অলঙ্করণ: দীপাঞ্জন সরকার
ভূমিপুত্রের একগুচ্ছ কবিতা
প্রকাশিত : মার্চ ০৩, ২০১৮
ভূমিপুত্রের একগুচ্ছ কবিতা
পদচুম্বনে প্রার্থনা জানাই
বৈশাখের ঊষালগ্নে আজ
প্রিয় পিতা, প্রিয় মাটি, প্রিয় কণ্ঠস্বর
পদচুম্বনে প্রার্থনা জানাই
আকাশ ভরা সুন্দরের বীজ
নষ্ট করো না।
হাত ধরে এসেছো কতটা পথ
তুমি তো তা জানো, আমিও যে জানি
সেতু ভাঙার গোপনশব্দে যাতনা খুব বেশি
বেহিসেবি পদক্ষেপে বৃন্ত থেকে খসে পড়ে মানুষ,
জন্ম নেয় অকারণ দুঃখ সংশয় অসীম বিলাপ
গলিত রক্ত পুঁজে ভেসে যায় সঞ্চিত নীলপদ্ম সব...
বুক ছুঁয়ে এসেছি কতটা পথ
তুমি তো তা জানো, আমিও যে জানি
প্রশ্নের পশ্চাতে থাকে গোপন কারণ
স্পর্শের পশ্চাতে থাকে
চোখজোড়া আকাশ নিয়ে অপেক্ষা অনেক...
প্রিয় পিতা, প্রিয় জল-মাটি-মেঘ
প্রিয় শঙখচিল, বৈশাখের ঊষালগ্নে আজ
পদচুম্বনে প্রার্থনা জানাই
শ্রম নুন ঘামের সেলাই ছিঁড়ে ফেলো না
তুমি তো তা জানো, আমিও যে জানি
ভালোবাসা পেয়ে কেউ কেউ বেঁচে উঠি
না পেয়েই... কেউ হই দূরতম নদী।
পরাজিত হয় না হৃদয়
সবাই পথে নামে
তবু প্রার্থিত গন্তব্য ক`জনের পায়ে মেলে বলো!
পাথরের আঘাতে খুব ক্ষত, ভুল প্রেমে রক্তের ভয়
তবু পরাজিত হয় না হৃদয়।
সংসার হলো না তাতে কী
চুম্বনে বাধা নেই, দ্বিধা নেই সঙ্গমে তুমুল
যদি হৃদয় ডেকে নেয় অন্য এক একাকী হৃদয়
জানি একদিন দেখা হবে তোমার আমার
কোনো এক জনারণ্যে, কোনো এক বিজন পথের ধারে
জ্যোৎস্না বা জোনাক কুড়াতে এসে আমি তো জানি
তুমি ও আমি দুজনেই দুঃখ পলাতক
দুজনের একই রঙের শোক, ভাঙা হৃদয়ের গল্প
গভীর প্লাবনে ভেজা যন্ত্রণাদগ্ধ চোখ স্বপ্নহীন,
তবু দেখা হবে
এ হৃদয় পথ হারাবে না...
যদি প্রকাশিত হও, যদি দয়া করো
সূর্যকে সাক্ষী রেখে একদিন তোমাকে ছোঁবো
একদিন হাঁটু গেড়ে নতজানু আমি
চিবুকে ছুঁইয়ে এই ঠোঁট অবেলার ভালোবাসা হবো।
ভাঙনকাল
এখন আর মানুষে মানুষে মায়া হয় না
মানুষের হৃদয় পায় না এখন আর কাঙ্ক্ষিত তাপ
খসখসে পাপের ঘঁষা লেগে উঠে গেছে হৃদয়ের আঁঠা...
এখন আর ঈশ্বরেচন্দ্র নেই
অজস্র জীবন আছে
তবে তাতে আনন্দ নেই মোটে
রবীন্দ্র নজরুল থাকে পোস্টারে আঁকা সস্তা ফুটপাথে
এখন চেতনার কাগজে বানায় কনডমের ঠোঙা
চোরাস্রোতে ডুবে যায় সাধের পানসি মানবের
যৌবন লাগে না আর শিল্পের কাজে
অমল কৈশোরে কেউ আকাশে ওড়ায় না তার
লাল নীল স্বপ্নের ঘুড়ি
সামনে চোখ রেখে পেছনে হেঁটে যাওয়া, এ এক চমৎকার খেলা!
এখন আর মানুষের সাথে মানুষের দেখা হয় না
হৃদয় পায় না হৃদয়ের খোঁজ
সূর্যসেন কালি করে দানবের জুতো
ইলা মিত্র ঝাড়ু দেয় রাক্ষসের উঠোন
এখন আর মানুষ
হাতে হাত জোড়া দিয়ে জীবনকে আগলে রাখে না।
এখন আর ঘরে পথে কোথাও নেই স্বপ্ন কারিগর
কেউ বলছে না দ্যাখো,
আমি জীবনের বুনন শিখেছি
নতুন ভঙ্গিমায়, বানাতে শিখেছি বিশ্বাসের মজবুত সেতু
যাতে করে ভালোবাসা সহজেই পৌঁছতে পারে
জীবন থেকে অন্য জীবনে মানুষের
এখন আর মানুষে মানুষে মায়া হয় না
অবুঝ শিশুর কান্নায় চমকে চোখ মেলে চারপেয়ে পথের কুকুর
দু’পেয়ে শতেক হৃদয় কুকুরের কাছে মানে হার
এখন আর ভালোবাসা নেই মানুষে মানুষে
তবে তার শঙ্কা আছে ঢের
তবে কি ফুলের জন্ম ভুল
তবে কি মানব জন্ম পাপ!
তা না হলে সূর্যকে পেছনে ফেলে
কেন এই অর্থহীন দৌড়
কেন এই শূন্যতায় গিঁট দেয়া দিন
কেন এই অন্তহীন অমাবশ্যায় ফুলেল সৌরভ হারায় মানব জীবন
অপ্রয়োজনীয় আগাছায় ভরে যায় মানুষের পাললিক মন?
তা নাহলে কেন এই মায়াহীন একলা আকাশ
তা নাহলে কেন এই অসুখের মিছে চাষাবাদ।
শ্যামাদির শেষচিঠি
শ্যামাদিকে আজ খুব মনে পড়ছে রঞ্জন... ৪৩/ছ বেনিবাবু রোডের পুরোনো সেই কালিমন্দির মন্দিরের পাশের গলিতে নোনাধরা স্যাঁতসেঁতে দোতলা বাড়ি, যে বাড়িতে শ্যামাদিরা থাকতেন; তোর মনে আছে কিনা জানি না, শ্যামাদি দীর্ঘশ্বাস আর জলরঙ মিশিয়ে প্রেম আর প্রার্থনার ছবি আঁকতেন। মনখারাপের দুপুরগুলোতে দিদির বুকের মধ্যে রক্তাক্ত পাখির ডানা ঝাপটানি শোনা যেত। দিদি আমার হু হু করে কাঁদতেন, আর উচ্ছ্বসিত সন্ধ্যাগুলোতে জীবনবাবুর কবিতাগুলো তার কণ্ঠে প্রাণ ফিরে পেত। দিদি দুই বেনী করে চুল বাঁধতেন। শ্যামাদির বোধহয় আরো দুটো দিদি ছিল, তাই নারে? ছিল চোখে ছানিপড়া বৃদ্ধা মাসি, ডানপিটে তিনটে খরগোস, লাল টুকটুকে ঠোঁটের একটি ঝগড়াটে টিয়া আর ছাদের আলসেতে একটি নিঃসঙ্গ চন্দ্রমল্লিকার টব। কিন্তু দুঃখ এই, জীবন প্রত্যাশী মেয়েটিকে উষ্ণ রাখার জন্য তার বুকের কাছে বলিষ্ঠ একজোড়া হাত ছিল না। যতদূর মনে পড়ে, দিদিকে আমার কেউ কখনো বলেনি, শ্যামা, তুমি অপেক্ষা করো আমার ট্রেন এইমাত্র ছাড়লো, আমি আসছি! সেই কতদিন আগে, যখন আমি ফড়িঙের পিছু ছেড়ে কবিতার পালক ধরতে শিখেছি, যখন আমার কাছে শ্যামাদি মানেই সঙ্গাহীন একটি দুঃখের নাম, রঙহীন বিষণ্নতার নাম, তখন একদিন দিদি আমার চিবুক ছুঁয়ে বলেছিলবুকের মধ্যে দুঃখকে ঘর বাধতে দিস না, মরে যাবি। মনের উঠোনে বিষাদকে অতিথি করিস না, পুড়ে যাবি; শ্যামাদি আজ নেই রঞ্জন, শুধু আমার ডায়েরীর ভাঁজে তার শেষ চিঠিটাই শ্যামা হয়ে বেঁচে আছে একা। যে চিঠিতে দিদির শেষ আর্তনাদ ছিল এই, ঈশ্বরের দেখা পেলে গোপনে শুনিস, মেয়েদের সুখের প্রতি সে এত উদাসীন কেন!























