করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৯৬৭৯ ৭০৭২১ ১৯৯৭
বিশ্বব্যাপী ১১২০৫০০৫ ৬৩৫৪২৬৯ ৫২৯৩৮০

বিশ্বজয়ী হও

পর্ব ৭

অমিত কুমার কুণ্ডু

প্রকাশিত : জুন ৩০, ২০২০

অনেকেই স্কুলজীবনে ভালো রেজাল্ট করতে পারে না। অথচ জীবনের অন্যপর্যায়ে গিয়ে দারুণ সফল হয়, সে শুধু তার অধ্যবসায়ের বলেই। অনেকেই অপরের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ভীষণ লজ্জা পায়, সেই আবার একাগ্রতা, পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তির বলে জীবনের কোনো একসময়ে শ্রেষ্ঠ বক্তা হয়ে ওঠে। অনেকেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থানেও থাকে না, সবাইকে অবাক করে দিয়ে পরের বছর সেই আবার প্রথম স্থান হওয়ার গৌরব অর্জন করে, সে শুধু তার সাধনার বলেই। মানুষ সব পারে। শুধু ইচ্ছাশক্তি থাকা চায়, শুধু লক্ষ্য স্থির থাকা চায়, শুধু অধ্যবসায় থাকা চায়।

তুমি সারাদিন পাঠমগ্ন থাকলেই তোমার জ্ঞান বাড়বে না। বিদ্যার জন্য চায় একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও মনোযোগী হওয়া। যদি সত্যই তা হও তবে জীবনে যে কাজে হাত দিবে সেটাই সফল হবে। সব কাজে বলবে আমি পারি, এরপর সে কাজ করার জন্য চেষ্টা করো, দেখবে ঠিকই পারবে। মনে রেখ, বালুকণা দ্বারা ঘষেই দাঁ ধারালো করা হয়, ছোট ছোট বালুকণা, কিন্তু একত্রে কী ভীষণ ক্ষমতা! অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা একটা লোহার অস্ত্রকে ক্ষয় করে করে ধারালো করে তুলছে। এমনিভাবে তোমার ছোট ছোট চেষ্টাও তোমার মেধাকে ক্ষুরধার করে তুলবে।

বন্ধু, চৈত্র মাসে কেমন রোদ পড়ে? সে সময় প্রচণ্ড খরার মধ্যে কোনো গাছের গোড়ায় যদি এক বালতি জল দাও তবে তৎক্ষনাৎ তা শুকিয়ে যাবে। এরপর পরের বালতি জল শুকাতে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগবে। এভাবে জল ঢালতে ঢালতে দেখা যাবে, এক সময় জল আর শুকিয়ে যাচ্ছে না। স্মৃতিও তেমন, বারবার অনুশীলন করতে করতে এক সময় মানুষ অনুশীলনের বিষয়টিকে আর ভোলে না। একদিন একটি ছেলে এক মেস থেকে পাশের মেসে একটি খাট নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। সামনের দরজা দিয়ে সহজেই খাটটি বের করা যায়, কিন্তু তাতে ডান হাত দিয়ে বাম কান ধরার মতো অনেকটা পথ হাঁটতে হয়, অথচ পিছনের দরজা দিয়ে বের করতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত মেসে চলে আসে খাটটি। ছেলেটি পিছনের দরজা দিয়ে বের করতে চাইলে সকলে বলল, অসম্ভব, এত ছোট দরজা দিয়ে চৌকী খাট বের হবে না!

ছেলেটি বলল, চেষ্টা করে দেখি, কৌশলে চেষ্টা করলে অবশ্যই সফল হবো।
সত্য বলছি, সকলের বাধা সত্ত্বেও চেষ্টা করে সেদিন অল্প আয়েশে ঠিকই সফল হয়েছিল ছেলেটি। ছেলেটির সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে হয়, জীবনে না শব্দটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে দাও। যদি সাময়িক ব্যর্থ হও, তবে উপর্যুপরি চেষ্টা করো, অথবা সেটা শিখে নাও। দেখবে, ঠিকই পারছ। তোমার যা আছে অন্যান্য সব মহৎ, জ্ঞানী, বড় মানুষের তাই ছিল। তবে কেন তুমি এদের মতো হতে পারবে না? লক্ষ্য স্থির রেখে চেষ্টা করে যাও, তুমি নিশ্চয় সফল হবে। অন্যরা যা পারে তুমি কেন তা পারবে না। চেষ্টা করলে তুমি অবশ্যই অন্যদের থেকে ভালো পারবে। একবার চেষ্টা করেই দেখ না। চেষ্টা করলে তোমার কাছে জটিল সবকিছুই সহজ হয়ে যাবে। ক্রমশ তুমি যে কাজে ভয় পেতে, তা অঙ্ক হোক, বিজ্ঞান হোক, উচ্চাঙ্গ সঙ্গিত হোক কিংবা জীবনের বড় কোন সমস্যা হোক চেষ্টার দ্বারা সে কাজ সহজ হয়ে উঠবে।

মানুষ সবকিছু শিখে জন্মগ্রহণ করে না, বরং জন্মগ্রহণ করে সব কিছু শেখে। মানুষের প্রতিটি কাজ তা ভুল হোক বা ঠিক, তাকে এক একটি নতুন শিক্ষা দেয়। নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার করে। ভুল মানুষের জীবনের সব থেকে বড় শিক্ষক। ভুল হয়েছে বলে দুঃখ করো না, অচিরেই দেখবে তুমি সে ভুল থেকে চমৎকার শিক্ষা পেয়েছ। যে শিক্ষা তোমাকে সামনের দিতে এগিয়ে নিতে, সামনের পথ চলতে চমৎকার ভাবে সাহায্য করবে। তাই কোন কিছুকেই কঠিন ভেবে দূরে ঠেলে দিতে নেই, কঠিনকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করতে হয়। কাজের মাঝে আনন্দ খুঁজে নিতে হয়। আমরা যখন কনসার্টে যাই, তখন কয়েক ঘণ্টা নাচলেও ক্লান্তি আমাদের ঘিরে ধরে না, অথচ সামান্য মাটি কাটলেই আমাদের মতো শহুরে লোকজন ক্লান্ত হয়ে যায়। কারণ কনসার্ট আনন্দে করি আর মাটি কাটা নিরানন্দে, বিরক্তি নিয়ে করি। এটাই পার্থক্য।

যখন আমরা রোমান্টিক বা অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস পড়ি তখন কোথা থেকে যে সময় চলে যায় আমরা টের পাই না। অথচ দেখ, পাঠ্যবই পড়তে কত অনিহা। আবার যখন মুভি দেখি একই ভাবে চোখের পলকেই সময় চলে যাই, অথচ সেই একই মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাস করতে কত বিরক্তি। এগুলো সবই মানসিক ও আপেক্ষিক বিষয় যা আনন্দ ও নিরানন্দের কারণে ঘটে থাকে। বিজ্ঞানী আইনইস্টাইনকে নিয়ে একটা গল্প আছে। তিনি যখন আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রদান করলেন, তখন এক ব্যক্তি তার কাছে প্রশ্ন করেছিলেন, আপেক্ষিক তত্ত্ব কী? তিনি তখন মজা করে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন জ্বলন্ত উনুনের পাশে বসে রান্না করি তখন একঘণ্টা কাটতেই চাই না, আবার যখন সুন্দরী প্রেমিকার হাত ধরে সমুদ্রের ধারে হেঁটে বেড়ায় তখন এক ঘণ্টা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। এটাই আপেক্ষিক তত্ত্ব।’ আসলেই তাই।

আমাদের মন যা চাই তা যখন করি তখন সে কাজ সহজ ও সুন্দর লাগে, আর মন যখন চাই না তখন সে কাজ জটিল ও কঠিন লাগে। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কী মনের দ্বারা চালিত হবো, না মন আমাদের দ্বারা চালিত হবে। যদি মনকে আমাদের দ্বারা চালিত করতে হয়, তবে মনের উপর নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যে জন্য দরকার একাগ্রতা ও মেডিটেশন। চোখ বুজে মেরুদণ্ড সোজা করে বসে অনন্তের সাথে নিজেকে বা নিজের সাথে অনন্তের যোগাযোগ স্থাপন করা বা কোনো বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা বা সকল চিন্তা থেকে কিছু সময়ের জন্য নিজেকে মুক্ত করার নামই মেডিটেশন। যখন আমরা আমাদের মনকে নিজেদের ইচ্ছামতো চালিত করতে পারি তখন আমরা সব কিছু করতে পারি। তখন আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্মাণ করতে পারি। তখন সদা আনন্দ। জগৎ আনন্দময় হয় আমাদের কাছে। তখন আর কোন কিছুই কঠিন মনে হয় না, কোন কিছুই দুর্ভেদ্য মনে হয় না।

এক বৃদ্ধ ভিখারীর সোনার বাটিতে করে গরম দুধ সোনার চামচ দিয়ে নেড়ে ফুঁ দিয়ে দিয়ে খেতে ইচ্ছা করেছিল। এক পথচারী তার ইচ্ছার কথা জেনে তাকে প্রশ্ন করলেন, আপনার কাছে কি সোনার বাটি আছে? ভিখারী উত্তর দিল, না। তখন পথচারি প্রশ্ন করলেন, সোনার চামচ আছে? সে তাতেও বলল, না। তখন বললেন, দুধ আছে? বৃদ্ধ ভিখারী একই ভাবে বলল, না। তখন পথচারী বিরক্ত হয়ে বললেন, আপনার কাছে আছেটা কী? সে তখন বললো, ফুঁ।

গল্পটা শোনার পর সবাই হো হো করে হেসে উঠল। গল্পকার তখন বললেন, তোমাদেরও ওই বৃদ্ধ ভিখারীর মতো অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে, তবে তার জন্য শুধু ফুঁ থাকলে হবে না। পরিশ্রম করে নিজের ঝুলিতে কিছু রাখতে হবে। তাহলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তব হয়ে ফিরে আসবে। আামিও বিশ্বাস করি, আমরা যদি আত্মবিশ্বাসী হই, যদি নিজে বিশ্বাস করি নিজের মনকে, যদি নিজের আবেগ দ্বারা চালিত না হয়ে বরং নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, নিজের বিচার-বুদ্ধি ও বিবেচনা শক্তি দ্বারা নিজের মনকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে চালিত করতে পারি, তবে আমরাও সব করতে পারি। জয় এসে আমাদের হাতের মুঠোই ঠিকই ধরা দেবে।

যুদ্ধ বিমানের পাইলটই হোক আর পরমাণু বিজ্ঞানীই হোক, তারা যদি পারে তুমিও পারবে। কারণ এসব জ্ঞান তোমাদের পূর্বসূরীদের দ্বারাই বিকশিত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে তোমাদের দ্বারাই বিকশিত হবে। যেহেতু এসব জ্ঞান-বিজ্ঞান মানুষের দ্বারা সৃষ্টি, সেহেতু আমরা এটা নিশ্চয় বিশ্বাস করতে পারি, অন্যরা যা পারে আমরাও তা পারব। অন্যরা মহাকাশে গেলে আমরাও পারব। অন্যরা মঙ্গলে গেলে আমরাও পারব। শুধু তাই নয়, আমরা হাজারো নতুন বিষয় আবিষ্কারও করতে পারি। সেই সাথে এটা নির্দ্বিধায় মেনে নিতে পারি, মানব সৃষ্ট কোনও কিছুই কঠিন নয় বা এমন নয় যা আমরা বা তোমরা করতে পারব না। বরং আমরা বলতে পারি আমরা সব কিছু করতে পারি। সব কিছু। শুধু আমাদের ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকা চাই। একথা আমি বিশ্বাস করি, তুমিও বিশ্বাস করো। তাহলেই সফল হবে। তাহলেই এগিয়ে যাবে। চলবে