অলঙ্করণ: পাপিয়া জেরীন

অলঙ্করণ: পাপিয়া জেরীন

পাপিয়া জেরীনের পাঁচটি কবিতা

প্রকাশিত : জুন ২৬, ২০১৮

মরে মাছি হয়ে গেছি

তোমার পেটের উপর পাতা আছে ভ্রমজাল
সেটা নাভি নয় ঊর্ণনাভি—
সেইখানে চোখ মরে কবে মাছি হয়ে গেছে

এইভাবে কে বলেছে আগে!

তুমি জানো, আমি কবি!
সঙ্গম শেষে আমার প্রেমে জাগে মৃতকল্প চর
স্নেহ শেষে ঘুমায় শিশু মৃতবৎ
রাতের ভিতর শুধু জেগে থাকি রাত হয়ে—

এইভাবে কে বলেছে আগে!

তোমার অর্গল খুলে দেখাও লেবুফালি চাঁদ
তোমার দেরাজের ভেতর আছে মৌন সরোবর
কৌটার ভিতর পতঙ্গ অসুরবিনাশী—
এইভাবে কে বলেছে, বলো?

প্রিয়তম, বয়সের খোসা ভেঙে জেগে ওঠে রাত
তার ভিতর তুমি সময়ের দাগ
সেই দাগের কাছে ভ্রমজাল পেতে আছো
সেইখানে চোখ মরে কবে মাছি হয়ে গেছে;

এইভাবে কে দেখেছে আগে?

সকালে হতে থেকেছি গোপন রোদ
সকালে হতে চেয়েছি গোপন রোগ
সেই কবে চোখ মরে মাছি হয়ে গেছে—
এইভাবে কে হয়েছে আগে!
এইভাবে কে বলেছে, বলো!

প্যরাডক্স

রাত্রি দ্বিপ্রহরে কাটে কুয়াশার মেঘ
চাঁদ হয়ে ওঠে অমোচনীয় কলঙ্ক আবার,
বাদামি মথের মতো আমি
ফিরে পাই সম্বিৎ
প্যাঁচার ডানার আঘাতে;

দেখি বৈধ প্রেমের দূরত্ব যোজন
মলিন চোখ— স্মৃতি রৈখিক মুখ,
আর স্মৃতিতে বিরল যিনি
হতেছেন ভবিতব্য মহাকাল;

সুদূরে নৈকট্য, নৈকট্যে ভ্রম
স্বরূপের অপরূপে— উপসর্গ হীনকায়
দ্বিধার নিশ্চিতি, দোদুল ধ্রুবক—
দেখি প্রেমেতে প্রেমেতে ঘৃণার আহুতি
ঘৃণায় প্রণয় বিকার।

রাত্রি দ্বিপ্রহরে কাটে কুয়াশার মেঘ
চাঁদ হয়ে ওঠে অমোচনীয় কলঙ্ক আবার!

অবেলায়

একটা দুর্বার বিকেল
পৃথিবীর অর্ধেক পুরুষ জেলেনৌকা নিয়ে ভেসে আছে কালদরিয়ায়;

এই বিকেলে, রুপালি বটি বরাবর দুইভাগা হয়ে গেছি।
শেষ কশেরুকায় গোর খুঁড়ছে লোমশ নেউল—
উঠে আসছে মেদ, তরুণিমা হাড় আর বিষল মধুকূপি রোম।

একটা দুর্বার বিকেল, অর্ধেক পুরুষের পেয়েছে শবেদের ঘুম। শরীরের গলে পড়া মোমে জমে গেছে নিরুপায় কীট। সরে যাওয়া কৌপিনে ফুলে ওঠা নির্বিষ নাগ!

একটা বারুণের মতো চৌকাঠে আমি, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে দারুণ শলাকা হয়ে গেঁথে আছে পাপ, অপাপ। আষাঢ়ের ঝাপটায় ধুয়ে গেল পাটুয়া আঁচল, গন্ধক শ্বাসমূল।

এই দুর্বার বিকেলে অর্ধেক পুরুষ ভেসে গেছে কালদরিয়ার, বাকি অর্ধেক পড়ে আছে শবেদের ঘুমে।

আঙুলের পাকে সলতের মতো আমি, প্রদীপের নিচে তরুণিমা হাড়... বিষল মধুকূপি রোম!

বিনিয়ত ব্যাবর্ত

রাত খুঁড়ে খুঁড়ে তুলি যত আঁধারের মুখ
অশরীরে শুধু শরীর জেগে থাকে,
জমে রক্তপ্রাচীরেও কিছু লবণের দ্বীপ;

বিনিয়ত যত কামনা দূরে ঠেলে দিয়ে
আকাশে উদার হই, দেখি দূরতম নক্ষত্র হতে
অদৃশ্য সুতা আসে, দেখি বন্ধনহীন কত
মৃতবামনেরা শুকায়ে নিঃসাড়—
তারায় তারায় ধরে যত আকর্ষ-প্রেম
তবে কেউ পতনযোগ্য নয়।

তবু, রাতভর পৃথিবীর বুকে নক্ষত্র জ্বালি,
ভোর কাছে এলে—
পাগড়ির ভাঁজ থেকে ঝরে কিছু মেস্ক-জাফরান
আর আমার হৃদয় হয়ে ওঠে সুরভিত আঞ্জির!

দুর্যোগ

ঠোঁট-মেশিনে সেলাই হতে হতে ঠোঁট
হৃদিপদ্ম, নাভিমূল, সরোবর
একে একে নিবে যায় চোখ— চাঁদ-শিখা;

আমি ভয়ে ভয়ে পাশ ফিরি
অবাঞ্ছিত তিল ঘেঁষে নামে যুদ্ধবিমান,
খসে যায় কাঁটাতার, রেডক্লিফ লাইন।

ভাঙে লাইট হাউজ—
বাঁধ ভেঙে লোনাজলে ডুবে যায় নদী!