করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৮২৪৪৮৬ ৭৬৪০২৪ ১৩০৭১
বিশ্বব্যাপী ১৭৬১০৪১৫৬ ১৫৯৬৯৯০৯৬ ৩৮০২১৬৫

প্রমথনাথ বিশীর গল্প ‘ধনেপাতা’

প্রকাশিত : জুন ১১, ২০২১

সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীর আজ জন্মদিন। ১৯০১ সালের ১১ জুন নাটোর জেলার জোয়াড়ি গ্রামে জমিদার পরিবারে তার জন্ম। ছাড়পত্রের পক্ষ থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধর্ঘ্য হিশেবে তার লেখা ‘ধনেপাতা’ গল্পটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো:

প্রায় হাজার বছর আগেকার কথা বলিতেছি। কাশ্মীরের অন্তর্গত শ্ৰীনগর সহরের চকে প্ৰাতঃকালে প্ৰত্যহিক বাজার বসিয়াছে। বড় বড় দোকানগুলি সব রাজপুতদের, মাড়োয়ারীদের, কতক কচ্ছিও আছে; ছোটখাটো দোকানগুলি স্থানীয় লোকদের। চকের চার দিকে দোকানঘর; মাঝখানে ফাঁক, সেখানে দুই দুই সারিতে তরি-তরকারি, ফল-মূল, শাকসব্জির দোকান, এমন অনেকগুলি সারি, মাঝখানে লোক চলাচলের পথ। আর পাহাড়ীরা পাহাড় হ’তে জ্বালানি কাঠ, চাকের মধু, মোম প্রভৃতি আনিয়াছে, বাজারের খাজনা এড়াইবার উদ্দেশ্যে তাহারা একেবারে চকের প্রান্তে বসিয়াছে—সীমানার ঠিক বাহিরেই৷

খুব ভোরে বাজার বসে, ভোর হইতেই খরিদার জমিতে থাকে। লোক আসে, কেনে, চলিয়া যায়; আবার লোক আসে, কেনে, চলিয়া যায়—এমনি ভাবে চলিতে থাকে।

আজকের দিনেও বাজারের যেমন দৃশ্য, যেমন হাঁক-ডাক, যেমন জন-জনতা, হাজার বছর আগেও তেমনি ছিল কল্পনা করিয়া লইলে ভুল হইবে না। আমরা যে দিনের কথা বলিতেছি, সেদিন বাজার প্রায় ভাঙে ভাঙে অবস্থা। এমন সময়ে একজন সাব্জিওয়ালা পার্শ্ববতীকে সভয়ে বলিয়া উঠিল—ভাই দেখো, দেখো৷

পার্শ্ববতী সে দিকে তাকাইয়া বলিল—তাই তো, ঠক্কুররা আসছে, এইবার ঝগড়া সুরু হ’ল।

তখন দোকানীরা তাড়াতাড়ি দোকানের দরজা বন্ধ করিতে সুরু করিল, যাহারা বাহিরে বসিয়াছে, তাহারা অবিক্রীত জিনিষগুলি এদিকে ওদিকে সরাইয়া রাখিতে লাগিল, ভুক্তভোগী দু-একজন বিক্রয়ের আশা ছাড়িয়া দিয়া পসরা মাথায় তুলিয়া স্থানত্যাগে উদ্যত হইল৷ সমস্ত বাজারময় একটা ‘রাখ-রাখ,’ ‘ঢাক-ঢাক’ ভাব৷

একজন বলবান লোক বলিল—আর ভাই সেদিন এক পোড়ো ঠাক্কুর আমার পাঁঠার বাচ্চাটা এমনি নিয়ে যায় আর কি৷ আমি চাইলাম ছ’টা পয়সা, দুটো পয়সার বেশী দিলে না৷

—দু’ঘা দিয়ে দিলে না কেন?

—ইচ্ছে তো করছিলো, কিন্তু ওদের যে শরীর, ভয় হ’ল, মটক’রে ভেঙে যাবে!

—যা বলেছ, এদিকে শরীর তো ঐ, কিন্তু সাজের বাহার দেখে মনে হয় রাজপুত্তুর।

—বলে তো তাই! ওরা সবাই নাকি রাজার ছেলে।

—গৌড়ে এত রাজা?

—তা’ হলেই বুঝতে পারছো, সে দেশের অবস্থা কেমন? আমরা একটা রাজার ভার সইতে পারি না।

—রাজপুত্তুর, তাতে আর সন্দেহ কি? পড়বার নাম ক’রে এখানে এসে দিন নাই, রাত নাই, পাহাড়ী মেয়েগুলোর সঙ্গে নাগরপন করা!

—ওদের দেশে কি মেয়ে নেই?

—আরে ভাই, ঐ যে কথায় বলে—‘ঘরকা মুরগী ডাল বরাবর৷’ ওদের মুখে কাশ্মীরী নাশপাতি গৌড়ী আমের চেয়ে অনেক মধুর।

এইরূপ কথাবার্ত্তা চলিতেছে, ইতিমধ্যে গৌড়ীয় ঠক্কুরগণ সব্জিওয়ালাদের কাছে আসিয়া পড়িল।

—সংখ্যায় ইহারা আট-দশ জন হইবে৷

“এই সকল বিদ্যার্থীদের মুখে পান, পরনে ধুতি, গায়ে উত্তরীয়, বাবরী চুল স্কন্ধে লিম্বিত, হাতে ছত্ৰ, নখ লাল রঙে রঞ্জিত; ইহারা ধীরে ধীরে পথ চলে, থাকিয়া থাকিয়া দৰ্পিত মাথাটি এদিক-ওদিক দোলায়; হাঁটিবার সময়ে ইহাদের ময়ুরপঙ্খী জুতার মচ-মচ শব্দ হয়, মাঝে মাঝে নিজেদের সুবেশ-সুবিন্যন্ত চেহারাটার দিকে তাকাইয়া দেখে; আর কটিতে ইহাদের লাল কটিবন্ধ।”

কয়েকজন ভিক্ষুক ইহাদের পিছনে লাগিয়া গিয়াছে। কোন ভিক্ষুক বলিতেছে “সোনার চাঁদ,” কোন ভিক্ষুক বলিতেছে “গৌড়ের রাজা” কোন ভিক্ষুক বা “পঞ্চ গৌড়েশ্বর” বলিতেছে।

অভিধাগুলি বিদ্যার্থীদের ভালই লাগিতেছে মনে হয়; মাঝে মাঝে দু’একজন মুখ ফিরাইয়া দেখিতেছে, কোনো অভিধা নিজের প্রতি কথিত হইয়াছে মনে করিলে ভিক্ষুককে একটি কড়ি ফেলিয়া দিতেছে।

এক ঠক্কুর অপর জনকে বলিল—নরেন্দ্ৰ, তুমি উহাকে কড়ি দিলে কেন? ও ব্যক্তি “পঞ্চ গৌড়েশ্বর” আমাকে বলিয়াছে।

নরেন্দ্ৰ বলিল—ধীরেন্দ্ৰ, এ কেমন তোমার আচরণ, ঐ ব্যক্তি আজি দুই বৎসর আমাকে পঞ্চ গৌড়েশ্বর বলিতেছে।

—বুঝিলে কি প্রকারে?

—আমি যে উহাকে চিনি, লোকটা অন্ধ—

—তাই বলে, অন্ধ বলিয়াই বলিয়াছে। নতুবা—

তখন দীনেন্দ্ৰ বলিল—তোমরা প্ৰকাশ্য বাজারে এরূপ ব্যবহার করিও না, মনে রাখিও, একমাত্ৰ গৌড়বাসিগণই “কৃষ্টিসম্পন্ন”—অন্য কোন দেশের লোকের কৃষ্টি নাই। তাহারা এতদবস্থায় গৌড়বাসীকে দেখিলে কি ভাবিবে?

তখন নরেন্দ্র ও ধীরেন্দ্ৰ একযোগে বলিল—যথাৰ্থ বলিয়াছ! কৃষ্টি রক্ষার্থ আমরা, গৌড়বাসীরা সকল প্রকার সংযম করিতেই পারি, এমন কি, রসনা সংযমও অসম্ভব নহে!

দীনেন্দ্ৰ বলিল—তা ছাড়া বাজার করাও আবশ্যক। সেটাও তুচ্ছ নয়।

—নিশ্চয় নয়, কৃষ্টির সঙ্গে যখন কাঁকুড়ও যুক্ত হয়, তখন তাহার প্রভাব অনস্বীকার্য!

—শুধু কাঁকুড়ই বা কেন? কৃষ্টির সঙ্গে কয়লা।

—কৃষ্টির সঙ্গে কদলী।

—কৃষ্টির সঙ্গে কাঁকরোল।

—কৃষ্টির সঙ্গে কয়েৎবেল।

—কৃষ্টির সঙ্গে কচু।

দীনেন্দ্ৰ বলিল—তোমরা কি মুখে মুখেই বাজার শেষ করিবে? সকলে হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল, বাতাসে বেতের লতাসকল যেমন একযোগে দুলিতে থাকে, তেমনি নিজেদের রসিকতার বেগে তাঁহাদের তনু দেহ তালে তালে এদিক-ওদিক আন্দোলিত হইতে লাগিল।

একজন সব্জিওয়ালা মৃদুস্বরে বলিল—দেখো ঠক্কুর, ভেঙে না যায়।

আর একজন বলিল—দেহটা গেলে সাধের সাজ-পোষাকগুলোর কি হবে?

একজন ভিক্ষুক বলিয়া উঠিল—“মেনকা বাঈ” “মেনকা বাঈ।”

নিজেকে মেনকা বাঈ বলিয়াছে ভাবিয়া প্ৰত্যেক ঠক্কুর ভিক্ষুকের উদ্দেশ্যে একটা করিয়া কড়ি ছুড়িয়া দিল। মেনকা বাঈ শ্ৰীনগরের প্রসিদ্ধ নর্তকী।

এবারে সকলের হুস হইল। নরেন্দ্ৰ বলিল—ভাই, বাজার যে ভেঙে গেল!

—যাবে না? যত সব পাহাড়ী ভূত ভোর না হতেই এসে হাজির হয়। আমরা তো এক প্ৰহরের আগে শয্যাত্যাগই করতে পারি না।

—আর করবোই বা কেন? যারা উড়ে, মেড়ো, ছাতু, তারাই ভোরে ওঠে। কৃষ্টিমানদের একটু বিলম্ব হবেই!

—তা তো হবেই, কিন্তু বাজারে যে কিছুই নাই দেখিতেছি।

ইতিমধ্যে তাহারা এ-দোকান ও-দোকান দেখিতে আরম্ভ করিয়াছে। দোকানীরা গৌড়ীয়দের ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত, বলিতেছে—ওটা বিক্রয় হইয়া গিয়াছে।

—ওটা অমুকে কিনিয়া রাখিয়া গিয়াছে।

—ওটা পচা৷

এমন সময়ে নরেন্দ্ৰ সকলকে তারস্বরে ডাকিল, ও ভাই এদিকে এস, এদিকে এস।

—কি ব্যাপার?

একদল ফড়িঙের ন্যায় ঠক্কুরগণ সে দিকে ছুটিল, কাছে গিয়া দেখিল, কৃষ্টিমান নরেন্দ্র সেই প্রকাশ্য বাজারে, সহস্র দৃষ্টির সম্মুখে মেনকা বাঈয়ের নৃত্যকে পরাজিত করিয়া নাচিতেছে—তাহার হাতে এক আঁটি শাক—

—ধইন্যা পাতা, ধইন্যা পাতা৷

সকলে নৃত্যের কারণ বুঝিল, আরও বুঝিল, ইহার চেয়ে নৃত্যের যোগ্যতর কারণ হইতেই পারে না, কাজেই তাহারাও নৃত্যপর নরেন্দ্রকে ঘিরিয়া নাচিতে লাগিল, সকলেরই মুখে “ধইন্যা পাতা, ধইন্যা পাতা।”

বাজারের লোকে অবাক। ঠক্কুরদের এমন বিহ্বল অবস্থা তাহারা আগে দেখে নাই। কিন্তু সর্বজ্ঞ হইলে তাহারা বুঝিতে পারিত, যে-কারণে কলম্বাস অকুল সমুদ্রে ভগ্ন বৃক্ষশাখা দেখিয়া উল্লসিত হইয়াছিল, ইহাদের উল্লাসের কারণও তাহা হইতে ভিন্ন নয়। গৌড়বাসীর একটি শ্রেষ্ঠ সুখাদ্য ধনেপাতা। বিদেশে বহুকাল পরে অকস্মাৎ সেই ধনেপাতা আবিষ্কার করিয়া তাহারা যেন স্বদেশকেই আবিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে। এমন অবস্থায় আত্মবিস্মরণ সম্ভব এবং তাহা মার্জনীয়৷

বিহবল অবস্থা কাটিলে নরেন্দ্ৰ দোকানীকে শুধাইল—ক’ত দাম?

বেচারা দোকানী ঠক্কুরদের উল্লাস দেখিয়া দাম চড়াইয়া দিল, বলিল—চার কড়ি।

—চার কড়ি!

—সোনার চাঁদ আর কি?

—অর্ধেক রাজত্ব।

—তার সঙ্গে রাজকন্যা।

—কিছু না দিলেই ওর যথার্থ দণ্ড হয়!

—ঠিক, ঠিক, ওকে কিছু দেওয়া নয়—বলিয়া সকলে গৃহাভিমুখে ছুটিল, পিছু পিছু আর সকলেও ছুটিল; তাহদের মুখে “ধইন্যা পাতা” “ধইন্যা পাতা” ধ্বনি; তাহাদের উত্তরীয়, বাবরী, কোঁচা বাতাসে লটপট করিয়া উড়িতে লাগিল, ময়ুরপঙ্খী জুতা আর্তনাদ তুলিল—সবশুদ্ধ মিলিয়া সে এক বিচিত্র দৃশ্য।

কাশ্মীর হইতে কুমারিকা, প্ৰভাস হইতে প্ৰাগজ্যোতিষ পর্যন্ত সমস্ত দেশের লোক রুদ্ধবাক অবস্থায় গৌড়ীয় ঠক্কুরগণের দিকে তাকাইয়া রহিল, অনেকক্ষণ পৰ্যন্ত তাহাদের কথা সরিল না।

অবশেষে একজন শুধাইল—ক্যাও এ লোক বাওরা হয়!

অপারে বলিল—নেহি নেহি, গৌড়মে সব লোগোকোঁ এহি হাল হ্যায়!

পূর্বোক্ত ব্যক্তি বলিল—অচ্ছা দেশ। বাপ রে! বাপ!

দ্বিতীয় ব্যক্তি বলিল—সীয়ারাম। সীয়ারাম।

সব্জিওয়ালা বুক চাপড়াইতে চাপড়াইতে নাগানন্দের চতুষ্পাঠীর দিকে ছুটিল৷



প্ৰবাসী গৌড়ীয় ছাত্রাবাসের আবাসিকগণ ইতোমধ্যেই দুইটি দলে বিভক্ত হইয়া পড়িয়া তর্ক বিতর্ক, তর্জন গর্জন করিতে করিতে হঠাৎ একজন আর একজনের পেটে খাগের কলমাকাটা চাকু বসাইয়া দিয়াছে।

চাকু মারিয়াছে নরেন্দ্ৰ, চাকু খাইয়াছে ধীরেন্দ্র।

এই ঘটনার পরে কিংকৰ্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আবাসিকগণ কেবলই কোলাহল করিতেছে, পাড়ার লোকে বিচলিত হইবার ভাব দেখায় নাই; কারণ, তাহারা জানে, গৌড়ীয় ছাত্রাবাসে আজ ধনেপাতার শাক আসিয়াছে, আজ অনেক কিছুই ঘটিতে পারে।

নরেন্দ্র ও ধীরেন্দ্ৰ সহপাঠী, সহদেশ, এমন কি, তাহাদের সহগ্ৰামী বলিলেও অত্যুক্তি হয় না, এমন ক্ষেত্রে একজন কেন অপরের পেটে ছুরি মারিল, জানিবার ঔৎসুক্য হওয়াই স্বাভাবিক।

ধনেপাতা লইয়া ছাত্রাবাসে ফিরিলে একটি গুরুতর সমস্যা দেখা দিল, ধনেপাতা কি অবস্থায় খাওয়া হইবে, কাঁচা না তরকারির সহিত রাঁধিয়া?

নরেন্দ্ৰ বলিল—আমরা চিরকাল কাঁচা খাইতেছি।

ধীরেন্দ্ৰ বলিল—আমার ঠাকুরমা সর্বদা রাঁধিয়া খাইবার পক্ষে।

—তোমার ঠাকুরমা মূর্খ৷

—কাঁচা খাওয়াই তোমাদের স্বভাব, তোমরা গরু।

তখন ঠাকুরমার প্রকৃতি ও অপর পক্ষের স্বভাব লইয়া যে সব বিশেষণ নিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল, তাহা কেবল গৌড়ীয়গণের মধ্যেই সম্ভব।

ক্ৰমে সমস্ত ছাত্রই এক এক পক্ষভুক্ত হইয়া গেল এবং উত্তেজনা এমন তীব্ৰতা পাইল যে, ক্ষণকালের জন্য ধনেশাকের প্রসঙ্গও বিস্মৃত হইল।

তখন দীনেন্দ্ৰ বলিল—ভাই সব, মনে রাখিও, আমরা গৌড়ীয় ছাত্র, সাধারণ উড়ে বা মেড়ো বা ছাতু নই; কাজেই ঝগড়ায় কাজ নাই, ধনেশাক দুই রকমেই প্ৰস্তুত হোক, যাহার যেমন অভিরুচি খাইবে।

নরেন্দ্ৰ বলিল—এমন হইতেই পারে না, তাহাতে ধনেশাকের অপমান।

ধীরেন্দ্ৰ বলিল—তাহাতে আমার ঠাকুরমার অসন্মান।

আবার কলহ তীব্ৰ হইয়া উঠিল এবং উপায়ান্তর না দেখিয়া নরেন্দ্ৰ ধীরেন্দ্রর পেটে ছুরিকাযুক্তি প্রয়োগ করিল।

এই হঠকারিতায় কেহ অপ্রস্তুত হইয়াচে মনে হইল না, এমন কি ধীরেন্দ্রের ভাবখানাও বিশেষ অসন্তোষজনক নয়, সে যেন মৌন সম্মতির দ্বারা বলিল—গৌড়ীয়দের মধ্যে এমন হইয়াই থাকে।

কিন্তু সমস্যার তো মীমাংসা হইল না। তখন দীনেন্দ্ৰ বলিল—বৃথা কলহে প্রয়োজন কি। এসো, আমরা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শনের দ্বারা সিদ্ধান্ত করি।

তাহার প্রস্তাবে সকলে সন্মত হইল।

গৌড়দেশে একটি চমৎকার প্রথার প্রচলন আছে। কোন গুরুতর সমস্যার অন্য উপায়ে মীমাংসা না হইলে, সমস্যায় স্বপক্ষে ও বিপক্ষে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইবার রীতি বর্তমান। যে পক্ষে বুদ্ধাঙ্গুষ্ঠের সংখ্যা অধিক হয়, সেই পক্ষেরই জিত হইয়া থাকে৷

কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে তাহাতেও মীমাংসা হইল না, যেহেতু কাঁচা শাক ও রাঁধা শাকের পক্ষে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের সংখ্যা সমান সমান হইল। গৌড়ীয় ছাত্ৰগণ সকলেই মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল—এখন উপায়!

দীনেন্দ্র আবার নূতন প্ৰস্তাব করিল, সে বলিল—ভাই, কাঁচাও থাক, রাঁধাও থাক, এসো—আজি আমরা নাসাভোজন করি, ব্যাখ্যা করিয়া বলিল—আজ ধনে শাকের গন্ধ শুকিয়াই ক্ষান্ত হই।

তাহার প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে গৌড়ীয়গণ ক্ষণকাল নিন্তব্ধ থাকিয়াই এমন এক বিকট জয়োল্লাস করিল যে, পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ছাত্রাবাসের ছাত্ৰগণ জানালা দিয়া মুখ বাহির করিয়া জিজ্ঞাসা করিল—ক্যা হুয়া?

গৌড়ীয় ছাত্ৰগণ বলিল—আরো শিয়ালকা মাফিক ‘হুয়ো হুয়ো” মৎ করো।

গৌড়ীয় ছাত্ৰগণ অন্যান্য দেশের লোকের প্রতি সৌজন্য প্ৰদৰ্শন দুর্বলতা বলিয়া মনে করে। বিশেষ তাহাদের ধারণা এই যে, যাহারা গৌড়ীয় ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলিয়া থাকে, তাহাদের প্রতি মনুষ্যোচিত ব্যবহার না করাই প্ৰকৃত মনুষ্যত্বের লক্ষণ।

শেষ পর্যন্ত নাসাভোজন কারই স্থির হইল৷ মাঝখানে ধনেশাকের আঁটি ঝুলাইয়া রাখিয়া সকলে যথেচ্ছ শুঁকিয়া সন্তুষ্ট হইল এবং সে দিনের মতো ধনে শাকের প্রসঙ্গ ঐখানেই মিটিয়া গেল।



শ্ৰীনগরে অবস্থিত নাগানন্দ স্বামীর চতুষ্পাঠী একটি ভারতবিখ্যাত প্ৰতিষ্ঠান। এখানে ভারতের সকল অঞ্চল হইতে বিদ্যার্থী আসিয়া থাকে, গৌড় হইতেও আসে। গৌড়ীয় বিদ্যার্থীরা অধ্যয়নে যেমন পশ্চাৎপদ, নিজেদের ও অন্য দেশের ছাত্রের সঙ্গে কলহে ও দুর্ব্যবহারে তেমনি তাহারা অগ্ৰণী। অন্য অঞ্চলের ছাত্ররা পরস্পরের ভাষা শেখে, গৌড়ীয়গণ অন্য কোন অঞ্চলের ভাষা শিখিবে না, অন্য কাহারও সঙ্গে মিশিবে না, নিজেদের মধ্যে জটিল করে, নিজেদের ছাত্রাবাসের নাম দিয়াছে ‘প্রবাসী গৌড়ীয় ছাত্রাবাস,’ অন্য অঞ্চলের ছাত্রগণ শুধু অঞ্চলটির নামটি উল্লেখ করাই যথেষ্ট বোধ করে, এক কথায়, শ্ৰীনগর সহরে তাহারা ক্ষুদ্র একটি গৌড়দেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে, জিজ্ঞাসা করিলে বলে, সমানে সমানে মিল হয়, গৌড় ও অন্যান্য অঞ্চলে শিক্ষা-দীক্ষার এমন তারতম্য, মিলনের ক্ষেত্ৰ কোথায়?

বৃদ্ধ নাগানন্দ স্বামী পাণ্ডিত্য, প্ৰতিভা ও চরিত্রের জন্য সর্বজনশ্ৰদ্ধেয়, কেবল গৌড়ীয় ছাত্রগণ তাঁহার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাপরায়ণ নহে, গৌড়ীয়গণ নিজেদের মধ্যে বলাবলি করিয়া থাকে, লোকটা পণ্ডিত সন্দেহ নাই, কিন্তু গৌড়ের সীমার বাহিরে জন্মগ্রহণ করিয়াই সব মাটি করিয়া ফেলিয়াছে।

ধনেশাক প্রসঙ্গের পরদিন নাগানন্দ স্বামীর চতুষ্পাঠী বসিয়াছে।

নাগানন্দ স্বামী বলিলেন—গৌড়ীয় ছাত্রদের যে দেখিতেছি না।

একটি মারাঠী ছাত্র বলিল—আচাৰ্য, তাহারা তো সময়মতো কখনই আসে না৷

নাগানন্দ স্বামী বলিলেন—ওটি তাহাদের একটি মহৎ দোষ।

তারপরে বলিলেন, কাল বাজারে কি ঘটিয়াছিল, তোমরা কেহ দেখিয়াছ?

মারাঠী ছাত্ৰটি বলিল—ঐ যে তাহারা আসিতেছে। একেবারে তাহাদেরই শুধাইবেন। আমরা কি বলিতে কি বলিব, গৌড়ীয় ছাত্ৰগণ বড় পরমত-অসহিষ্ণু।

এমন সময় গৌড়ীয় ছাত্ৰগণ প্ৰবেশ করিল।

অন্য দেশের ছাত্ৰগণ প্ৰথমে আচার্যের পাদবন্দনা করিয়া নিজেদের মধ্যে কুশল সম্ভাষণ করিয়া, তবে আসন গ্ৰহণ করে, ইহার সেরূপ কিছুই করিল না। আচার্যের দিকে মাথা দিয়া একটা ঢুঁ মারিবার ভঙ্গী করিয়া সকলে একান্তে বসিয়া পড়িল এবং অনতিনিম্নস্বরে কথাবার্তা বলিতে সুরু করিল।

আচাৰ্য বলিলেন, কাল তোমরা বাজারে কি করিয়াছিলে? একজন দরিদ্র সব্জিওয়ালা আমার কাছে অভিযোগ করিয়া গিয়াছে।

নরেন্দ্ৰ বলিল—আপনার কাছে দৰ্শন পড়িতে আসিয়াছি, পড়ান, ওসব ব্যাপারের মধ্যে আপনি যান কেন?

আচাৰ্য। আমি আর গেলাম কই! দায়ে পড়িয়া সে লোকটা আমার কাছে আসিয়াছিল।

নরেন্দ্র। আপনি রাজা না কোটাল! আপনার কাছে আসে কেন?

আচাৰ্য। তোমাদের গৌড়দেশের রীতি কি জানি না। অন্য সর্বত্র আচার্যের স্থান-রাজা ও কোটালের উপরে। একথা নিতান্ত অশিক্ষিতেও জানে, তাই রাজদ্বারে না গিয়া আমার কাছে আসিয়াছিল।

নরেন্দ্র। আপনি আমাদের দেশ তুলিয়া কথা বলিবেন না।

আচার্য। তোমাদের আচরণেই যে তোলায়, অন্যান্য দেশের ছাত্ৰগণের সঙ্গে তোমাদের প্রভেদ কি বুঝিতে পারো না?

নরেন্দ্র। ওরা ছাতু খায়, ভুট্টা খায়, জোয়ার খায়, চান খায়, পুদিনার শাক খায়।

আচাৰ্য। তাহাতে ক্ষতি কি? যাহার যা খাদ্য।

নরেন্দ্র। ক্ষতি এই যে, ওরা উড়ে, মেড়ো, ছাতু, ভূত। এমন সময়ে একটি গুজরাটি ছাত্ৰ বলিল, তোমরা যে ধনেপাত খাও।

ধীরেন্দ্র। আমাদের খাদ্য তুলিয়া কথা বলিও না।

আচার্য। তোমরা অনেক বেশি তুলিয়াছ।

ধীরেন্দ্র। আপনি উহাদের দিকে টানিয়া বলিলেন।

আচাৰ্য। তোমাদের দিকে ঘেঁষিতে দাও কই?

সেই গুজরাটি ছাত্রটি বলিল—যাহারা তুচ্ছ ধনেশাকের জন্য পরস্পরের পেটে ছুরি মারিতে পারে—

ধীরেন্দ্ৰ। কে বলিল ছুরি মারিয়াছে?

গুজরাটি ছাত্ৰ। তোমার পেটে ও পটি বাঁধা কেন?

ধীরেন্দ্ৰ। তোমার পেটে তো বাঁধিতে যাই নি, তোমার ক্ষতি কি?

আচাৰ্য। এখন বিতণ্ডা থাক। সব্জিওয়ালা দাম পায় নাই, দুটা কড়ি চাহিতেছিল, দিয়া দিয়ো৷

নরেন্দ্র। ওর প্রতি আপনার এত দরদ কেন? কিছু ভাগবখয়া হইয়াছে বুঝি!

তাহার বাক্যে গৌড়ীয়গণ ছাড়া আর সকলেই অষ্টস্তব্ধ হইয়া গেল।

আচার্যের সম্বন্ধে এমন কথা! যাঁহার সম্মুখে স্বয়ং কাশ্মীররাজ আসন গ্ৰহণ করেন না৷

আচার্যের অপমানে অন্যান্য ছাত্ৰগণ এবারে গর্জন করিয়া উঠিয়া বলিল—এখনি আচার্যের পায়ে ধরিয়া ক্ষমা প্রার্থনা করো।

গৌড়ীয় ছাত্ৰগণ স্প্রিংএর পুতুলের মতো লাফাইয়া উঠিয়া বলিল—কখনোই নয়, কখনোই নয়, প্ৰাণ থাকিতে নয়।

সরু সরু লিকলিকে কেঁচো যেমন কুণ্ডলীকৃত অঙ্গভঙ্গী করে, শীর্ণকায় গৌড়ীয় ছাত্ৰগণের কঙ্কালসার দেহ তেমনি পাকাইয়া পাকাইয়া উঠিতে লাগিল! ‘ইস’, আমাদের এমন অপমান! থাকিত আজি গৌড়রাজের সৈন্য৷’

আচাৰ্য আসন ত্যাগ করিয়া উঠিলেন, গৌড়ীয়দের প্রতি বলিলেন, আচরণ সংশোধন করিবার পরে তোমরা এখানে আসিও, আজ বিদায় হও।

গৌড়ীয়গণ চীৎকার করিতে লাগিল—দেখিব, তুমি কেমন ফলন আচাৰ্য, দেখিব, তুমি কেমন চতুষ্পাঠী করো, সব ভাঙিয়া দিব! আমাদের এখনো তুমি চিনিতে পারো নাই, এবারে পরিবে, পারিয়া নাকের জলে চোখের জলে এক হইবে, ইত্যাদি।



পরদিন প্ৰাতঃকালে নাগানন্দ স্বামী তাহার কুটীরের দ্বার খুলিয়াই দেখেন যে, গৌড়ীয় বিদ্যার্থিগণ ঠিক দরজার সম্মুখেই সারি বাঁধিয়া শুইয়া আছে, পা ফেলিবার জায়গা নাই।

তিনি শুধাইলেন—বাপু, তোমরা এখানে এভাবে শুইয়া পড়িলে কেন?

একজন বলিল—আমরা প্ৰায়োপবেশন করিতেছি।

নাগানন্দ। প্ৰায় উপবেশন আর কোথায় ? ইহাকে তো শয্যাগ্ৰহণ বলে।

গৌড়ীয় বিদ্যার্থী। ইহাই প্ৰায়োপবেশনের রীতি।

নাগানন্দ। আচ্ছা, না হয় তাহাই হইল; কিন্তু কাশ্মীর রাজ্যে কি আর স্থান ছিল না? আমার দরজার সম্মুখে কেন? বাহির হইব কি উপায়ে?

—আমাদের বুকের উপর দিয়া হঁটিয়া যাও।

নাগানন্দ। তোমাদের যে পাখীর বুক, মচ করিয়া ভাঙ্গিয়া যাইবে। কিন্তু বাপু, প্ৰায়োপবেশনের উদ্দেশ্য কি?

—আপনার মত পরিবর্তন করাইতে চাই।

নাগানন্দ৷ আমার অপরাধ কি?

—কাল আপনি আমাদের অপমান করিয়াছেন।

নাগানন্দ। লোকের ধারণা তো ঠিক অন্যরূপ, তোমরাই আচার্যের সঙ্গে অনার্যোচিত ব্যবহার করিয়াছ।

—আবার অপমান করিলেন। আমাদের অনার্য বলিলেন।

নাগানন্দ। বলিলে অন্যায় হয় না, কিন্তু সত্যই কি বলিয়াছি?

—সে লোকে বিচার করিবে। এই আমরা শুইয়া রহিলাম, আপনি যা পারেন করুন।

অগত্যা নাগানন্দ স্বামী ঘরের মধ্যেই রহিতে বাধ্য হইলেন। অধিকাংশ বিদ্যার্থী শুইয়া রহিল, কেবল জনদুই একটা জগঝম্প পিটিয়া লোকের মনোযোগ আকর্ষণ করিতে লাগিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ভিড় জমিয়া গেল।

সকলে অবাক। এমন দৃশ্য তাহারা কখনো দেখে নাই। সকাল গেল, দুপুর গেল, সায়াহ্ন আসিল, না উঠিল বিদ্যার্থিগণ, না থামিল জগঝম্পের বাজনা৷

ভিড়ের মধ্য হইতে একজন বলিল—তোমরা কি স্নানাহার করিবে না?

—না৷

—তোমরা কি আচাৰ্যকে বাহিরে আসিতে দিবে না?

—তিনি স্বচ্ছন্দে বাহিরে আসিতে পারেন, আমরা আটকাই নাই।

—ইহাকেই তো আটকানো বলে।

—মোটেই নয়, ইহাকে বলে সাত্ত্বিক প্রায়োপবেশ৷

—কিন্তু আচাৰ্যও যে প্ৰায়োপবেশন করিতে বাধ্য হইতেছেন।

—আমরা তাহার কি করিব?

রাত্ৰি আসিল। ভিড় কমিয়া গেল। কিন্তু প্ৰায়োপবেশকদল উঠিল না, বাজনাও থামিল না। নাগানন্দ ঘরের মধ্যে বন্ধ রহিলেন, কিন্তু অভুক্ত রহিলেন না। তিনি যোগী পুরুষ, যোগবলে ঘরে বসিয়াই খাদ্য সংগ্ৰহ করিয়া আহার করিলেন। অভুক্ত বিদ্যার্থীদের কথা স্মরণ করিয়া তাহার দুঃখ হইল, ইহাতে বুঝিতে পারা যায় যে, যোগবলেও জীবনের সব রহস্য উদ্ঘাটিত হয় না। তিনি আধুনিক কালের লোক হইলে নিরস্তু উপবাস করিতে বাধ্য হইতেন।

এই ভাবে তিন চার দিন গেল। প্ৰতিদিনই ভিড় বাড়িতে লাগিল। সকলে দেখিয়া অবাক হইল যে, বিদ্যার্থিগণ আজ চার দিন অভুক্ত, অথচ দিব্য প্ৰফুল্লমূর্তি, মুখে ক্লেশ বা অনশনের চিহ্নমাত্র নাই।

কেহ বলিল—উহারা মায়া জানে।

কেহ বলিল—উহারা যোগী।

কেহ বলিল—ক্ষুধাতৃষ্ণ জয় করিবার কৌশল শিখিবার উদ্দেশ্যে একবার গৌড়ে যাইতে হইবে দেখিতেছি।

অবশেষে ব্যাপারটা রাজার কানে পৌঁছিল। তিনি মন্ত্রীকে দিয়া উপবাস ভঙ্গ করিতে বলিয়া পাঠাইলেন। বিদ্যার্থীরা সন্মত হইল না। অবশেষে রাজা কোটালকে আদেশ করিলেন, সৈন্য দিয়া ছাত্রদের যেন ঘিরিয়া রাখে, নতুবা লোকে তাহাদের বিরক্ত করিতে পারে।

এই আদেশ শুনিয়া বিদ্যার্থীরা ঘোরতর আপত্তি করিল, বলিল-তাহা হইলে রাজদ্বারেও প্ৰায়োপবেশন সুরু করিতে হইবে দেখিতেছি।

রাজা বলিলেন—থাক, বাদ দাও, উহাদের ভালোর জন্যই ঘিরিয়া রাখিবার কথা বলিয়াছিলাম, উহারা না চায়, নাই ঘিরিয়া রাখিলে, আমার কি শিরঃপীড়া!

আরও চার পাঁচ দিন গত হইল। রাজা বিশেষ উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলেন, একটা অঘটন ঘটিয়া গেলে গৌড়েশ্বর কি বলিবেন। তিনি রাজবৈদ্যকে পাঠাইয়া দিলেন, বলিলেন,—যাও, একবার পরীক্ষা করিয়া দেখ, ছাত্রদের শরীরের অবস্থা কিরূপ?

বিদ্যার্থীরা রাজবৈদ্যাকে কাছে ঘেঁষিতে দিল না।

রাজা প্ৰধান অমাত্যগণকে পাঠাইয়া দিলেন, একবার কহিয়া দেখো, অনশন ত্যাগ করে কি না!

বিদ্যার্থীরা কাহারো কথা শুনিল না, বরঞ্চ চীৎকার করিয়া বলিতে লাগিল, আগে নাগানন্দ মত পরিবর্তন করুক, তারপরে আমাদের অনুরোধ করিও। অমাত্যগণের মুখ ভবিষ্যতের আশঙ্কায় কালো হইয়া গেল, তাহারা ভাবিতে লাগিল, রাজাকে গিয়া কি বলিবে।

এমন সময় এক বুড়ো মিঠাইওয়ালা তাহাদের কাছে আসিয়া মৃদুস্বরে বলিল—কর্তা, আপনার ছাত্রদের জন্য চিন্তা করিবেন না, তাহারা কদাচ অনাহারে মরিবে না।

—একজন কৌতুহলী হইয়া শুধাইল, কেন এমন বলিতেছ?

কিন্তু মিঠাইওয়ালাকে আর দেখিতে পাওয়া গেল না, ভিড়ের মধ্যে যে কোথায় সরিয়া পড়িয়াছে৷

আরও চার দিন গেল। বিদ্যার্থীদের প্রায়োপবেশনের আজ পঞ্চদশতম দিবস।

গৌড়বাসীর অনশনক্ষমতায় সমস্ত কাশ্মীর হতবুদ্ধি।

একজন বলিল—অনশনেই ওরা অভ্যস্ত, তাই না ওরূপ চেহারা।

আর একজন বলিল—মনের বলই বল, শরীরটা তো তুচ্ছ, দিভান্ত না থাকিলে নয়, তাই আছে।

অপর আর একজন বলিল—যা বল, ওরাই আসল ব্ৰাহ্মণ, সংস্কৃত উচ্চারণ যেমনি করুক না কেন।

ক্ৰমে অনেক লোকেই বিদ্যার্থীদের প্রতি সহানুভূতিপরায়ণ হইয়া উঠিল, তাহারা বিদ্যার্থীদের অপরাধ ভুলিয়া গেল, এমন কি, কেহ কেহ নাগানন্দকেই দোষী সাব্যস্ত করিতে লাগিল। জনমত যখন বিদ্যার্থীদের দিকে ঘুরিবার মুখে, এমন সময়ে এক অঘটন ঘটিল।

সে দিন অনশনের ষোড়শতম দিবস। দুইজন গৌড়ীয় বিদ্যার্থী (সেই দুইজন জনমত জাগ্ৰত করিবার উদ্দেশ্যে জগঝষ্প পিটিত) অতি প্ৰত্যুষে ছুটিতে ছুটিতে রাজবৈদ্যের বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হইল।

রাজবৈদ্য শুধাইল—এত ভোরে! কি সংবাদ?

—আপনাকে একবার যাইতে হইবে।

—কোথায়?

—প্রায়োপবেশ ক্ষেত্রে৷

—সঙ্কট দেখা দিয়াছে বুঝি! আগেই জানিতাম, এমন হইবে। হিক্কা, না শ্বাস, না দুই-ই?

—আজ্ঞে, না, ভেদ আর বসি।

—উদরাময়?

—তাইতো মনে হইতেছে।

—কি আশ্চৰ্য! প্ৰায়োপবেশনের ফলে উদরাময়, এমন তো শাস্ত্ৰে লেখে না।

—আজ্ঞে তবু সত্য, কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

—কেন এমন হইল বলিতে পারো?

—আজ্ঞে, ঘৃতটা কিঞ্চিৎ নীরেস ছিল।

—ঘৃত? এর মধ্যে ঘৃত কোথা হইতে আসিল?

—এক বেটা বুড়ো মিঠাইওয়ালার অনবধানেই এমন ঘটিয়াছে।

—মিঠাইওয়ালা? তোমরা কি তবে প্ৰায়োপবেশন কর নাই?

—আজ্ঞে প্ৰায় উপবেশন করিয়াছিলাম বলিয়াই এমন দুরবস্থা ঘটিল, শুধু উপবেশন করিলে বোধ করি এমন হইত না।

তারপরে রাজবৈদ্যের চিকিৎসার গুণে উদরাময়ের রোগীরা কয়েক দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সারিয়া উঠিল, আর নাগানন্দ স্বামীও গৃহাবিরোধ হইতে মুক্তি লাভ করিলেন।

অতঃপর কাশ্মীররাজ গৌড়ীয় বিদ্যার্থীদের ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাহারা উপস্থিত হইলে বলিলেন—বৎস, এবার তোমরা দেশে ফিরিয়া যাও।

বিদ্যার্থীরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করিয়া বলিল—আমাদের পাথেয়র অভাব৷

রাজা বলিলেন—রাজকোষ হইতে দিতেছি।

বিদ্যার্থীরা বলিল—সঙ্গীর অভাব৷

রাজা বলিলেন—কয়েকজন সৈন্য তোমাদের সঙ্গে গৌড় পর্যন্ত যাইবে।

তখন বিদ্যার্থীরা বলিল—আমরা যে চতুষ্পাঠীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছি, এমন অভিজ্ঞানপত্র দিতে হইবে৷

রাজা বলিলেন—তাহাও দিতে পারি। কিন্তু তোমরাই জানো, কত দূর কি শিখিয়াছ, দেশে গিয়া ধরা পড়িবে না?

বিদ্যার্থীরা বলিল—আজ্ঞে, সে আশঙ্কা নাই; কারণ, দেশের লোকেরা আমাদের চেয়েও মুর্খ!

রাজা বলিলেন—তবে তাহাই হোক। তোমাদের অভীষ্ট সব বস্তুই পাইবে, এখন যাও, প্ৰস্তুত হও গিয়া।

তারপর একদিন সুপ্ৰভাতে গৌড়ীয় বিদ্যার্থিগণ রাজব্যয়ে কাশ্মীর ত্যাগ করিতে উদ্যত হইল। চারিদিকের জনতাকে অভিভূত করিয়া দিয়া বিদ্যার্থিগণ ‘কাশ্মীর নিপাত যাউক’ ধ্বনি করিতে লাগিল এবং পালাক্রমে ‘কাশ্মীর নিপাত যাউক’ ও ‘গৌড় উন্নত হউক’ ধ্বনি তুলিতে তুলিতে গৃহাভিমুখে যাত্ৰা করিল।

তাহারা চলিয়া গেলে, বিস্ময়ের ভাব কতকটা কাটিলে একজন বলিয়া উঠিল— ‘দুনিয়া তো এক আজব চিড়িয়াখানা হ্যায়। ঔর গৌড় উসীমে বন্দরকা মোকাম! সীয়ারাম, সীয়ারাম৷’

পরিশিষ্ট

বাঙালী-নিন্দুক বলিয়া বর্তমান লেখকের একটা দুর্নাম আছে। এই গল্পটি তাহারই দৃষ্টান্ত বলিয়া গণ্য হইবে আশঙ্কা। কাজেই যে উৎস হইতে গল্পটির উপাদান সংগ্রহ করিয়াছি, তাহার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করিতে বাধ্য হইলাম৷ উক্ত অংশ পড়িলেই সকলে বুঝিতে পারিবেন যে, হাজার বছর আগেও বাঙালী-চরিত্র একই রকম ছিল, তাহার নিন্দা করিবার জন্য কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ নিষ্প্রেয়োজন, নির্জলা সত্যকথনই যথেষ্ট, আর যিনি এ বিবরণ লিখিয়া গিয়াছেন, তিনিও বাঙালী ছিলেন না। কাজেই বিবরণটিকে ও বর্তমান গল্পটিকে নিরপেক্ষ চিত্র বলিয়া গ্ৰহণ করা যাইতে পারে।

কাশ্মীরে গৌড়ীয় বিদ্যার্থী

কাশ্মীরী কবি ক্ষেমেন্দ্ৰ তাঁহার দশোপদেশ-গ্রন্থে কাশ্মীর-প্রবাসী গৌড়ীয় বিদ্যার্থীদের বর্ণনা দিয়াছেন। দশম একাদশ শতকে প্রচুর গৌড়ীয় বিদ্যার্থী কাশ্মীরে যাইতেন বিদ্যালাভের জন্য। ক্ষেমেন্দ্ৰ বলিতেছেন, ইঁহারা ছিলেন অত্যন্ত ছুৎমার্গী, ইঁহাদের দেহ ক্ষীণ, কঙ্কালমাত্র সার এবং একটু ধাক্কা লাগিলেই ভাঙ্গিয়া পড়িবেন, এই আশংকায় সকলেই ইঁহাদের নিকট হইতে দূরে দূরে থাকিতেন। কিন্তু কিছুদিন প্ৰবাস-যাপনের পরই কাশ্মীরের জল-হাওয়ায় ইঁহারা বেশ মেদ ও শক্তিসম্পন্ন হইয়া উঠিতেন। ‘ওঙ্কার’ ও ‘স্বস্তি’ উচ্চারণ যদিও ছিল ইঁহাদের মধ্যে অত্যন্ত কঠিন কর্ম, তবু পাতঞ্জলভাষ্য, তৰ্কমীমাংসা প্রভৃতি সমস্ত শাস্ত্রই তাঁহাদের পড়া চাই।…ক্ষেমেন্দ্র আরও বলিতেছেন, গৌড়ীয় বিদ্যার্থীরা ধীরে ধীরে পথ চলেন এবং থাকিয়া থাকিয়া তাহাদের দর্পিত মাথাটি এদিক-সেদিক দোলান। হাঁটিবার সময় বিদ্যার্থীর ময়ুরপঙ্খী জুতায় মচ মচ শব্দ হয়; মাঝে মাঝে তিনি তাঁহার সুবেশ সুবিন্যস্ত চেহারাটার দিকে তাকাইয়া দেখেন। তাঁহার ক্ষীণ কটিতে লাল কটিবন্ধ। তাঁহার নিকট হইতে অর্থ আদায় করিবার জন্য ভিক্ষুক এবং অন্যান্য পরাশ্রয়ী লোকেরা তাঁহার তোষামোদ করিয়া গান গায় ও ছড়া বাঁধে। কৃষ্ণবর্ণ ও শ্বেত দন্তপংক্তিতে তাঁহাকে দেখায় যেন বানরটি। তাঁহার দুই কর্ণালতিকায় তিন তিনটি স্বর্ণকর্ণভূষণ, হাতে যষ্টি, দেখিয়া মনে হয়, যেন সাক্ষাৎ কুবের। স্বল্পমাত্র অজুহাতেই তিনি রোষে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠেন, সাধারণ একটু কলহে ক্ষিপ্ত হইয়া ছুরিকাঘাতে নিজের সহ-আবাসিকের পেট চিরিয়া দিতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেন না। গৰ্ব করিয়া তিনি নিজের পরিচয় দেন ঠক্কুর বা ঠাকুর বলিয়া এবং কম দাম দিয়া বেশি জিনিষ দাবি করিয়া দোকানদারদের উত্যক্ত করেন। (বাঙালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, পৃঃ ৫৫১—৫৫২, নীহাররঞ্জন রায়।)