মব লিঞ্চিং ও ফ্যাসিবাদ

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশিত : অক্টোবর ২২, ২০১৯

মব লিঞ্চিংয়ের যে ঘটনা ভারতের হিন্দুত্ব ফ্যাসিস্ট শাসনে দেখা যায়, একই ধরনের লিঞ্চিং দেখা গেল ভোলায়। যেখানে ধর্ম ব্যবসায়ীরা কথিত ধর্ম অবমাননার নামে মব তৈরি করে পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

এখন কথা হলো, এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? এ উগ্র-সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা রুখে দেয়া যেত। এ ধর্মান্ধ মানুষগুলোর জীবন বাঁচানো যেত! যদি আগের রাতেই কওমি নেতা শফি বা তার স্যাঙ্গাৎদের দিয়ে বক্তব্য দেয়ানো যেত। যা ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্টদের জন্য কোনো বড় বিষয় ছিলো না। কিন্তু তারা সেটা করেনি।

ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্টরা বরাবরই ধর্মকে তাদের অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ধর্ম-নিরপেক্ষতার নামে তারা বরাবরই সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম বিশ্বাসকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে। তারা ধর্ম ব্যবসায়ীদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে উপাধি কুড়িয়ে নেয়। আবার সময় আসলে সেই ধর্মান্ধদের বলি দিতেও পিছপা হয় না। শাপলা চত্তর, হেফাজত আর ক্র্যাকডাউনের স্মৃতি খুব মলিন হয়ে যায়নি নিশ্চয়ই!

এবারের ঘটনায় কিছু বিষয় বোঝাটা খুব জরুরি। ভারতে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ব ফ্যাসিস্টরা তাদের রাষ্ট্রীয় সম্প্রসারণবাদী নীতির সঙ্গে উগ্র-হিন্দুত্ববাদেরও সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। আর এখানে ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্টদের ওপর ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সঙ্গে সঙ্গে ওই হিন্দুত্ববাদের প্রভাবও বিরাজমান। যা আবরারের হত্যাকাণ্ডে প্রকাশ্যে এসেছে। একইসঙ্গে ইসলামের নামে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোকেও তারা নিজেদের ক্ষমতা কাঠামোর স্বার্থেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। এ উগ্র-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী কার্যত ক্ষমতাসীনদের দ্বারাই পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তারা ওই পোষ্য গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করেনি। তারা এ ধর্মীয় উন্মাদনা বাড়াতেই চেয়েছে। এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছে, যেখানে মানুষের রক্ত ঝরবে। তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নামে কার্যত সাম্প্রদায়িক বিভক্তির বিষবৃক্ষ বিকশিত করছে।

পুলিশ-র‍্যাবের বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমরা অবশ্যই বলবো, বলতে হবেই। তবে ধর্মান্ধদের মব থেকে বাঁচতে গুলি করাটাকে আমি অন্তত রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে ধানক্ষেতে ফেলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এক করে দেখতে রাজি নই। ওই মবে যারা মারা গেল, তাদের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে যারা বলতে চাইবে, তারা একবার ভাবুক তো, গুজরাটে যখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছিলো, তখন উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদী মব থেকে মুসলিমদের বাঁচাতেও পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। সেখানে ওই হিন্দু ধর্মাবলম্বী পুলিশ নিজের চাকরি বা জীবনের মায়া না করেও যখন গুলি চালায়, তখন সেটাকেও কি আপনারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলবেন?  

পুরো বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার অবকাশ নেই। পুলিশের গুলি চালানোটা ন্যায্য বা অন্যায্য বলে বিতর্ক জুড়ে দেয়ার মানে হলো, ঘটনাকে সামগ্রিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা। ফ্যাসিবাদের অধীনে যে কোনো ঘটনাকে ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত করেই ভাবতে হবে। আর সেক্ষেত্রে ভিন্নমত চর্চার প্রশ্নটাই তোলা দরকার। ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদীরা যে কাঠামো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিয়েছে, সেখানে আছে ভিন্নমত দমন আর ব্লাসফেমি। এক্ষেত্রে সেটাই মূল ঘটনা। আ

বার রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা ভোলায় সাম্প্রদায়িক মব সংগঠিত করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা। এর সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতা চর্চার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আর খণ্ডিতভাবে দেখলে, ধর্ম বিশ্বাসের অবস্থান থেকে এ ঘটনাকে বিচার করলে সমস্যার মূলে আঘাত করা সম্ভব নয়। সমস্যার মূলে আঘাত করার মধ্য দিয়েই জনগণের মুক্তির পথ নির্দেশ করা সম্ভব। ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বেগবান করার মাধ্যমেই কেবল সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রাম অগ্রসর করা সম্ভব।

ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক! সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ নিপাত যাক! লাল সালাম!

ধারাবাহিক