মাসুদ খানের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : নভেম্বর ০৯, ২০১৮

চিরকুট

বাতাসে ভাসিয়ে দিয়েছিলে চিরকুট
না-জানি-সে কতকাল আগে!
কত দেশ, কত ঋতু, কত বিচিত্র বাতাস! —
মন্থর, ব্যাকুল, বাউরি, ঝোড়ো, হু-হু, মৌসুমি ও হিম...
একে একে সব রকম বাতাসে ভর ক`রে
বহু দেশ ঘুরে-ফিরে শেষে
আমারই সামনে দিয়ে যেই ভেসে যাচ্ছিল তোমার
সেই হস্তলিপি, অমনি ধরে ফেলেছি তা হালকা হস্তক্ষেপে।

দেশ থেকে দেশে অবিরাম ভেসে চলবার কোনো এক ফাঁকে
মিদাসের মৃদু স্পর্শ বোধহয় পেয়েছিল তোমার পাঠানো
সে-চিরকুটের আঁকাবাঁকা অক্ষরস্রোত।
তাই তো সে-স্রোত যেন কীরকম সোনালি-সোনালি!
পশ্চিমের আকাশটা আজ হৈম, সুবর্ণসংকাশ।

ভবঘুরে মনমরা একলা মেঘলা পাখির মতো

সেই কবে যে এসেছিলাম পথ ভুলে
সে-কোন বহির্ভুবন থেকে!

এসে কত কী যে দেখা হলো!
শিশুকে প্রহার করছে একটি মেয়ে।
শিশুটি কাঁদছে। বলছে, ‘ফেরত দিয়া দাও আমারে আল্লার কাছে।’
অজানা শঙ্কায় শিউরে উঠে সঙ্গে-সঙ্গে ফের
শিশুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলছে মেয়েটি—  
অ্যাবসার্ড-প্রায় দৃশ্য, দেখা হলো তা-ও।

দেখলাম, সহ্যাতীত দুঃখশোক সয়ে যায় গ্রহের প্রাণীরা।
অনাহারে কদাহারে কাহিলও অনেকে।
তবুও কেমন যেন রঙ্গরসে টইটম্বুর! এক চোখে অশ্রু,
অন্য চোখ অহৈতুকী আনন্দে ভরপুর।  
সময়ই সারিয়ে তোলে তাদের বিবিধ ক্ষত আর ক্ষয়ক্ষতি।

এও দেখলাম—
মাধবরোমাঞ্চে ভরা এ জগতে
প্রেম এক উপচে-পড়া উৎসবের মতো,
যে উৎসব তুঙ্গ জমে ওঠে
দিনের প্রথম আর পড়ন্ত বেলায়।

অনেক তো হলো এ সংসারে—  
বহু হাসাহাসি হলো। ভালবাসাবাসি, তা-ও হলো।
মধুমাধবের দিনে জমে উঠল কত অম্লমধুর উৎসব।
অনেক ঘটনা হলো, আর
অনেক কথাই ঘটতে ঘটতে পুরাঘটিত অতীত...

এইবার, বেলা পড়ে এলে
কূটাভাসে ভরা এ-ভুবন ছেড়ে
ভবঘুরে মনমরা একলা মেঘলা পাখির মতন
এক ডানা একটু কাত করে ভেসে যাব ধীরে ধীরে
নিরুদ্দেশে, বহুদূরে, আকাশগঙ্গার ওই পারে।

বেলাবেলি পাড়ি দিতে হবে মহাকাশ...
অচিরেই আকাশের অবতলে ফুটে উঠবে একটি-দুটি তারা।

জীবের জীবন

নাভিমূল থেকে সাইফন করে তুলে-আনা প্রলম্ব আওয়াজ
ধারালো জিকিরধ্বনি, কুফরি কালাম, আরতিকৃত্যের বুলিয়ান বীজগণিত...
তারপর পাশুপত দৃষ্টিক্ষেপ, পূর্বরাগ, রমন্যাস...
অতঃপর জীবনের প্রথম রমণ—
গুজব ও বক্র ব্যাসকূটে-ভরা রোলার কোস্টারে
প্রথম আরোহণের রোমহর্ষ অভিজ্ঞতা, দুকূল-ছাপানো
শিহর-জাগানো লাল-লঙ্কা বিনোদন।

তরল মানবফল, ভেতরে তরল বীজ।
মাত্র দুয়েকটি ছাড়া সব বীজ চিটা ও নিষ্ফলা।
সেই একটি বা দুটি সুপুষ্ট সফল বীজই অঙ্কুরিত একদিন।

প্রথমেই চারাগাছ, দিনে দিনে সবল সুঠাম মহিরুহ,
আসে পুষ্পপ্রকাশের ঋতু—
প্রগাঢ় তরল সেই ফুল, সান্দ্র তার রেণুপুঞ্জ, ঘন-নিবিড় নিষেক,
তরল পরাগায়ন...

কালক্রমে ফের সেই মধুফল, ফল আরো গলতে গলতে নিখাদ তরল।

পূর্বমানবের পরমায়ু শুষে নিয়ে
আয়ু পায় উত্তরমানব।

এভাবেই কিছু শুভাশুভচক্রে কেটে যায় বদ্ধ ক্ষুদ্র জীবের জীবন।

সিংহাসন ও শীতবস্ত্র

যেসব জীবের অভ্যন্তরে তুমুল উত্তাপ
শীতল তাদের ত্বক, ঠাণ্ডা রোমরাজি।

আর
ভেতরটা যাদের শীতল,
বাহিরটা তাদের উষ্ণ যথারীতি।

চুল্লিগর্ভ সিংহের হুঙ্কার
আর সেই হুঙ্কারের ওপর বিছিয়ে দিয়ে কেশরশোভিত টানটান সিংহচর্ম,
সুসজ্জিত করা যায় বটে সিংহাসন,
কিন্তু সেই কেশরে হয় না কোনো শীতের বসন।

ভেতর ও বাইরের এ এমন এক কারসাজি
শীতবস্ত্রে লাগে নম্র নিরীহ মেষের রোমরাজি।

বাস্তবতা

ছেলেটি আহার করে, মুগ্ধ হয়ে তা-ই দ্যাখে তার অভুক্ত মা,
নির্নিমেষ, কুপির আলোয়।
এবং তাতেই হয়ে যায় তার রাতের আহার।

কেউ বলে নিরুদ্দেশ, কেউ বলে গুমখুন। বহুকাল পরে
যেদিন ভিড়ের মধ্যে ছেলেটিকে, হুড-তোলা হালকা জ্যাকেটে,
বিজলিচমকের মতো একঝলক দেখতে পেল তার মা,
দিনে-দিনে একদম ভেঙে-পড়া উদ্ভ্রান্ত জননী,
সেইদিন থেকে শেষ সদবাস্তবতার কাল,
শুরু হলো সে-এক ফণীতে-মণিভ্রম
গরলে-মধুকভ্রম আলেয়াবাস্তবতার পর্ব।