ফারুক আফিনদীর একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত : আগস্ট ২৩, ২০১৮

ঘৃত জ্যোছনায় উড়ছে পিঙ্গল ছাই

আষাঢ়ে পাটখেতে কংকাল প্রেত দেখে সে মূর্ছা গেল। কার্তিকে, একা ঘৃত জ্যোছনায়, নিজেকে একটা কংকালের ভেতর যেন দেখল
সাদা-
চোখ ধাঁধিয়ে ধাঁধিয়ে, মরে গেল সে

ঘৃত জোছনায় উড়ছে পিঙ্গল ছাই

হেমন্ত

ধানের স্তূপে উড়ছে সাদা বাষ্প। জানালায় হেলানো ইজেল। ছিটিয়ে পড়ছে তাপ ও গ্লুকোজ। কিন্তু মেয়েটি, ধামা খুঁজে বৃথাই মরছে। নলোরা বাড়ি গেছে। বেতিদের স্বভাব নিয়ে বাঁশতলায়, আরো ঘাসে, চাটাইর নিচে... ফিরিয়ে দিচ্ছে অগ্নি ও বাতাস। সবিতার চুলখেতে পিঁপড়ার স্পর্শের মতো জলবায়ু বিলি কাটে। ক্ষয়ে যাওয়া হাড়ের মতো পরিত্যক্ত বেতিচাঁছা উঠোনে সম্মুখে অথচ পেছনে, ছড়িয়ে রয়েছে, সময়ের লেজের মতো।

২.
আর নতুন মহাসড়কে ছিটিয়ে পড়ছে সিলভার স্পেকট্রাম। শূন্যে সাদা বাষ্প পাক খাচ্ছে। একটা বিড়াল লাফিয়ে পড়ল।

ঘর

ছনকুটো পড়ছে খসে। শ্যাম-কালো ছিটপড়া বড় টিকটিকিটার মতো ধপ করে। ঘরামির বউ একবার ঘাড় বাঁকাল। দেখল সে, কাঁধে জলা। জলার নিচে ঝিনুক। আর সে তাকাল না। চুলায় জ্বলন্ত লাল গমডাটার, পটপট শব্দ শুনছে।
ছনকুটো পড়ছে খসে। পাখনার লোকরঙ পালক, শিশুটির মশারির উপর...। আর ষড়পদি লালিম বাতাস, টেনে টেনে নিচ্ছে, স্যাঁতস্যাঁতে মমতার ভেতর। চোখ খুলে তাকাল সে। মেঘে রোদে খড়খড়ে আকাশকে দেখল। দুপা উপরে তুলে, আবার ঘুমিয়ে পড়ল। আর কয়েকটি ঠোঁটবোঁজা কাক মাথাটা ফুলিয়ে চালে বসে আছে...

প্রথম ভাদরে ভরা সাদরে

এবং কয়েকটি শামুকভাঙা...
গাঙকূলে দৌড়ে যাচ্ছে মেয়েটি। উঠে যাচ্ছে উপরে, ঝরছে দীপ্র দীপ্র, লৌ-। নাকি লাল পিঁপড়াদের একটি দল অথবা পা থেকে ঝরছে কয়েকটি লাল পিঁপড়া। যেতে পারছে না পায়ের মলের সাথে। মেয়েটি উঠে যাচ্ছে উপরে। নাচে রক্তে পিঁপড়ায় আলতায়। ...রক্তে পিঁপড়ায় আলতায়...। ...পিঁপড়ায় আলতায়...। ...আলতায়...। এইতো মেয়েটির পিঠ হেসে উঠছে।

সামনে কাশবাগান।

আর ঐ যে মহিলাটি দেখছ, ঘেমে এসে গাঙে নেমেছে। তার ভেতরে এখন, সঙ্গমিত এক নারীর ছেড়ে দেয়া শরীরের সুখের অণু ঢুকে যাচ্ছে, এই যে গাঙের জল-। মহিলাটি চোখ বুঁজে আছে, এক নারীও। তাদের কথায় পরে আসি। ভাদ্রে ডুবে আছে তারা।
মেয়েটির শরীরে এখন ভাদ্রের সিঁধেল বৃষ্টি। গাঙে নেমে যাচ্ছে ঢল। শীতে জোছনায় নির্জন সিমফুল, এখানে আসতে পার তুমি। প্রথম ভাদরে ভরা সাদরে।

এবং কয়েকটি শামুকভাঙা...

কোথায় গেলে পাব তারে

আমি যাচ্ছি
কিন্তু কোথায়! এবং আমি যে যাচ্ছি এসব কথা
মস্তিষ্ক আমাকে বলল না
তাহলে আমি যাচ্ছি কেন!
মনের গোপনে ধুপজ্বলা গন্ধ হল?
কিন্তু কোথায়...? অথবা যাচ্ছি কি?
এইতো আমার পা যুগল স্থির নেই
শরীরের ভেতর ধুপপোড়ান গন্ধ
মনে পড়ে জোনাক এবং
জোনাক দেহের ঘ্রাণ।
আমাদের ভেতরে ধূপ
এবং জোনাক এবং এবং গন্ধ এবং বাষ্প এবং
পরিচিত লোকরাত ডাকে
চিন্তার পথে ছুটে চলে খুব মুগ্ধতার পাতাল ট্রেন
আমি যাই গ্রাম্য মানুষের ঝিনুক মহলে
কতদিন লীলা পাগলীর দোতারায় থমথমে রাতকে অনেক দূর
ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে যেতে দেখি না
আশকর আলীর গাজীর গীত ভেজান পরীর কিস্সা আর
আর... আর...

কীর্তনীয় রাত

এবং তাদের দরাজ
বয়ান থেকে স্রষ্টাজীর এক একটি কোষ
অনর্গল ঝরে পড়ার গভীর সেই শিশিরে
কতদিন ভিজি না
ধানের স্তূপের ওমে চুপ মেরে স্রষ্টাজীর
কোষ বর্ষণ দেখা আমাদের
বাংলাবোন, জায়া এবং জননী... কতদিন...।
অলক্ষ্যের কুয়াশারাও গভীরে চলে এসে
শোনে সে লোকের সঙ্গীত, আর
জোতিষ্কগুলো ঢুকে যায়
বাঁশির ভেতর। আমি যে নগরচারী! এমন বাঁশির রাত
আমি কোথায় পাব

কোথায় গেলে পাব তারে?

ভাষণ-২০১৩

একজন চাকর ছিল
যে অঘ্রাণের সকালে ধানখেতে যেত
কাচি ও হুকো নিয়ে

আল থেকে উড়ে যেত সাদা ধোঁয়া
গেরস্থের সোপানে

আজ আলে বসে রাজকুমারের কিসসা কইছে চাকর
মনিব তা শুনছে