পাপিয়া জেরীনের দশ কবিতার তাফসির

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৮, ২০১৮

সময়ের কাতরতা

কবিতা: ক্রসফায়ারের আগে

প্রেমিকা বলেছে, আমি পলায়নপর
বাবা বলেছে, পালিয়ে যা তুই!
আজ, একশত ষোলো দিন পর
প্রেমিকার শরীরের মতো কবরের ফাঁদে
পড়ে আছি;
ওরা আমার দাঁতগুলো ভেঙে দিয়েছে
পা দুটো দুমড়ে মুচড়ে...
মেহগনি বনে শুয়ে আছি অবসন্ন কাঠ
এইসব বনের ভিতর আমি কতবার কেটে রেখেছি মানুষ
রক্তের বুদ্বুদ দিয়েছি শিকড়ে
আজ সেই রক্তের কাছে একশত ষোলো দিন শেষে
পড়ে আছি অবসন্ন কাঠ!
পাতা ফুটো করা রোদের বুলেট
সারি সারি অস্ত্র ঝুলে আছে মাটির উপর
প্রেমিকা বলেছিল, আমি পলায়নপর,
পুলিশও জানে;
পড়ে আছি ভাঁজ হয়ে মায়ের জঠরে যেমন,
যেমন কবিতা শেষে যতিচিহ্ন পড়ে থাকে শেষ অবসাদে,
আর অতীত পাশে ধাত্রীর মতো স্থির—
দেখি, হাঁটু গেড়ে বসে আছি মাঠে
সেইখানে ফুলভরা ফ্রক তুলে ধরে আছে মেয়ে
ব্যথার মতো ফুল, ফুলের মতো কীট!
জিভের প্রাচীরে লবণ জমে আছে
আর কিছু রক্তের কালো দানা
এমন লবণ নিয়েছি ঝিনুকের মুখ শুষে
দেবদারু পায়ের ভিতর!
বাবা বলেছিল, পালিয়ে যা
প্রেমিকা বলেছে, আমি পলায়নপর
স্মৃতিরা চলে যাচ্ছে রেলগাড়ি
আমি পড়ে আছি অবসন্ন প্ল্যাটফর্ম
রাইফেল তাক করা আছে
অপেক্ষিত মিনিট-সেকেন্ড-বিট—
মনে হলো, মেলায় দাঁড়িয়ে আছি
হাতের মুঠোয় চিনি-গড়া বাঘ, হাতি
বাবা বলছে, হারিয়ে যাবি, খোকা!

তাফসির: ক্রসফায়ারের আগের মুহূর্তে কী ঘটে মানুষটির মনে যে কিনা গুলিবিদ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা শরীরে নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তখন যেন সে ফিরে যায় নিজের সব অতীত হতে থাকা পাপ, সন্তাপ, ভালোবাসার কাছে। কবির চোখে সেসব দেখা সম্ভব। যেমনটি দেখেছেন পাপিয়া জেরীন। তার `ক্রসফায়ারের আগে` কবিতাটি সরল ও গভীর। `প্রেমিকা বলেছে, ‘আমি পলায়নপর`, আর বাবা বলেছেন, `তুই পালিয়ে যা`। দুই তরফের সম্পর্কের কাছে নিজেরে ঠাঁই খুঁজে না-পাওয়া পুরুষটি পরে `প্রেমিকার শরীরের মতো কবরের ফাঁদে` আটকে থাকে। এই প্রেমিকা তার আধুনিক ঠিকানা বা নতুন যোগাযোগ/সম্পর্ক। তার আগে মা ও বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। ক্রসফায়ারের পর মৃত শরীরটাকে তার এমনও মনে হয় যেন `মায়ের জঠরে` সে পড়ে আছে। কবির দার্শনিকতায় ক্রসফায়ার শুধু জীবন হারানো নয় তা একটি স্মৃতিরও মৃত্যু, সম্পর্কেরও অবসান। তা নিয়তিবাদের মতো। পালিয়ে উপায় থাকে না পুলিশের কাছ থেকে। ধরা পড়তেই হয়। অমোঘ কোনো ঘটনা যেন। জীবনের আকুতি, বেঁচে থাকার, স্বাদ অবলম্বন সব ছিন্ন হয়ে যায়। এক `অবসন্ন কাঠ` হয়ে শুয়ে থাকতে হয় তাকে।

কবির পরকীয়জনিত নৈতিক সংকট

কবিতা: কবি

নতমুখ কবি,
এইখানে আত্মগোপনে
প্রেমিকার জেরার মুখে আপনাকে
বলে যেতে হয় মিথ্যার মতো মিথ;
বলেছেন তাকে—
স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলে আপনি প্রেমিকার কাছে ছোটো হয়ে যান!
দেখেন, আপনার প্রেমিকার মতো অনিচ্ছুক সঙ্গম শেষে আকাশে কেমন উল্টায়ে আছে প্রকাণ্ডকায় চাঁদ!
আপনিও প্রতিরাতে লিখে চলেছেন ডিজিমডার্ন পোয়েট্রি,
নর্দমার কীট খেয়ে নিচ্ছে আপনার উৎসারিত বঙ্কিম শিশুদের;
আপনি নতমস্তকে, আর
শিশ্নের মতো দৈবচয়িত অক্ষর নেমে আসে কখনো ভোররাতে,
আসে আলমোরা আর সিকিমের পাহাড়ি হলদেটে মেয়েমানুষ
ময়ূখ মুদ্রাসমেত মেকরান নটীদল—
অথচ, আপনাকে জেরার মুখে বলে যেতে হয় মিথ্যার মতো মিথ
স্ত্রীকে বলেছেন, কিউনিফর্মের মতো গাঁথা আছে খাগের কলম
আর প্রেমিকা জানে—
স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলে আপনি তার কাছে ছোটো হয়ে যান!

তাফসির: কবির সত্ত্বা বা আত্মপ্রবঞ্চনা ইত্যাদির খোঁজে অনেকেই কবিতা লিখেছেন। পাপিয়া জেরীনও লিখেছেন। অন্যান্য পুরুষ কবিদের মতো করে পুরুষ হয়ে তিনি নারীর সামনে কবিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন অপরাধী হিসেবে। যে পুরুষ কবি স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলে প্রেমিকার কাছে ‘ছোট হয়ে’ যায়। কবিকে নৈতিকতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন কবি পাপিয়া জেরিন। এক টানাপড়েনের মধ্যেও ফেলে দেন তাদের। কবি পরকীয়াজনিত সমস্যায় পড়ে গ্লানিতে ভোগে এবং তা থেকে বের হতে পারে না। আবার গ্লানিকেই তার কবিজীবনের আরাধ্য ভাবে।
পাপিয়া জেরীনের ‘কবি’ কবিতায় কবি অজাচারি, স্বেচ্ছাচারি, ধর্ষকাম। তার প্রেমিকা সঙ্গম শেষে উল্টে পড়ে থাকে, মনে মনে ভাবে পরকীয়ারত কবির কথা। ‘ডিজিমর্ডান’ বলতে পাপিয়া জেরিন এখনকার আধুনিকতম, ফেসবুকে রাতজাগা কবিদের বোধহয় বুঝিয়েছেন। যাদের উৎসারিত বঙ্কিম শিশুদের খেয়ে নিচ্ছে নর্দমার কীট। কবিতার নামে ইন্ডিয়ার আলমোরা, সিকিম বা পাকিস্তান মকরান অঞ্চলের মেয়েরা আসে কবির কাছে। কিন্তু স্ত্রীকে কবি শোনায় ভিন্ন কথা, বলে মিথ ও কিউনিফর্মের কথা। প্রেমিকাও সব জানে না, সে শুধু স্ত্রী অন্তসঃত্ত্বা হলে কবির অপরাধবোধের খবরটুকু জানে।

অনুভূতিময় অভিসার

কবিতা: এই জ্বর ঘোর লাগা রাতে

এই জ্বর ঘোর লাগা রাতে
তোমার শরীরে গজাই
কয়েকশ একর কাগজীলেবু বন,
দুধে ভেজা রুটির মতো
শুষে নিতে থাকি অধরান্ত জিভ
আঙুল ডুবায়ে রাখি অতলান্ত গহ্বরে
অপাঙ্গ-জল, জলের আঘাত
রোমে রোমে মন্থিত শ্বেত পারিজাত!
ফের অতিক্রান্ত কালোয়
আবেস্তার পাতায় পাতায় খুঁজি—
শিফা-ই-গুল;
এই জ্বর ঘোর লাগা রাতে
কেন আহরিমান খুলে রাখে বুক!
আমি সত্য-শিব ভুলে খুলে দিই গোপন দেরাজ,
চুষে নিতে থাকি তোমার অধরান্ত জিভ;
এই ঘোর লাগা রাতে কুয়াশার হোমকুণ্ড ভাঙে
নামে ধুন্ধুকার পীড়ন,
জন্মান্ধ চোখ নিয়ে দেখি—
আঁধারে ঝরে আছে পারস্য গোলাপ!

তাফসির:  ‘এই জ্বর ঘোর লাগা রাতে/তোমার শরীরে গজাই/কয়েকশ একর কাগজীলেবু বন,’ এই জ্বর ঘোর লাগা রাতে কবিতায় পাপিয়া জেরীন অনুভূতির এক অন্যথায় নিয়ে যান পাঠককে। দেহময় এক অভিসার। তা নৈতিক কী অনৈতিক সেই প্রশ্ন পরিষ্কার হয় না যদিও। তবু অনুভবে আসে জ্বরের ঘোরে শরীরে এক অন্য জায়গা তৈরি হয়। শরীর নিয়ম আর বিধির সীমানা ছেড়ে দিয়ে অন্যলোকে যেতে চায়। ‘রোমে রোমে রোমাঞ্চিত শ্বেত পারিজাত’। যেন শরীরের এক নিজস্ব রূপান্তর ঘটে। পারস্য ও হিন্দু মিথের এক যুগল সমন্বয় কবির প্রতিভাকে এখানে আলাদা করে ফুটিয়ে তোলে। তবে প্রেমের অমোঘ টানই তার নিয়তি বা গন্তব্য। প্রেম দিয়ে তিনি বিপথের খুলে রাখা বুকে ডুব দিয়ে দেন ঘোরের মধ্যেই। শরীরে তিনি কাম ও প্রেমে ফুটিয়ে তোলেন পারস্য-গোলাপ।

কাকে বলে কবি?

কবিতা: বিনিয়ত ব্যাবর্ত

রাত খুঁড়ে খুঁড়ে তুলি যত আঁধারের মুখ
অশরীরে শুধু শরীর জেগে থাকে,
জমে রক্তপ্রাচীরেও কিছু লবনের দ্বিপ।
বিনিয়ত যত কামনা দূরে ঠেলে দিয়ে
আকাশে উদার হই, দেখি দূরতম নক্ষত্র হতে
অদৃশ্য সুতা আসে, দেখি বন্ধনহীন কতো
মৃতবামনেরা শুকায়ে নিঃসাড় ;
তারায় তারায় ধরে যতো আকর্ষ-প্রেম...
তবে কেউ পতনযোগ্য নয়।
তবু, রাতভর পৃথিবীর বুকে নক্ষত্র জ্বালি,
ভোর কাছে এলে...
পাগড়ির ভাঁজ থেকে ঝরে কিছু মেস্ক-জাফরান
আর আমার হৃদয় হয়ে ওঠে সুরভিত আঞ্জির!

তাফসির: কবি এক নিঃসঙ্গ আর বেদনাগ্রস্ত অভিযাত্রী। ‘রাত খুঁড়ে খুঁড়ে সে তুলে আনে যতো আঁধারের মুখ’। নিজের এতদিনকার যেসব কামনাকে রেখেছিল সংযত তা দূরে ঠেলে দিয়ে সে দেখে অগণন মানুষের কষ্ট। তাদের নিঃসঙ্গতা কবির বিচরণ নক্ষত্রলোকের মতো, যেখানে সবাই বড় একা ও তাদের মধ্যে পরস্পরকে ভালোবাসার আকুতিও রয়েছে। কবি সেসব অবলোকন করে এবং আরো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। কারণ কবির সত্য সহসা বাস্তব হয়ে ওঠে না। ফলে তার একাকীত্ব বাড়ে।এই কবিতার আরও দুটি কালাম ‘তবু, রাতভর পৃথিবীর বুকে নক্ষত্র জ্বালি,/ভোর কাছে এলে-। কবি এসব বেদনাকেই মেশক-জাফরান করে তোলেন, তার হৃদয় অজস্র না-পাওয়া ও পাওয়া এক সমাহারে হয়ে ওঠে ‘সুরভিত আঞ্জির’।

দেহবাদী দর্শন

কবিতা: বুক

চারদিকে কোলাহল
মাঝখানে নৈঃশব্দের মতো তোমার বুক;
গলিতে পিঠাউৎসব
লাউড স্পীকার, হল্লা
অথর্ব কিশোর,মাঘমেসে কুকুর—
চলৎশক্তিহীন পিতা
গোঙাচ্ছে তো গোঙাচ্ছেই...
চারপাশে তীব্র নরকবাস
চুলোয় উতরোচ্ছে দুধ
শিশুর জ্বরপ্রলাপ
মা অকথ্য গালাগাল
দিয়ে যাচ্ছে তো দিয়ে যাচ্ছেই...
চারপাশে মরুদ্বীপ
মাঝখানে চিরহরিৎ তোমার বুক
মুঠিবদ্ধ চুল চেপে ধরে আমাকে নিয়ে যাচ্ছো উজানে
পাতার মুখ ফুঁড়ে উঠে আসছে কলি
চারপাশে নৈঃশব্দ্যের মতো শীত
মাঝখানে তোমার কবোষ্ণ বুকে
শ্বাপদের কোলাহল, নিঃশ্বাস
তাড়া করে ফিরছে তো ফিরছেই!

তাফসির: পাপিয়া জেরিনের অন্যরকম ভালোলাগার আরেকটি কবিতা ‘বুক’। বাংলার দেহবাদী দর্শন পাপিয়া জেরীনের কবিতায় অনেকভাবেই এসেছে। একইসঙ্গে তিনি ফারসি, সংস্কৃত ও ইউরোপীয় মিথ, শব্দ, ব্যঞ্জনার ব্যবহারে নিজের কবিতাকে একটি অন্য মার্গে উপস্থাপন করে থাকেন। বুক কবিতাটি জটিলতা পরিহার করে, সরল কাব্যে আপন কথাটি বলেছে। একজন নারীর, পুরুষের, শিশুর জন্য সংসারের শত কোলাহল ও বিরূপতার মধ্যেও পরম নির্ভরতার একটি বুক কোথাও থাকে। হতে পারে সেটি কবির বুক। কবিতাটি পাপিয়া এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন মনে হয় এক শরীরের মধ্যেই আমাদের সব সংসারেরর বাস। যার নিচেই শ্বাপদের কোলাহল, তবু সেই বুক নিরাপদ বিশ্রামের জায়গা হয়ে ওঠে। এই কবিতার ঢঙ ও ভাষা সাম্প্রতিক যা পাপিয়ার বহুমুখীনতাকে জানান দেয়।

মানুষের আদিকাব্য

কবিতা: একুশতম আঙুল

ওরা গিয়েছিল ট্রান্সিলভ্যানিয়ান পর্বতে
সমগ্র বল্কান চষে পায়নি তোমার ধাতব হাত
অথচ, আলপাইনে খনির ভিতর
তোমার একুশতম আঙুল আমার শরীরে
গেঁথে ছিলো—
ধাতব ছুরির মতো।
ওরা দেখেছিলো—
ভেড়ার দাঁতের ভিতর ঘাসের মিহি হাড়
আর আমার সোনালি চুলের শরীরে
তোমার পৌরব রোদ, সভ্যতার কালো ভ্রূণ;
পুরোনো হাড়গোড় আর দিনলিপি দেখে জেনেছিল—
দানিয়ুব আর কাস্পিয়ানের জলেজঙ্গলে আমরা দুজন লবণ ধুয়েছি, মিলিত হয়েছি অধীর সঙ্গমে,
ওরা তখনও সমগ্র ভূমধ্যসাগর চষে পায়নি তোমার
দুইশত সাততম হাড়,
অথচ, সে অদৃশ্য হাড় আমার শরীরে গেঁথে ছিল
ধাতব ছুরির মতো!

তাফসির: মানুষ তার ইতিহাসে নিজেকে খুঁজে বেড়িয়েছে বহুকাল ধরে। কিন্তু মানুষের প্রেম ও যৌনতার চেয়ে আদি ইতিহাস আর নাই অথবা দার্শনিকভাবে পাওয়া যায় না। কবি পাপিয়া জেরীন একুশতম আঙুল কবিতায় পাঠককে সেই ‘সত্য দর্শনের দিকে নিয়ে যান। আদি ইতিহাসে নরনারীর যে প্রেম তার বিকাশ ও সভ্যতার চাবি সেই রূপ পাপিয়া জেরীন তুলে ধরেছেন কবিতায়। বাংলা ভাষার কবিতায় এই কবির একটি নিজস্ব দর্শন আছে। তার একটি নিজস্ব ভঙ্গিও আছে এবং ভাষার ব্যবহারে তিনি বেশ পারঙ্গম। তার এই কবিতার উছিলায় কথাগুলো বলে নেওয়া গেল। তিনি অযথা নারীবাদীও নন। প্রকৃতিকে নিরপেক্ষভাবে দেখার চোখ তার আছে।

কবিতার অলৌকিক শর্ত

কবিতা: রাত

আমি রাত!
নেমে এসেছি তোমার উপর,
বিগতশোকে, প্রত্যাখ্যাত রমণীর চুলে... জঙ্ঘার তীলে কিংবা কুঞ্চিত বৃন্তেও এতোটা আঁধার ছিল না।
আমি রাত!
গ্রাস করেছি শুক্রবিন্দুর মতো আলো,
তোমার ঘর্মাক্ত সমুদ্রযান, উদয়ের তটরেখা;
তোমার প্রেয়সীর ঘুমের কর্পুর
উড়ে যেতে যেতে জেনে গ্যাছে
আমি এলে—
তোমার স্বপ্নের ভিতর নেমে আসে
এক অদ্বয় অলকানন্দা রাত!
আমি না এলে—
বিফল সংঘাতে
ঘটে চলে কবিতার ধ্বজভঙ্গ।

তাফসির: কবিতা কখন নাজেল হয় আর কোথায়ই বা নাজেল হয়। এমন প্রশ্ন মনে জাগবে পাপিয়া জেরীনের রাত কবিতাটি পড়লে। শুরুতে মনে হবে রাত বলতে রাতই বুঝাচ্ছেন কবি। শেষে গিয়ে চমক ভাঙবে এ রাত যে কবিতা রনামার রাত, অন্ধকার। সেখানে কবির স্বপনে যা আসলে ভাব, সেই ভাবের জগতে কবিতা নাজেল হবে। এই ভাব না থাকলে বা ভাবটা অন্তর ও বাহিরজুড়ে সব গ্রাস না-করলে কবিতা আসবে না। ফলে শুধু কবিতা লিখলেই সেটা আর কবিতা হলো না, ‘ধ্বজভঙ্গ’ বলে পাপিয়া জেরীন একটা গালিও দিয়ে দিয়েছেন সেসব কবিতাকে। যেসব কবিতা ভাবের অভাবে থাকে। আর ভাবটা রাত কেন? কারণ তাতে জগতের সবকিছুর সঙ্গে থেকেও একা থাকা হয়।

নারীর পৃথিবী কেমন

কবিতা: যেতে যেতে

এই পায়েহাঁটা পথে কতদূর চলে আসি
দেখি, আরো কত লোক হাঁটে দ্বিধাহীন
তারা কেউ ভীত নয়,
পথের পাশে পা মেলে অপ্রকৃতস্থ মেয়ে
ফুলে ওঠা লাশের মতো তার পোয়াতি শরীর
কারো ছুড়ে দেয়া রুটি খেতে খেতে
সেও ভেবে বসে মারিয়ামের মতই—
এ সকল শিশুর পিতা আর কেউ নয়, অদ্বিতীয় ঈশ্বর;
আরো দূরে আসি,
দেখি মাঠে মাখা শৈশব
কিশোরীর বুকে হুড তুলে রাখা কুচি
উড়ে যাচ্ছে উড়ে যাচ্ছে,
ফুঁড়ে ঢুকছে বয়স্ক-যুবক ও তার নাভিশ্বাস।
পেছনে সারি সারি গাছ
উঠানে শত শত বেজোড় শালিখ,
এ পথে যেতে যেতে দেখেছে কেউ
অসংখ্য রমণীর ধ্বসে পড়া বুক
পৌত্তলিক পুরুষেরা নাকি—
দলে দলে যোগ দিচ্ছে ক্রুসেডে,
তাদের ঝোলার ভেতর ঝুকে আছে সেক্সডল;
এই পায়েহাঁটা পথে জানি না কতদূর এসে গেছি
হাঁটতে হাঁটতে দেখি...
চলে এসেছে ভবিষ্যৎ!

তাফসির: নারীর মনে যে পৃথিবী, পাপিয়া জেরিনের ‘যেতে যেতে’ কবিতাটি এবং তার সঙ্গে মেলানো ছবিটা দেখলে মনে পড়বে  পিকাসোর বিখ্যাত চিত্র ‘গুয়ের্নিকা’র কথা। নারী পথের পাশে অপ্রকৃতস্থ পোয়াতি মেলে শরীর যেন ফুলে ওা লাশ। কিন্তু দ্বিধা নাই এসব নিয়ে সমাজের মনে। এই নারীর পেটে যে সন্তান তার জন্মদাতাও সেই ‘অদ্বিতীয় ঈশ্বর’, এমন এক নিয়তি ও বিশ্বাসের মধ্যে নারীকে ঠেলে দেওয়া হয়। তাছাড়া তার বেড়ে ওঠার, তার যাওয়ার পথে পথে যে অবমাননা, বিবমিষাময় দৃশ্য সেসবও নারীর মনে এক বিভৎস পৃথিবীকে এঁকে যায়। পুরুষ তার মনের একান্তে নারীকে ‘সেক্সডল’ হিসাবে লালন করে তবু ইতিহাসে তারা মহিমান্বিত।

মুখোমুখি আল মাহমুদ

কবিতা: খিস্তি-কাব্য

রণসঙ্গমে বর্ম খুলে রেখে তুমি হাতে তুলে নাও আল মাহমুদ ও আরো কিছু কবি, শীৎকার নয় বরং
প্রলাপের মত চলতে থাকে সোনালী কাবিন-জলবেশ্যা,
কবি! তুমি কাব্যের মতো... দেহের বদলে শুধু দেহই দিতে চাও, আর আমি চাই এর চেয়ে অধিক কিছু;
সুললিত পদ্য ছেড়ে চলে আসো এইখানে
এক হাঁড়ি মহুয়াজল গিলে বের করে আনো
থলের বিড়াল, এবার একরাশ খিস্তি- কাব্য হোক।
কবি আমার! সংকোচের আধখানা হৃদয়
ভিজায়ে রাখো চুম্বন রসে,
মারিয়াম ফুল প্রসারিত হোক অলিন্দ-নিলয়
কৃতদাস কিংবা প্রেমিক কেন? তুমি—
বিদ্রোহানলে এসো, যাতে একটি শারারায়
জ্বলে ওঠে নাভি-নিতম্ব-পদ্মদাম।
কবি! অনেক ডেকেছো `প্রিয়তমা` বলে
এবার মহুয়ার রস গিলে খিস্তি-কাব্য ছাড়ো—
ডেকে যাও মাগী-মধু নামে!

তাফসির: কবি পাপিয়া জেরীনের কাব্য ভাবনা গভীর ও বিস্তৃত। কবি হিসাবেতোর যে ভাব তা অপ্রচলিত। তিনি দুঃসাহসীও বটে। যে কারণে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠিত কবি আল মাহমুদকে তিনি নিজের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন আর কত সুললিত থাকবেন আল মাহমুদ। এবার তিনি কিছু খিস্তি করুন। অর্থাৎ বিদ্রোহ করুন, মনের রাগ ঝেড়ে ফেলুন। প্রমিত ভঙ্গিতে তার যে কবিতা সেখানে পাপিয়া জেরিন আড়ষ্টতা দেখতে পেয়েছেন। আল মাহমুদকে বলছেন সেসব ভেঙে অপ্রমিত হতে। বাংলা কবিতার জগতে এই যে ভাষার লড়াই তাতে এক কবিকে আহ্বান করেছেন আরেক কবি। কবি পাপিয়া জেরীন চাইছেন দেহাতীত কিছু। ভাষার মধ্য দিয়ে দেহকে আর খুলতে, আর তল ধরতে, আরও উদযানের দিকে যেতে। এ কবিতাটি অনন্য।

নতুন বিদ্রোহ হানো

কবিতা: দ্রোহ

পথের দাবিদাওয়া, স্বাধিকার
ভাষার অধিকার,
মানচিত্র মুখ, জলসীমা, গোলপাতা বন
দ্রোহের চিহ্ন হয়ে সেজে আছে পাঁজরে তোমার
এইবার বুকের ওপর একশো গ্রেনেড রেখে
একটি ভূখণ্ডের মতো আমাকে দাবি করে বসো;
ধরো গহীন অরণ্যে তোমার গেরিলা ট্রেনিং
নির্বিকার চিতাচোখ, তীব্রতর গতি—
স্ক্রলিং করে নেমে এসো
পাহাড় বেয়ে এই উপত্যকায়,
ঝান্ডার মতো পুতে দাও
আমার শরীরে তোমার শরীর
এরপর আত্মঘাতী হও;
সেইদিন জলকামানের মুখে
বুক পেতে দিয়েছিলে—
গ্রীবাদেশ ছিড়ে নেমে এসেছিল
শিরা উপশিরার ঢল
গর্জনে কেঁপে উঠেছিলো বুবিট্র্যাপ স্থলমাইন
আজ ঠিক এইখানে তেমন শীৎকার চাই!

তাফসির: পাপিয়া জেরীনের কবিতায় বিদ্রোহের একটা সুর পাওয়া যায়। সেটা ‘দ্রোহ’ কবিতায় আলাদাভাবে আছে। সেখানে নতুন বিদ্রোহের ডাক। আদর্শিক বা কাল্পনিক বিদ্রোহ ছেড়ে শরীরী বিদ্রোহের ডাক। যেখানে শরীরকে নিয়োজিত করতে হয়। সঙ্গমের মতো করে সেই বিদ্রোহে ভেসে আসবে শিৎকার। যাতে নিয়োজিত করতে হবে নিজেকে পুরোটাই, দিতে হবে সর্বস্ব। পেতে হবে সুখও। প্রতিকী রূপে বিদ্রোহকে ফুটিয়ে তোলার মেধা পাপিয়া জেরীনের আছে। এই কবিতায় তা আরও বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। তার কবিতা সদা চঞ্চল, উদার ও বিদ্রোহী। তিনি সৎ কবি, তার মঙ্গল হোক।

 

তাফসিরকার: সালাউদ্দিন শুভ্র