মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও স্বাধীনতার ঘোষণা

পর্ব ১

শায়লা শবনম

প্রকাশিত : মার্চ ২৮, ২০২৬

ভূমিকা
স্বাধীনতা ধ্রুপদী একটি শব্দ। স্বাধীনতা শব্দটি শুনলেই বুকের ভেতর এক আনন্দময় অনুভব তৈরি হয়। `আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে, গাছে গাছে পাখি ডাকে, কত শোভা চারিপাশে!’ এই গানটির মতো উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে যায় চারপাশে। স্বাধীনতা এমনই এক চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, যা অর্জনের জন্য শতাব্দীর পরে শতাব্দী মানুষ প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। রচিত হয় অন্তহীন আন্দোলন, দুঃসাহসী সংগ্রামের ইতিহাস। স্বাধীনতা অর্জনের প্রত্যাশায় পরাধীন মানুষ প্রয়োজনে নিজেদের জীবন দিতেও দ্বিধা করে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসও এক অবিস্মরণীয় আখ্যান। মুক্তির মন্দির সোপান তলে লক্ষ প্রাণের বলিদানে রচিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতার সোনালি ইতিহাস।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথপরিক্রমা
পৃথিবীর মাত্র দু`টি দেশে স্বাধীনতার লিখিত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং অন্যটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। স্বাধীনতা ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছাতে বাংলাদেশকে অতিক্রম করতে হয়েছে সহস্র বছরের সংগ্রামের বিশেষ পথ। হাজার বছরের পথপরিক্রমায় বাঙালি চিরদিনই মাথা উঁচু করে চলা এক অপ্রতিরোধ্য জাতি। প্রাচীনকাল থেকেই এই গাঙেয় উপত্যকা ছিল প্রাচুর্যে, সম্পদে ও ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ। `গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা গরু` প্রবাদটি এই অঞ্চলের মানুষের প্রাচুর্যকেই প্রমাণ করে। সম্পদের এই সম্ভার এ দেশের মানুষকে নিশ্চিন্ত নির্ভরতা দিয়েছিল, তৈরি করেছিল আত্মবিশ্বাসী-সাহসী-স্বাধীনচেতা জাতি হিসেবে।

অন্যদিকে পৃথিবীর অনেক জাতির মানুষের মধ্যে মোহ আর লোভের জন্ম দিয়েছিল সোনার বাংলার সম্পদ। তাই তো ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতির দ্বারা বাঙালিদের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে বারবার। বিদেশি নানা জাতি দ্বারা এই দেশকে শাসিত ও শোষিত হতে হয়েছে সুদীর্ঘকাল। কখনো উত্তর ভারতীয় গুপ্ত বংশ বা দক্ষিণ ভারতীয় সেন বংশের দ্বারা, কখনো মধ্যপ্রাচ্যের তুর্কি-মোঘল-আফগানদের দ্বারা, কখনো ইউরোপীয় পর্তুগিজ-ফরাসি-ইংরেজদের দ্বারা শাসন ও শোষণ চলেছে এই ভূখণ্ডে। কয়েকশো বছরের পরাধীনতার শেষে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ভারতীয় উপমহাদেশ। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নেয় ভারত ওপাকিস্তান নামের দুটো স্বাধীন রাষ্ট্র।

আর রাজনীতির এক জটিল সমীকরণে বর্তমান বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্ব বাংলা যুক্ত হয়ে যায় ১২০০ মাইল দূরের পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে। এই সংযুক্তি হলো মূলত লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে।

লাহোর প্রস্তাব ও স্বাধীনতার সম্ভাবনা
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে লাহোর প্রস্তাব এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়, যা `লাহোর প্রস্তাব` নামে পরিচিত। এই প্রস্তাবের উত্থাপন করেছিলেন তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ.কে. ফজলুল হক। এই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন হলে বাংলা এককভাবে রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের কনভেনশনে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবকে নাকচ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোতে একাধিক রাষ্ট্রের পরিবর্তে পূর্ব বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে একটিমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়।

মূলত এই প্রস্তাবথেকেই সুবিশাল দূরত্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে বিস্তর পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পূর্ববাংলা যুক্ত হয়ে যায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে। ফলে, ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হলেও কার্যত স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি বাংলার মানুষের। এক শাসক থেকে অন্য শাসকের অধীনে শাসিত হওয়া শুধু। আর তাদের শোষণ ও বঞ্চনার কাহিনি থেকে যায় একই রকম, অপরিবর্তিত।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও এটি ছিল এক অবাস্তব পরিকল্পনা। পাকিস্তানের দুই অংশের মাঝখানে ছিল সুবিশাল ভারত। পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে কোনো ভৌগোলিক সংযোগ ছিল না। দূরত্ব ছিল প্রায় ১২০০ মাইল। একমাত্র ধর্মীয় ঐক্য ছাড়া এই দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে আর কোনো মিলই ছিল না। নৃতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, দৃষ্টিভঙ্গি তথা সামগ্রিক জীবনধারায় পূর্ব বাংলার মানুষ ছিল পাকিস্তানিদের চেয়ে আলাদা। তারপরও আর্থ-সামাজিক মুক্তির প্রত্যাশায় তারা পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করে যুক্ত হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে। কিন্তু জন্মের পর থেকেই বিভাজন, বৈষম্য আর অবমূল্যায়নের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের মোহভঙ্গ হতে শুরু করে। চলবে