বিনয় মজুমদার: কবিতার বোধিবৃক্ষ

পর্ব ১৩

মলয় রায়চৌধুরী

প্রকাশিত : অক্টোবর ০২, ২০১৯

আট.
যে লোকটির নিজের সম্পর্কে এই ইতিহাসবোধ আছে, তাঁকে কেমন করে ‘পাগল’ বলা হয়? এ যেন উস্কো-খুস্কো চুলের জন্য আইনস্টাইনকে পাগল বলার মতন। বস্তুত বিনয় মজুমদারের মানসিক চিকিৎসালয়ের প্রেসক্রিপশানগুলো কোনো গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।

বিনয় মজুমদারের রাজনৈতিক মতামত নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আমি এক কমিউনিস্ট এই কথা উচ্চারিত হোক/দিকে-দিকে পৃথিবীতে’, কবিতাটি লেখার পর। ‘কবিতা বুঝিনি আমি’ কাব্যগ্রন্থে তাঁর এই কবিতাটিও বিতর্ককে উসকে দিয়েছে:

দেশে সাম্যবাদ এলে

দেশে সাম্যবাদ এলে সকল মন্দির
ডিনামাইটের দ্বারা ভেঙে ফেলা হবে
আর যদি কেউ তার বিবাহের কালে
পুরোহিত ডেকে আনে মন্ত্র পড়াবার
নিমিত্ত তাহলে তাকে যাবৎ জীবন
কারাদণ্ড দেওয়া হবে যথা ভগবান
নামক ব্যক্তিকে দাহ করা দরকার
হয়ে পড়ে একদিন অথবা যেমতি
অন্ধকারে বজ্রপাত প্রয়োজন হয় ।
মাঝে-মাঝে মন ক্রমে মহীর মানুষ
অসভ্য অসভ্যতর হয়েই চলেছে
এইভাবে মুহূর্তেই ভাবি মানুষের
গড় আয়ু বেড়ে যাচ্ছে— এ চিন্তা আমার
সান্ত্বনা আনত না মনে, আমি তো ভ্রান্ত না।

কিন্তু ১৯৮২ সালে ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকার দেয়া সাক্ষাৎকারে সমর তালুকদার যখন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “শুনেছি সেই সময়ে (১৯৫১-১৯৫২) তুমি মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচিতই হওনি শুধু— ‘ডাস ক্যাপিটাল’টাও নাকি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ে ফেলেছিলে?” জবাবে বিনয় বলেন, “সে সময়টা বড় অদ্ভুত সময় ছিল। মার্কসবাদ সম্পর্কে লেখাপড়া, মার্কসবাদ নিয়ে আলোচনা একটা ফ্যাশানের মতোই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল— বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে। Serious commitment of sincere conviction কতটা ছিল তা বুঝতেই পারি আজ ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের চেহারা দেখেই। চীনের পার্টি আর আমাদের পার্টির জন্ম প্রায় একই সময়ে— ওরা কোথায় আর আমরা কোথায়! কী করেই বা হবে? ভাবা যায় কমিউনিস্ট পার্টির (ভারতের) ইতিহাস লেখা হচ্ছে বুর্জোয়া সরকারের জেলে বসে— ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস! একে এক ধরণের অর্ডারি লেখা বলা যায় নাকি? আমি নিজে ন্যাশানাল বুক এজেন্সিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রুফ দেখে দিয়েছি।”

সমর তালুকদার বিনয়কে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে তো কমিউনিস্টরা শাসন চালাচ্ছেন এখন?” উত্তর বিনয় বলেন, “ধ্যুৎ, এরা আবার কমিউনিস্ট নাকি!” লক্ষ্যণীয় যে, বিনয় মজুমদার কথাটা বলছেন ১৯৮২ সালে, এবং তখনই তিনি আঁচ করে ফেলেছিলেন নেতাদের অধঃপতন। অথচ বহু কবি-লেখক সেসময়ে আর তারপরও বহুকাল বামপন্থীদের লোলি লেজুড় আর স্যাঙাত হয়ে সেঁটে ছিলেন। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে তো মৃত্যুর কয়েক বছর আগেও দেখা গেছে বইমেলায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পেছন-পেছন ঘুরছেন। স্বাভাবিক যে, বিনয়ের মতন এই ধরণের খোলাখুলি কথাবার্তা বললে কার্ড হোল্ডারদেরও পার্টিতে পাত্তা দেয়া হতো না।

১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য মারুফ হোসেনের সঙ্গে বিনয়ে যে প্রশ্নোত্তর হয়েছিল তা থেকে তাঁর সামাজিক অবস্থানের আঁচ পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: ষাট-সত্তরের উত্তাল সময়। খাদ্য আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সময়কে নিয়ে কবিতা লিখে চলেছেন একের পর এক, সহযাত্রী মণিভূষণ ভট্টাচার্য, সমীর রায় প্রমুখ। আর আপনি ১৯৬৬ সালে লিখলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’। প্রকাশ হলো ১৯৭৪-এ। এটা কি সময় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়?
বিনয়: আমি লিখেছি আমাকে নিয়ে, অন্য কাউকে নিয়ে কবিতা লিখিনি। সবই আমার দিনপঞ্জি। ‘দিনপঞ্জি লিখে লিখে এতটা বয়স হলো/দিনপঞ্জি মানুষের নিকটতম লেখা।’ ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ হলো আমার একাকিত্ব নিয়ে।

প্রশ্ন: ওই সময় আপনার জীবনে কোনও প্রভাব ফেলেনি?
বিনয়: না, একদম না। আমি তখন থাকতাম কলকাতা -২৮, মানে দমদম ক্যাণ্টনমেন্টে দিদির বাড়ি। আসলে পঞ্চাশের কবিরা প্রায় সবাই আত্মজীবনীমূলক কবিতা লিখেছে। শুধুমাত্র নিজেদের নিয়ে লেখা। এটা একটা ট্রেণ্ড বলা যেতে পারে। কেননা এর আগে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বিষয়ে কবিতা লিখেছেন। জীবনানন্দ লিখেছেন, নজরুল লিখেছেন। পঞ্চাশের পরেও বিভিন্ন কবিরা লিখেছেন। কিন্তু পঞ্চাশের প্রায় সবাই নিজেদের নিয়ে লিখেছে।

প্রশ্ন: এর কারণ কী বলে মনে করেন আপনি?
বিনয়: তার আবার কারণ কী! তখন দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত কবি বলে আমাদের কবিতায় আনন্দের কথা ছিল। স্ফূর্তিও ছিল প্রচুর।

২০০১ সালে ‘লোক’ পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীমের সঙ্গে প্রায় একই বিষয়ে বিনয়ের সঙ্গে এই কথাবার্তা হয়েছিল:

প্রশ্ন: আপনি যখন লেখালিখি শুরু করেন তখনকার কলকাতার আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই।
বিনয়: আর্থ-সামাজিক অবস্থা কী হবে? সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। প্রচুর উদ্বাস্তু এসে হাজির হয়েছে। কলকাতায় তাদের থাকতে দেওয়ার জায়গা হচ্ছে না। বাড়িঘর নেই, বেকার, চাকরি নেই, কী চাকরি দেবে? চাল-ডালের অভাব। এখন একেক বিঘে জমিতে ধান হয় ২৫ মণ, তখন হতো আট মণ। খাবার নেই। পুরো বীভৎস অবস্থা তখন। ১৯৫৩ সালে অনেক হাতে-পায়ে ধরে নেহরু আমেরিকা থেকে গম আনায়। দেশভাগ হয়েছে ১৯৪৭-এ। সারা বছর না খেয়ে, শুটকি মেরে, চাকরি নেই, বাকরি নেই, থাকার জায়গা নেই— এ অবস্থায় থেকে ছয় বছর পর আমেরিকা দয়া করে গম পাঠালো। সেই গম খেয়ে-খেয়ে মানুষের দিন চলে। কিন্তু দেশ তো স্বাধীন। ৫০-এর কবিরা সেই স্বাধীনতা পাওয়ার ঠিক পরবর্তী সময়কার কবিরা, স্বাধীন যে বছর হলো সেই বছর বেশ কিছু কবিতা লিখেছি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও তাই। কবিতাগুলো খুব আনন্দদায়ক হয়েছিল কিংবা আনন্দ-স্ফূর্তির কবিতা হয়েছিল।

প্রশ্ন: তার মানে কম বয়সে লেখার ফলে আনন্দদায়ক হয়েছিল?
বিনয়: না, স্বাধীনতা পাওয়ার ফলে।

পুনর্বসু পত্রিকার জন্য দেয়া ১৯৮৭ এর সাক্ষাৎকারে, রণজিৎ দাশ জানতে চেয়েছিলেন, “শেষ লেখাটায় আপনি বলেছেন, যে আমি এক কমিউনিস্ট, এই কথা উচ্চারিত হোক?” জবাবে বিনয় বলেন, “হ্যাঁ, যখন আমি লিখেছিলাম, তখন আমার মনে হলো যে, এইটা হওয়াই ভালো বুঝলে, ‘পরিচয়’ পত্রিকা… ’পরিচয়’ পত্রিকা, আমার কাছে একটা কবিতা চাইল। কমিউনিস্টদের কাগজ, বুঝেছ? তখন ভেবেচিন্তে দেখলাম, লিখে দেব। কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য আমি ছয়মাস ছিলাম। এত খাটতে হয়, এত দৌড়োদৌড়ি ছুটোছুটি যে, আর আমার দ্বারা হলো না। ছেড়ে দিলাম। হ্যাঁ, রাত্তির সেই এগারোটা পর্যন্ত বক্তৃতা, বুঝতে পারছ?”

এখানে পরিষ্কার যে, বিনয় মজুমদার সেই সময়ের চালু ধুয়ো ‘গরিব হওয়া ভালো, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো, কমপিউটার না শেখা ভালো, অবরোধ করা ভালো, কারখানা লাটে উঠিয়ে দেয়া ভালো’ ইত্যাদি ভাঁওতার খপ্পরে পড়েননি। কেবল বামপন্থীদের সমালোচনায় নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি বিনয় মজুমদার। অগ্রজ আর সমসময়ের কবিদের সম্পর্কেও নিজের মনের কথা বলেছেন, রাখঢাক করেননি। ১৯৯৮ সালে ‘অধরা মাধুরী’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারে বোধিসত্ত্ব রায় বিনয়ের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন, “বাংলা আধুনিক কবিতা কি পাশ্চাত্যের অনুসারী?” উত্তরে বিনয় বলেন, “না তো! ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট আমলে যত বাঙালি কবি ছিল সবাই ইংরেজির অধ্যাপক। ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট এদের ছাড়া কাউকে কবি হতে দেয়নি। জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, সমর সেন, অমিয় চক্রবর্তী এঁরা ইংরেজির অধ্যাপক। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের ইচ্ছানুসারে এই সব কবির কাজই ছিল ইউরোপিয়ান কবিতা নকল করা।”

২০০১ সালে ‘লোক’ পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেন, “শক্তি খুব ভালো কবিতা লিখত কিন্তু শেষ বয়সে মাথাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সুনীল যে কী লেখে, তা আমি জানি না। মন্তব্য না করাই ভালো।” ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য মারুফ হোসেনের প্রশ্ন, “আপনার সমসাময়িক কবিদের কবিতা আপনার কেমন লাগে?” এর উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “এদের কবিতা আমার খুব বেশি ভালো লাগে, বলি না। উৎপলকুমার বসুর কবিতা ভালো লাগত। ‘গোলাপ তোমাকে আমি ঈর্ষা করি/কত না সহজে তুমি তার মত্ত কেশে ঢুকে যাও।” উৎপল বসুর এটুকু কবিতাই মনে আছে। অমিতাভ দাশগুপ্তর কবিতা একখানাও মনে নেই।”

১৯৮২ সালে ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকার জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর সে ধরনের কবিতা লিখছেন কোথায়— ওনাকে এখন বরঞ্চ ঔপন্যাসিক বলাই ভালো। নীরেন চক্রবর্তীর অনেক আগের লেখা মন্দ নয়— এখন উনি লেখা বন্ধ করে দিলেই ঠিক কাজ হবে বলে মনে হয়। শঙ্খ ঘোষ মাঝে মাঝে ভালো লেখেন।” প্রতিষ্ঠানে যারা ছড়ি ঘোরান তাদের সম্পর্কে এই ধরণের সাক্ষাৎকার দেবার পর যে সাহিত্যের জন্য পুরস্কার পাওয়া এবং বহুল প্রচারিত পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পাওয়া কঠিন, তা আমরা বহুকাল হলো জেনে গেছি। জীবনের শেষদিকে বিভিন্ন পুরস্কার পাবার আগে বিনয় মজুমদারকে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার দেয়া হয়েছিল, দশ হাজার টাকা, প্রধানত তার আর্থিক অবস্থার কারণে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পুরস্কারের টাকা নিয়ে গিয়েছিলেন এবং বিনয়কে পুরস্কারটি দেবার জন্য একটি মঞ্চ তৈরি করে অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। বিনয় মজুমদার বসে ছিলেন একটি চেয়ারে। একের পর এক বক্তা সাম্প্রতিক কবিতা নিয়ে, বিনয় মজুমদারের কবিতা নিয়ে বক্তৃতা দিতে থাকেন। ঘণ্টাখানেক পর বিরক্ত হয়ে বিনয় মঞ্চ থেকে নেমে নিজের ঘরে ফিরে যান। কিন্তু তারপরও বক্তৃতা থামেনি। কলকাতা থেকে যারা বক্তৃতা দেবার জন্য গ্রামে পৌঁছেছিলেন, সবায়ের কোটা শেষ হবার পর অনুষ্ঠান ফুরোয়। চা-সিঙাড়া-সিগারেট পর্ব শেষে তারা বিনয়ের ঘরে গিয়ে দেখেন যে, তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন।

মৃত্যুর এক বছর আগে তাঁকে অকাদেমি পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। রবীন্দ্র পুরস্কার দেয়া হয়েছিল ওই বছরেই, তাও সেই পুরস্কারটি তাঁকে ভাগাভাগি করে নিতে হয়েছিল জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহর সঙ্গে! রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়ে বিনয় বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার একজন ডাক্তার আর একজন ইঞ্জিনিয়ারকে সাহিত্যের স্বীকৃতি দিলো। রবীন্দ্র পুরস্কার তাঁর আগে দেয়া হয়েছিল অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, অমিতাভ দাশগুপ্ত এবং সমরেন্দ্র সেনগুপ্তকে। আনন্দ পুরস্কার তাঁকে দেয়া হয়নি, যে পুরস্কার পেলে তাঁর দৈনন্দিন খরচের সুরাহা হতো, অথচ ওই পুরস্কার দুবার করে দেয়া হয়েছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তসলিমা নাসরিন ও জয় গোস্বামীকে। অকাদেমি পুরস্কার নিতে তিনি যাননি, তাঁর ঠাকুরনগরের বাড়িতে এসে দিয়ে যান দিব্যেন্দু পালিত, উপস্থিত ছিলেন অমিয় দেব। বিনয় মজুমদার কয়েকবার আত্মহত্যার প্রয়াস করেছিলেন বলে শোনা যায়। ঠিক কোন কারণে তিনি নিজের জীবনকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন, সে-বিষয়ে কোনো সাক্ষাৎকার অথবা নিকটজনের বিবৃতি পড়িনি। পুলিশও হস্তক্ষেপ করেছিল কিনা জানি না। তবে স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় জিন জাগ্রত হয়ে উঠলে সেই সময়টায় আত্মহত্যা করার রোখ মাথায় চেপে বসে।

জয় গোস্বামী, যিনি বিনয়ের কবিতার পাণ্ডুলিপি দেখেছেন, এবং টেলিফিল্মে বিনয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তিনি ‘আকস্মিকের খেলা’ (২০০২) গ্রন্থে  বলেছেন, বিনয়ের ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি যেন কাফকার ডায়েরি। পাণ্ডুলিপির মার্জিনে আছে স্বপ্নের অনুবর্তীতা, দ্রুত-নেয়া নোট, সংক্ষিপ্ত লিখন— তাঁর মনে হয়েছে, তিনি যেন কবির পাশেই রয়েছেন। যেমন যেমন কবি তাঁর লাইনগুলোকে আদল-আদরা দিচ্ছেন । জয় গোস্বামী এই সূত্রে উল্লেখ করেছেন বার্গম্যানের ‘থ্রু এ গ্লাস ডার্কলি’ ফিল্মটির, যা মোটামুটি ‘ফিরে এসো, চাকা’ রচনার সমসাময়িক। ফিল্মটিতে একজন নারী দেয়ালের ফাটলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন, যা নারীটিকে এক ঐন্দ্রজালিক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে সবাই আলোচনা করছে এবং অপেক্ষা করছে, লোকগুলোর মুখশ্রী উজ্বল, যে কোনো মুহূর্তে ঈশ্বরের দেখা পাবার জন্য। একজন কবি যদি ভিন্নভাবে আশপাশের বস্তু ও ঘটনাবলির দিকে তাকান, এবং সাধারণ মানুষ যেটুকু সচরাচর দেখতে পায়, তার চেয়েও বেশি কিছু দেখতে পান কবি, তাহলে তাকে মানসিক রোগগ্রস্ত তকমা দিয়ে দেয়া হয়, ‘থ্রু এ গ্লাস ডার্কলি’ ফিল্মের নারীটির মতো।

গ্রামের পথে বাজারে বিনয় মজুমদার স্থানীয় একটি দোকানের দিকে তাকিয়ে যখন অবলোকন করেন, তা শার্ল বদল্যারের ফ্ল্যনেয়ার থেকে ভিন্ন। তিনি দোকানটি, দোকানে রাখা জিনিসপত্র, দোকানের বিক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং সম্পর্কটির বিস্তার ঘটিয়ে বিশাল সৃষ্টিজগতের সঙ্গে সম্বন্ধস্থাপন করেন। সাধারণ গ্রামীণ দোকানটির সম্পর্ক রয়েছে স্থানীয় ক্ষেতের চাষিটির সঙ্গে, পৃথিবীর অভিকর্ষের সঙ্গে, অক্লান্ত সূর্যের সঙ্গে, দেবী সরস্বতীর সঙ্গে। ‘বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প’ (১৯৯৮) গ্রন্থে শিমুলপুরে তাঁর দিনযাপনের চিন্তাকর্ষক খতিয়ান মেলে। চলবে

ধারাবাহিক