করায়ে নিচে থেকে দেখেছি, ভাস্কর
চাপা পড়ে আছে পলিযুগ, অমসৃণ ঢেলা, টেরাকোটা নির্মোক, বিরল ফণী
তার উপরে নাভিকণ্টক-
যেন কেশর সমেত ঝুঁকে আছে সবুজ জামরুল;
তোমাকে উপুড় করায়ে দেখেছি
মোসেসের ইশারায় দুই ভাগ হয়ে আছে চাঁদ
গলেছে ছাতিম দুধের কষ,
সর্পগন্ধার মতো বেঁকে আছে রোম, সেজদায়।
নিসর্গ থেকে টেনে তোমাকে দাঁড় করায়ে রেখেছি, ভাস্কর
প্রতিটা বিন্দুর উলম্ব রেখায়,
তোমার ভিতর উত্থিত হার্পুন তাক করে আছে
ফঁ-দ্য-গউমের দেয়ালে দেয়ালে!























