ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী তিতুমীরের আজ জন্মদিন
ছাড়পত্র ডেস্কপ্রকাশিত : জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী নেতা সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীরের আজ জন্মদিন। ১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহাকুমার বাদুড়িয়া থানার চাঁদপুর গ্রামে তার জন্ম। পিতার নাম মীর হাসান আলী, মাতার নাম আবিদা রোকেয়া খাতুন।
তিতুমীরের প্রাথমিক শিক্ষা হয় গ্রামের বিদ্যালয়ে। পরে স্থানীয় মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। ১৮ বছর বয়সে তিতুমীর কোরানে হাফেজ হন এবং হাদিস বিষয়ে পাণ্ডিত্য লাভ করেন। একই সাথে তিনি বাংলা, আরবি ও ফার্সি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ১৮২২ সালে তিতুমীর মক্কায় হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশে যান।
তিনি সেখানে স্বাধীনতার অন্যতম পথ প্রদর্শক সৈয়দ আহমেদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ও ওয়াহাবি মতবাদে অনুপ্রাণিত হন। সেখান থেকে এসে (১৮২৭) তিতুমীর নিজ গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের নিয়ে জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন।
তিনি ও তাঁর অনুসারীরা তৎকালীন হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে ধুতির বদলে তাহ্বান্দ নামের এক ধরনের বস্ত্র পরতে শুরু করেন। তিতুমীর হিন্দু জমিদার কৃষ্ণদেব রায় কর্তৃক মুসলমানদের ওপর বৈষম্যমূলকভাবে আরোপিত দাড়ির খাজনা ও মসজিদের করের তীব্র বিরোধিতা করেন।
তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে স্থানীয় জমিদার ও নীলকর সাহেবদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হতে থাকে। আগেই তিতুমীর পালোয়ান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। আগে তিনি জমিদারের লাঠিয়াল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি তার অনুসারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলেন।
তিতুমীরের অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে ৫,০০০ গিয়ে পৌঁছায়। তারা সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়। ১৮৩১ সালের ২৩ অক্টোবর বারাসতের কাছে বাদুড়িয়ার ১০ কিলোমিটার দূরে নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে তারা বাঁশের কেল্লা তৈরি করে। বাঁশ ও কাদা দিয়ে তারা দ্বি-স্তর বিশিষ্ট এই কেল্লা নির্মাণ করে।
তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া ও ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিকার নিয়ে সেখানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্থানীয় জমিদারদের নিজস্ব বাহিনী ও ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের হাতে বেশ কয়েকবার পরাজয় বরণ করে। তন্মধ্যে বারাসতের বিদ্রোহ অন্যতম।
উইলিয়াম হান্টার বলেন, “ওই বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষকসেনা তিতুমীরের পক্ষে যুদ্ধ করে।”
১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিতুমীর স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন, “ভাই সব, একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আক্রমণ করবে। লড়াইতে হারজিৎ আছেই, এতে আমাদের ভয় পেলে চলবে না। দেশের জন্য শহিদ হওয়ার মর্যাদা অনেক।”
তিনি আরও বলেন, “এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে। আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এই পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।”
১৪ নভেম্বর কর্নেল হার্ডিংয়ের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের আক্রমণ করে। তাদের সাধারণ তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার সৈন্যরা ব্রিটিশ সৈন্যদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। ১৮৩১ সালের ১৪ নভেম্বর ইংরেজ বাহিনী তিতুমীর বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়।
মুজাহিদরা সাবেকি ধরনের স্থানীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আধুনিক অস্ত্র সজ্জিত ইংরেজ বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়ে বাঁশের কেল্লায় আশ্রয় নেয়। ইংরেজরা কামানে গোলাবর্ষণ করে কেল্লা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয়। বিপুল সংখ্যক মুজাহিদ প্রাণ হারায়। বহুসংখ্যক অনুসারিসহ তিতুমীর যুদ্ধে শহিদ হন। দিনটি ছিল ১৯ নভেম্বর, ১৮৩১।
মুজাহিদ বাহিনীর অধিনায়ক গোলাম মাসুমসহ ৩৫০ মুজাহিদ ইংরেজদের হাতে বন্দি হন। গোলাম মাসুম মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। ১৪০ বন্দিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর বাহিনীর প্রধান মাসুম খাঁ বা গোলাম মাসুমকে ফাঁসি দেওয়া হয়। বাশেঁর কেল্লা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।























