ফিরোজ এহতেশাম

ফিরোজ এহতেশাম

ফিরোজ এহতেশামের কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশিত : এপ্রিল ০৮, ২০২০

যুগলবন্দি

প্রচণ্ড বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে জানালার কাচে
আর আমি ঘরের ভিতর টুংটাং শুনি জলতরঙ্গ
শনশন করে পাতা, উপ্রে যাচ্ছে গাছ, শেকড়সমেত
এদিকে বাজছে এস্রাজ আর সানাইয়ের যুগলবন্দি
কোথাও চিৎকার, আকাশ বিদীর্ণ করা মর্মন্তুদ আর্তনাদ
এরই ফাঁকে লহর বইয়ে দিচ্ছে তবলাবাদক
তীব্রতর উলুধ্বনি, শাঁখের আওয়াজ
আল্লাহু আকবর বলে মুয়াজ্জিন দিচ্ছে আজান
শোনা যাচ্ছে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত জীবনের
অভূতপূর্ব কোনো গান।

অর্থ না বুঝতে পেরে

যেন ঝুমু নামে মেয়েটির
ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে বললাম,
এটা ঝুমুর।

আমি কি তাকে চিনতাম
মনে নাই
পাশ দিয়ে চলে যাবার সময়
শুধু তার শব্দ শুনি
কিন্তু কোনো অর্থ না বুঝতে পেরে
শুয়ে আছি।
ভেসে আসছে কর্পূরের ঘ্রাণ,
মুর্দাফরাশের হাসি।

ট্রান্সফর্মার

তোমাকে যখনই দেখি, ট্রান্সফর্মার,
তখনই স্বার্থক বলে মনে হতে থাকে
এ মর জীবন...
জাল ও জটিলতার প্রতি যথেষ্ট সম্ভ্রম রেখে তাই
ধীরে সুস্থে পাশ কেটে চলে যাই নগরে তোমার—

দুই.
গিয়ে দেখি আমি সিগন্যাল বাতি, বাস, ট্রাক, ঠেলা, টেম্পু
হুস করে ওই ছুটে গেল এক কোস্টার
পিঠ ঠেকে গেল দেয়ালে তোমার, দেয়ালে লাগানো পোস্টার

পোস্টারে এক নারী হাসে, সুশ্রী—
‘অ্যাশট্রের সাথে ডিশ এন্টিনা, টিভি ফ্রিজ কম্পিউটার
ইন্টারনেটে ঢুকতে পয়সা ফ্রি!’

ল্যাম্পপোস্টের গাঢ় সোডিয়াম আলো
তার নিচে মম তোমাকে লাগল কালো

তিন.
মাঝ রাত, বহু দূর থেকে কে যে কাশল
শীত লাগতেছে, শীতকাল চলে আসল।

মাথার ভেতরে কুয়াশা, ঘূর্ণাবর্ত
কেউ বলেছিল ‘দূরে যায়া তুই মর তো’।

চাল ডাল খেতে সকালবেলাতে চড়ুই পাখিরা আসে
খেতে দেই বলে হয়তোবা তারা আমাকেও ভালোবাসে।

তরঙ্গায়িত ঘটনাপ্রবাহ ব্রহ্মাণ্ডতে নাচে
এসবের ফাঁকে দেয়ালঘড়িতে বারোটাই বেজে আছে

চার.
হাসি ও ইশারা, ছাদে ছাদে ছুড়ি-ছোকড়া
কাঠ নাই কোনো তাই নাই কাঠঠোকরা।

ইশারার ধ্বনি শুনতে কি পাও বৎস
দেখতে কি পাও জানালার পাশে যুৎসই
চুপ করে এক কিশোরী দাঁড়িয়ে আঁধারে
আলোড়ন পড়ে গেছে বনে আর বাদাড়ে

ও দাদা রে...
মনোহর মনোহরি
বলো হরি।

দূর থেকে কার কণ্ঠ
জ্বালো লণ্ঠন।

কণ্ঠ হতে ওষ্ঠাগত প্রাণ
সে প্রাণ আজও তোমারই গায় গান

পাঁচ.
পূব দিগন্তে ঝুলে আছে দেখি অর্ধেক কাটা চাঁদ
কে যে পেতেছিল তার বিপরীতে মহাজাগতিক ফাঁদ

প্রশ্ন কোরো না উত্তর থেকে আসে বসন্ত বায়ু
জাগিয়ে তুলছে নাগরিক দেহে মহাপ্রাণ পরমায়ু

বসন্তকাল, প্লাস্টিক ফুলে ভরে গেছে মোর ছাদ
ক্ষিদা লাগতেছে, বাক্য রচনা বাদ।

গ্যাসের চুলাটি চুলায় ফুটছে পানি
‘দরিয়ার পানি তোর মতলব জানি’

তাই
বিশ্লেষণমূলকভাবে চুলার সামনে দেখি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
লাল মসুরের ডাল সিদ্ধ করলে হয় হলুদ বরণ

অন্যদিকে, বাড়ির পাশের বালিকারা
লাইটের বিপক্ষে বসে পড়াশোনা করে।

কত শব্দ

সর্বস্ব লুঠে নিয়ে কত শব্দ নিশ্চিন্তে ঘোরাফেরা করে।
আহা! কত শব্দ সমর্পিত হয়ে বলেছিল, ‘মরে যাব’।
কত শব্দ বসেছিল মনমরা হয়ে, কোনো শোকসভা থেকে যেন
গোপনে কেটে পড়েছে তার প্রিয়তম শব্দটি তো আর ফেরে নাই।
শোনো, ওই চিৎকার করে উঠছে আতঙ্কে কত শব্দ
টুকরা টুকরা হয়ে গেল বোমার আঘাতে।
আর সেগুলো কুড়ায়ে নিতে গিয়ে বুম, ব্লাস্ট—
কত শব্দ বিস্ময়ে জব্দ হয়ে ঢুকে পড়ল গুহার ভিতর
বেড়ে উঠছে গোপনে গোপনে কত শব্দ
‘ভাণ্ডার’ খুলে ফিসফিস করে দেখিয়েছিল তার বিস্ফোরকগুলো।
কত শব্দ খোলেনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও বন্ধ দরজাটা
আর তাতে পিঠ ঠেকিয়ে ভিতরে ভিতরে কত শব্দ নিঃশব্দে কেঁদেছিল
কত শব্দ হদিসও রাখেনি তার, দ্যাখো
পচে যাচ্ছে ব্যবহৃত হতে হতে কত শব্দ
রিকশা পাচ্ছে না শেষরাতে।
আলোতে মুখটা তোলে নাই কত শব্দ ব্রিজের নিচে
বাচ্চাটাকে রেখে পালিয়েছে।
শূন্যে, দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে
কত শব্দ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে মানসিকভাবে।
‘ভাইয়া বাড়িতে নাই’ বলে অকারণে দাঁড়িয়েছিল লাবণ্যময় কত শব্দ
চোখ বুজে বলেছিল ‘আর না, ছিঃ’
কত শব্দ ‘লাশ ফেলে দিব’ শুনে কার না
ভয়ে ভয়ে মনে হয় কোনো শব্দ বৃথা যায় নাই।
ওই কত শব্দ সম্ভাবনাময়, ঘাড় কাত করে তাকাল এইমাত্র হায়
তাতেই কত শব্দ নিমিষেই কাত হয়ে গেল।

কত শব্দ অলংকার খুলে রেখেছিল কত যত্ন করে
আর তার অর্থ কত শব্দ বুঝতে পেরেছে এই এতদিন পরে...

উন্নয়নমূলক গান

ওরে, উন্নয়নের জোয়ারে ভাইস্যা গেলাম খোঁয়াড়ে
সেথায় যায়া দেখি আমি ছেলের হাতের মোয়া রে।

সভা-সেমিনারে যারা করতে আছে দোয়া রে
তারাই কিন্তু বেবাক লোকে তুলসি পাতায় ধোয়া রে।

কারো পৌষ মাসের পিঠা কারো বারো পোয়া রে
সবার শ্যাষে দেখ সবার পাতে ইটের খোয়া রে।

চারিদিকে দেখি সবাই উলটা দিকে শোয়া রে
আরে বাপরা গেল কাশী তবু মা-রা গেল গোয়া রে।

দুই.
আহ্
হায় খোদা!
এই বাংলাদেশ
তাতে হামলা দে।

ওহ্
যাকে জাগাবো
সেই তো বেশ
ঠ্যালা সামলাবে।

 

কবি পরিচিতি: জন্ম ২৪ মে ১৯৭৭। বেড়ে ওঠা রংপুরে। পড়াশুনা করেছেন কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে। ১৯৯৪ সাল থেকে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও দৈনিক পত্রিকায় লেখালেখি শুরু। কবিতা, গল্প, মঞ্চ নাটক, প্রবন্ধ, ছড়াসহ নানান শাখায় তিনি লেখালেখি করেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১টি-অস্ত্রে মাখিয়ে রাখো মধু (সংবেদ, ফেব্রুয়ারি ২০১০)। বাউল সাধকদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সাধুকথা’। সহ-সম্পাদক হিসেবে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করছেন।