করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৪০৬৩৬৪ ৩২২৭০৩ ৫৯০৫
বিশ্বব্যাপী ৪৫৯৫০৩৭২ ৩৩২৭৩৯২২ ১১৯৪৪২৩

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে জ্ঞান মাপা যায় না

শরিফ সাইদুর

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৮, ২০২০

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকালীন যে শিক্ষা আমরা গ্রহণ করি, তাই-ই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। এ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আসলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কতটা পূরণ করে তা ভেবে দেখার বিষয়। প্রকৃত শিক্ষা শুধুমাত্র কিছু তথ্যগত জ্ঞান নয়, প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষের মনোজাগতিক উৎকর্ষ সাধন। আজকাল অনেকেই উপার্জনমুখী বা আয়বর্ধক শিক্ষাকে শিক্ষা বলে ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত থাকেন। শুধু উপার্জনের উদ্দেশ্যে যে শিক্ষা অর্জন করা হয় তাকে খণ্ডিত শিক্ষা বলা যায়। যা পরিপূর্ণ শিক্ষা নয়। শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য আসলে তা নয়। শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে গণ্য করা অধর্মের কর্ম। শিক্ষা হলো এমন এক পূত পবিত্র ঐশী শক্তি, যা মানুষের মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলে। মনের আঁধার দূর করে হৃদয়কে স্বর্গীয় আলোকে উদ্ভাসিত করে। হৃদয়ের কুপ্রবৃত্তিগুলোকে পরাভূত করে সুকুমার বৃত্তিগুলোকে জাগ্রত করে মানুষের মানবিক গুণাবলিগুলোর পরিস্ফুটন ঘটিয়ে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। জীবন-জগৎ ও মহাজাগতিক শক্তির মাঝে যে ঐক্যতান বয়ে চলেছে, শিক্ষা তা উপলব্ধিতে সহায়তা করে। মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ চিন্তার চেতনা তৈরি করে।

শিক্ষিত ব্যক্তির হৃদয়ের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে সমাজ আলোকিত হয়। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অন্ধকার বিরাজমান শিক্ষার পরশে তা দূরীভূত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে কি তা হচ্ছে? এখন ঘরে ঘরে এমএ বিএ পাশ করা মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ক্রমবর্ধমানহারে বেড়েই চলেছে। শিক্ষাকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার কোনো প্রভাবই অন্ধকারাচ্ছন্ন এই সমাজে পড়ছে না। কেন পড়ছে না?

পড়ছে না এ কারণে যে, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পূরণ করতে পারছে না। ভুলে গেলে চলবে না, বিশ্বের অসংখ্য মনীষীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না অথচ তাদের দেয়া জ্ঞানভাণ্ডার অধ্যয়ন করেই আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সার্টিফিকেট অর্জন করি। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল কারোরই সার্টিফিকেট নেই। কিন্তু তাদের রচনা অধ্যয়ন করে আমরা পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করি। বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে কলেজ ত্যাগ করেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে। উর্দু সাহিত্যের কিংবদন্তি গল্পকার সাদত হাসান মান্টো তিনবার মেট্রিক ফেল করে চতুর্থবার পাশ করে। এমনকি তিনি মেট্রিকে উর্দুতেও ফেল মেরেছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে তিনিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন উর্দু ভাষার বিখ্যাত গল্পকার।

মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানিরও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথের চৌদ্দজন সন্তান ও নাতিদের মধ্যে সবচেয়ে নাম করে দুজন, রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ। কিন্তু এ দুজনরই একজনেরও তেমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। আসলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন না থাকলে তারা এত বেশি পড়েছেন ও জীবন থেকে এত বেশি শিক্ষা লাভ করেছেন যে, অন্য কেউ এত শিক্ষা পাননি। পেলেও লেখায় বা কর্মে তেমন প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি।

উর্দু ভাষার বিখ্যাত লেখক খাজা হাসান নিজামির সাথে পরিচয় ঘটে অনুবাদ পড়ে। পরে হাসান নিজামি সম্পর্কে জানতে গিয়ে দেখি, এ ভদ্রলোকেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। এমনকি প্রাথমিক জীবনে তিনি ফেরি করে বই বিক্রি করতেন।

উইকিপিডিয়া উর্দু মোতাবেক উনার নাম ছিল আলী হাসান নিজামি। কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল তার নাম দেন খাজা হাসান নিজামি। এত কিছু কথা বলার পর ভক্তদের একটি কথাই বললাম, জীবনে বড় হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে কারও জ্ঞানের পরিধি মাপতে যেও না। সে মাপে বড় ভুল থেকে যাবে।

বস্তুত, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ শিক্ষার যাত্রা শুরু করে। এরপর যে যতদূর অগ্রসর হতে পারে। এক সময় বর্তমানকালের মতো এমন বিধিবদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। সার্টিফিকেট প্রদানেরও কোনো কর্তৃপক্ষ ছিল না। তখন গুরুবাদী শিক্ষার প্রচলন ছিল। কোনো পণ্ডিত ব্যক্তির কাছে গিয়ে শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা শিষ্যত্ব গ্রহণ করত এবং তার সহচর্যে থেকে শিক্ষা লাভ করত। সেটাও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই ছিল। কিন্তু কোনো কাগজের সার্টিফিকেট ছিল না। তখনকার শিক্ষিত ব্যক্তিরা নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেই রাজার অধীনে উচ্চপদে চাকরি লাভ করতেন। কাজেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই হলো শিক্ষার সোপান।

শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক দুই-ই হতে পারে। যিনি কোনোদিন বিদ্যালয়ে গমন করেননি তিনিও বিভিন্ন বিদ্যায় পারদর্শী। ওই বিদ্যা দ্বারা তিনি জীবিকা নির্বাহ করছেন এবং সমাজও উপকৃত হচ্ছে। তাহলে এ শিক্ষার মূল্য কি কোনো অংশে কম? মানুষ নিরন্তর জীবন সংগ্রামে লিপ্ত। বেঁচে থাকার এ সংগ্রামে সহায়ক যা কিছু সবই শিক্ষার অঙ্গীভূত। প্রকৃতপক্ষে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে প্রকৃতি থেকে। প্রকৃতি হচ্ছে মানুষের সবচাইতে বড় শিক্ষক। রবীঠাকুর বলেছেন, বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র।

প্রাচীন বাগদাদ নগরীতে ইব্রাহীম বোগদাদী নামের এক ব্যক্তির আদব ছিল অত্যন্ত অসাধারণ। সকলেই তাকে ভালোবাসত। এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘হে ইব্রাহীম বোগদাদী, এত আদব তুমি কোথায় শিখলে?’ জবাবে সে বলল, ‘আমি আদব শিখেছি বেয়াদবের কাছ থেকে।’ ওই ব্যক্তি প্রশ্ন করল, এটা কী করে সম্ভব? উত্তরে ইব্রাহীম বোগদাদী বলল, বেয়াদব যা করে, আমি তা করি না।’ এভাবেই প্রকৃতির কাছ থেকে অনুপম শিক্ষা লাভ করা যায়। বিল গেটস বলেছেন, ‘আমি যা শিখেছি তার অনেক কিছুই অলস ব্যক্তিদের কাছ থেকে, কারণ অলস ব্যক্তিরা চিন্তা করে কীভাবে একটি কাজ স্বল্প সময়ে করা যায়।