রাকিবুল হাসানের কবিতা ‘তোমরাই শাশ্বত বাংলাদেশ’
প্রকাশিত : এপ্রিল ১০, ২০২০
কোরবানির হাটে বিক্রির পশুর মতন
মাইলের পর মাইল পথ পায়ে হাঁটিয়ে
কিংবা গাদাগাদি করে ট্রাকে চাপিয়ে
তোমাদের নিয়ে আসা হলো,
আবার পৌঁছামাত্রই ফেরত পাঠানো হলো
যেভাবে এসেছিলে তার চেয়েও করুণভাবে—
বাকসোবন্দি কিংবা ড্রামের পেটে।
আর তোমাদের এই আসা-যাওয়ার
যে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট,
তাতে এই ঘটনা সত্যিই একটা বিস্ময় হতে পারত;
কিন্তু তোমরা জানো, এটাই স্বাভাবিক
আর তাই কী চমৎকার
শান্তিপূর্ণভাবে তোমরা ফিরে গেলে।
অবশ্য সর্বোচ্চ তোমরা যেটা করতে পারতে
অর্থাৎ যা তোমরা সাধারণত করে থাকো—
দু’একটা গাড়ি ভাঙচুর কিংবা সাময়িক পথরোধ,
যেটা করার এখন কোনো মানে নেই।
আর তাছাড়া
তোমাদের স্বাগত জানাতে
নিশ্চই প্রস্তুত ছিল
তোমাদের প্রভুদের জন্য নিবেদিত
রাষ্ট্রীয় লাঠিয়াল—
যাদের আবার আহ্লাদ করে ডাকা হয়
শিল্প চৌকিদার।
তবুও এই সামগ্রিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে
এমন ঘটনার পরও যে তোমরা
শান্তিপূর্ণভাবে ফিরে গেলে
এজন্য তোমাদেরকে এই বছর
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়ার জন্য
আমি খুব বিনীতভাবে অনুরোধ করছি,
যদিও সেই সুযোগ তোমরা পাবে না
কেননা ওই পুরস্কার তো কেবল
সাধারণভাবে যারা মানুষ হিসেবে স্বীকৃত
শুধু তাদেরই দেয়া হয়—
আর তোমাদের তো সেই স্বীকৃতিই নেই।
তাই হাটে বিক্রির পশুর মতোই
তোমাদের সাথে আচরণ করা যায়।
যদিও বাস্তবতা হলো,
তোমাদের অবস্থা তার চেয়েও পশুতর,
কেননা বিক্রির পশুগুলোকে অন্তত
রাখতে হয় পাহারায় কিংবা বেঁধে—
না-হলে সুযোগ পেলেই তারা দলছুট,
অথচ তোমরা কী অসাধারণ সুশৃঙ্খল—
কোনো পাহারা নেই, নেই কোনো তদারকি বা শৃঙ্খল,
নিজে নিজেই চলে এলে এতটা পথ
এত সব প্রতিবন্ধকতা ঠেলে।
তাই তোমাদেরকে দেখে আমার মনে পড়ে গেল
কলুষিত মানব ইতিহাসের এক নিকৃষ্ট অধ্যায়,
যখন কৃষ্ণ সন্তানেরা ছিল সাদা প্রভুদের দাস।
কিন্তু সেই তুলনাও ঠিক যথার্থ নয়—
কারণ সেই দাসেরাও অন্তত স্বপ্ন দেখত
একদিন মুক্ত হওয়ার,
কিন্তু তোমাদের কোনো স্বপ্ন নেই—
তোমাদের কাছে মুক্তি হলো মৃত্যুসম।
তাই আমরা যারা জেনেও না জানি
তোমাদের এই অত্যাশ্চর্য আগমন ও প্রস্থানের প্রেক্ষিত,
আমরা যারা যার যার নিরাপদ গুহা থেকে
রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা নিয়ে
প্রত্যক্ষ করছিলাম পুরো ঘটনা,
নির্লজ্জ ভাঁড়ারের সামনে দাঁড়িয়ে
আমাদের এই অশ্রুপাত
আসলে পাকের ঘর থেকে উঠে আসা বেহায়া ধোঁয়ায় সৃষ্টি,
তোমাদের জন্য নয়;
তোমাদের নিয়ে আমাদের যেটুকু উৎকণ্ঠা ছিল
তা কেবল নিজেদেরই জন্য।
এই অবরুদ্ধ আর অফুরন্ত সময়ে
টেলিভিশন আর মুঠোফোনের নানা আয়োজনের মাঝে
তোমাদের এই ঘটনাও আমাদের জন্য এক বিনোদন।
আমরা এমনই
প্রয়োজনে যেমন কঠোর হতে পারি,
(সেটা অবশ্য কেবল তোমাদেরই উপর)
তেমনি পারি হতে কোমল
(যখন আমাদের জিভ থাকে প্রভুদের পায়)।
তবুও আমি
আমাদের মতো সকল সুবিধাবাদীর পক্ষ থেকে
তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইছি,
ক্ষমা চাইছি আমাদের সকল অক্ষমতা
আর ধোঁকাপূর্ণ অসারতার জন্য।
জেনে রেখো, আমাদের মাঝেও আছে অনেকেই
তোমাদের মতোই প্রভুদের শিকার;
আমাদের সবার ভাঁড়ার ভরা নয়,
সবার নয় ব্যাংক হিসাব স্ফিতকায়।
আমাদের অনেকেরই অশ্রুপাত
কেবলই কপট সহানুভূতি নয়।
তবে মানুষ হিসেবে আমরা
তোমাদের চেয়ে অনেক নিচে,
যদিও প্রভুদের কাছে
তোমাদের স্বীকৃতি নেই মানুষের;
বস্তুত তোমরাই এদেশের আসল মানুষ,
তোমরাই শাশ্বত বাংলাদেশ।
আর যারা তোমাদের প্রভু সেজে বসে আছে,
তোমাদের রক্তঘামে যারা কেবলই খোঁজে মুনাফা,
করোনার চেয়েও ভয়ংকর সেইসব নিকৃষ্ট পরজীবীদের
তোমরা কোনোদিন কোরো না ক্ষমা।
সময় আসুক
একদিন এই ঘটনার তুলে নিও শোধ,
আর তোমরা কোনোদিন বদলে যেও না
বদলে দিও এই বিকারগ্রস্থ বাংলাদেশ।























