রথো রাফির কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশিত : এপ্রিল ২২, ২০২০

ভেসে আসে তোমার মুখ

হয়তো হৃদয় ও মেধার সেতু তুমি দূর থেকে ভাবি
তাই ধরো তুলোর বোঝা নিয়ে নির্দ্বিধায়
নদীতে নেমে গেল ফের এই গাধা


তুমি কি তখন তার কানে কানে
কেবল ডুবে যাওয়ার গানই গেয়ে যাবে
পৃথিবীর সবচেয়ে মিঠে সুরে


দূর থেকে দেখেছি নিবিড় সবুজ বনভূমি
আদিগন্ত বিস্তৃত একটিই যেন গাছ
ঘনিষ্ঠতায় দেখেছি তারা কত আলাদা আলাদা


মুগ্ধতাবশত কে না দূরে থেকে ভাবে
আমরা একে-অপরের আশ্চর্য আয়না
তবু কতজন কত কথা বলে


এমনকি প্রাণপ্রিয় দুজন মানুষও নাকি
একে-অপরের হৃদয়কে কখনও চেনে না
তবু তারা তৃষ্ণার গানই গেয়ে চলে দিনরাত দুঃখের সুরে


তবু দূর থেকে মনে হয় আশ্চর্য সহজ ওই জলের সন্তরণ
যেন স্পর্শমাত্র তৃষ্ণাকাতর শরীরে
ছড়িয়ে দেবে শীতল শান্তির ধারা


তুমি নিজেই হয়তো আজও জানো না
তুমি হৃদয় ও মেধার সেতু কিনা
কিন্তু দেখো পরিণাম জেনে আজও জলে নামে কোন গাধা


মেঘ জমে জমে আকাশ কালো, বড় রাত হলো
তুমি চাঁদ উঠবে কি ফের জ্বলে তৃষ্ণাভরা চোখের নিখিলে
জানি চিরকালের বলে কিছু হয় না, ভোর হবেই আবার

দুই.
প্রতিটি সন্ধ্যা আমাকে নিঃসঙ্গতার পথে
হাঁটতে বাধ্য করেছে
প্রতিটি ভোর আমার দরজা থেকে
নিঃসঙ্গতার তীব্র পথ খুলে দিয়েছে


তবু নিঃস্বের আশার মতো আমিও ভাবি
মুখের ওপর যেসব দরজা
রোজ বন্ধ হয়ে যায়
দিনের পর দিন করাঘাতে
তারাও খুলে যায় একদিন
মুখে হাসি নিয়ে
আধুলির ঝংকারে ভরে তুলে
ভিখেরির থালা!


বলো এর বেশি কে পায়!


চাঁদ নাই উঠতে পারে
কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি রাত বুনে চলে
তারার চাঁদর! যত অন্ধকার মনে হয়
তত সুন্দর! বলো কড়া নেড়ে নেড়ে
ভিখেরির কখনও কি ক্লান্ত হলে চলে!

তিন.
নখগুলো অলক্ষ্যে বেড়ে ওঠে।
সপ্তাহ না যেতেই মা এসব লক্ষ্য করেন।
নেইলকাটার বাড়িয়ে দেন। এখনও তুই শিখলি না।
আমি হাসি। আমি নখ কাটি।
এরই মধ্যে তা আমার হাত থেকে তিনি নিয়ে নেন।
নিজেই লেগে পড়েন কাটাকাটিতে।
শেষ হলে ফের নেইলকাটার নিয়ে চলে যান।
কিন্তু নখগুলো অলক্ষ্যে বেড়ে ওঠে।
বেড়ে ওঠে। বেড়ে ওঠে। কখনও থামে না।


তোমার মুখ না দেখলে
কেন এত পিপাসা পায় মানুষের!
স্নায়ুগুলো এলোমেলো হয়। এগুলো নাকি আমার
চালিকা শক্তি। কিন্তু এগুলো তাহলে কেন
অন্যের এমন কৃতদাস!
সূর্য ডুবে যদি। চাঁদ ওঠে।
এত সহজ সত্য নাকি এ পৃথিবীতে আর নেই।
তবু তা এত কঠিন। এত কঠিন।
অবাক লাগে।
নখগুলো ফেলে দিলে
তবু আমাকে কেমন ছিমছাম দেখায়।
কিন্তু গাছ তার শেকড়ে জল না পেলে
কেমন বেঁকেচুরে যায়, পাতা ঝরাতে থাকে!
তুমি জানো মেঘ! সত্যি কি জানো!
তাহলে ভেসে আসো, প্রিয় মানুষের হাত
জ্বরের কপালে যেমন অবলীলায় ভেসে আসে!


তোমার অনুপস্থিতিতে বুনো স্বভাব
নখগুলোর মতো বেড়ে ওঠে আর জানিয়ে যায়
আমার স্নায়ুগুলো ঠিক আমার নয়!
সঠিকভাবে আর পথ চলতে পারি না।


ধুলোমাখা পাতাগুলো বৃষ্টিতে ধুয়ে
কী চমৎকার চকচকে সবুজ হয়ে নেচে ওঠে
আমার তা দেখে খুব ঈর্ষা হয়!

জল

জল নিজের কাজটাই করে চলে, নৌকা ভাসে আর পাথর ডুবে যায়। তাহলে তুমি কিভাবে ঝাঁপ দিতে চাও!
তবু বলি শোনো, মনে হয় তুমি ছোট এক ছিদ্র। আমার এ দেয়ালে। খুব ছোট। তবু তাকে আমি জানালা বলেই ডাকি। কেননা কী বিশাল আকাশ দেখা যায়। তবে সেই আদিম ট্রাজেডির কথা কিন্তু ভুলো না। ওই জানালার যত কাছে যাব, তাতে চোখ রাখব, তত বড় আকাশ দেখতে পাব। আর দেয়ালের ওপাশে থাকা তোমার চোখে তত বেশি অদৃশ্য হয়ে যাব। এমনকি আমার চোখটাও ঠিক দেখতে পাবে না। আর দিনে দিনে তুমি নৌকা থেকে পাথর হবার দিকে এগিয়ে যাবে। তখনও জল নিজের কাজটিই করে যাবে। বুকে তার কারো ভেসে চলার কিংবা ডুবে মরার দাগও থাকবে না। বাতাস মাত্রই বুক তার ঝিলমিল।
বলো, জলের মধ্যে তুমি জল হবে কি? তাহলে নিজেকে হারানোর অনুভূতি হলেও হয়তো বা পাবে আরও বড় আপন জলের নিখিল। কিন্তু ওগো জলফোঁটা, তখন বলোতো তুমি কই! কিংবা তুমি ফ্রেমের বাইরে আনতে চেয়ে নিজের সেই প্রিয় ছবি ফের ফ্রেমবন্দি করে পেছনে ফেলে কত দূরে চলে গেছো! আমার স্পর্শ যেখানে তোমার জন্য আর কোনো অর্থই বহন করে না!
আর আমিতো সেই জল, বাতাস আছে তো কী ঝিলমিল, আর না থাকে তো কী শান্ত আর নীরব!

জানালা

সারা জীবন মানুষ একটা দরজা খুঁজে বেড়ায়। আর নাগাল পায় বড়জোর একটা জানালার। তা দিয়ে দেখে আর ভাবে সবটা আকাশ দেখা গেলো। ভুলে যায়, পৃথিবীর কোনো জানালা থেকেই সম্পূর্ণ আকাশ দেখা যায় না! প্রত্যেকে তার নিজের জানালা থেকে দেখা আকাশ নিয়ে অবিরাম অবিরাম কথা বলে কথা বলে! আর জানালাবন্দি মানুষরা এক জীবনে কতবারই না ভাবি, দরজা দিয়ে এবার ঠিক বেরিয়ে পড়েছি উন্মুক্ত আকাশের নিচে! আসলে তখনও আমরা দরজা নয়, জানালা দিয়েই করে থাকি মানস ভ্রমণ! যাকে তবু শারীরিক ভ্রমণ বলেই মনে হয়! আহ চিরকাল জানালাবন্দি থাকা মানুষ, দেখো পৃথিবীটা কী সুন্দর, কী তিক্ত, যাতে থাকো তুমি, তবু যার বুকে কোনোদিন তুমি আসলে বেরিয়ে পড়তে পারো না!
যার সঙ্গে দেখা হোক, হয় না আসলে। কেননা শব্দমাত্রই টের পাও, তোমার ভাবনার সঙ্গে কখনও মেলে না কারো! আর দুটি চোখ ভরে ওঠে চিরচেনা আর চিরঅচিন শিশিরে!

সেতু-সেতুহীনতা

বলা, দেখা ও শোনা হয়, কিন্তু স্পর্শ করা হয় না কতদিন! একে অপরের মুখের দিকে নিবিড় তাকিয়ে, বলা হলো, হাজার মাইল দূর থেকে, হাসতে হাসতে, যেনো পাশাপাশি দাঁড়ানো দুজন। তখন এখানে, ফুটপাতে, দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ। ওখানে, গভীর রাত, আর বিছানায় নীল আলো। কান বদলাতে গিয়ে চুড়ির রিনঝিন রিনঝিন ছড়িয়ে পড়লো দুপুর রোদের সমুদ্রে। আর তপ্ত রোদ দূরের ঘামের গন্ধ নিয়ে আছড়ে পড়লো ঘনিষ্ঠ বিছানায়।
স্পর্শ, শুধু এই শব্দটি মনে করিয়ে গেল, দুটি সময়, দুটি স্থান, আর এ মুহূর্তের অনতিক্রম্য দূরত্বের কথা। একজনের একবার মনে হলো, সমস্ত ইন্দ্রিয় পার না হলে, কীভাবে সম্ভব, নীরবতা! কিংবা, কথা সেতু গড়ে, দূরত্ব ঘোচায় না, এভাবে বলা যাবে কি? অন্যজনের মাঝেও কি এমন একটি প্রশ্ন এক পলক খেলে গেল না?