রাশেদ রহমান
রাশেদ রহমানের কবিতাগুচ্ছ
প্রকাশিত : এপ্রিল ১৫, ২০২০
রাশেদ রহমান মূলত কথাসাহিত্যিক। এ পরিচয়েই তিনি সাহিত্যের পাঠকের কাছে পরিচিত। কিন্তু কথাসাহিত্য চর্চার পাশাপাশি কখনো-সখনো তিনি কবিতাও লিখে থাকেন। তবে এসব কবিতা প্রচারে তার আগ্রহ নেই। ছাড়পত্রের অনুরোধে তিনি কয়েকটি কবিতা প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন। ১৯৬৭ সালের ৫ নভেম্বর টাঙ্গাইলের রসুলপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় সরকারি চাকুরে। প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে— শহীদ সতীশচন্দ্র দাস সড়ক, বিষলক্ষার ছুরি, ছিনতাইকারীর চোখ, আধেক মানুষ, পতিতামঙ্গল, গণিকাপ্রণাম, জাদুর আয়না প্রভৃতি।
ঈশ্বরের অন্ধ চোখ
বড় ঈশ্বরের চোখে পড়ে বড়ে বড়ে দর্জিবাড়ি
মেঝো ঈশ্বরের চোখ গেরস্তের প্রকাণ্ড খড়ের পালার ওপর
ছোট ছোট ঈশ্বরের চোখ চাল-ডালের বস্তার দিকে;
কী করে বস্তা নেয়া যাবে নিজের ঘরে—
আমরা অদৃশ্য; আমাদের কেউ দেখে না; প্রণোদনা পড়ে দূরে দূরে...
করোনার ভয়ে আমরা ভীত নই—
আমরা পুরুষানুক্রমে শুনে আসছি, হায়াত-মউতের ওপর কারো হাত নেই
কিন্তু যদ্দিন বেঁচে আছি বউ-বাচ্চার মুখে দিতে হবে দুটো ডালভাত
ঘরবন্দিকালে, বিশ্বাস করো মালিক; মিথ্যা বললে জিব খসে পড়বে
আমাদের হাতপাত একদম খালি— একটুকরো রুটি কেনার মতো কড়ি নেই ট্যাকে
করোনার দেখা মেলার আগেই হয়তো সপরিবারে মৃত্যু হবে অনাহারে...
আমরা রিকশাচালক; এখন রিকশাও ঘরবন্দি, জং পড়ছে রিকশার চাকায়
আমরা অটোচালক, মাইক্রোচালক, বাসচালক; আমরা চালকের সহকারী— আমাদের সকল রুট বন্ধ
আমরা দিনমজুর; রোজগার হলে খেতে পাই, নইলে বালবাচ্চা নিয়ে উপোস
আমরা কারখানার শ্রমিক; সব কারখানার গেটে ঝুলছে তালা
আমরা বাংলার হতদরিদ্র চাষি
আমরা বাজারের চা-দোকানি; দোকান বন্ধ, বাড়ির চুলাও জ্বলে না
আমরা হাটের ক্ষুদে বানিয়া
আমরা বটতলা মোড়ের পান-বিড়ি বিক্রেতা
আমরা ঝালমুড়ি বেচে খাই
আমরা ভবঘুরে
আমরা হিজড়া
আমরা বেশ্যা
আমরা বেশ্যার দালাল
আমরা পথের কুত্তা-বিলাই
বলো, দিনদুনিয়ার মালিক— পেটে পাথর বেঁধে ক`দিন আর চলে?
কোনও কোনও মেঝো ঈশ্বরের বচন শুনে অবাক হই মালিক;
যখন তারা বলে— দেশে কেউ না খেয়ে আছে
এটা অবিশ্বাস্য এবং স্রেফ গুজব...
আমরা শুনছি, আমাদের কানে খবর আসছে— ঈশ্বরের প্রণোদনা ছড়িয়ে পড়ছে চৌদিকে
আমরাও মৃত্যুর আগে তোমার প্রণোদনা হাতে পেতে চাই
আমরা বলতে চাই না— ঈশ্বরের এক চোখ অন্ধ, তাই
আমাদের চোখে দেখে না...!
১২.৪.২০২০
করোনা-কন্যা
জলের গেলাস হাতে
মা-বাবার মৃত্যুশয্যায় যাওয়া যাবে না
ছোট ভাইবোনের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মাথায় বোলানো যাবে না হাত
বউ কিংবা প্রেমিকার ঠোঁটে চুমু খাওয়া নিষিদ্ধ
মুছে দেয়া যাবে না সন্তানের চোখের নোনা জল
স্বজনের শেষকৃত্য হবে ধু-ধু মাঠে দু’চারজন অচেনা
লোকের তত্ত্বাবধানে—
চোখ মেলে চাও ঈশ্বর
দেখো, তোমার অবুঝ সন্তানের কী দুর্গতি...!
যখন পৃথিবীর মনুষ্যকুল তোমার ভয়ে কম্পমান;
ও মুকুটশোভিত করোনা-কন্যা—
তুমি এসো এই কবির দীর্ণ কুটিরে
তোমার ঠোঁটে এঁকে দেব গহীন চুম্বনের অমোচনীয় চিহ্ন
কবিতা লিখবো তোমার স্তন-তনু-চোখের তারার রূপ বর্ণনা করে...
জেনে রেখো সর্বনাশী
কবির করোটিতে সৃজিত হয় যত কবিতা
তত বাড়ে তার জীবনীশক্তি— তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিই
কবির মৃত্যু নেই, কবিতার মৃত্যু নেই; কবি ও কবিতা ছাইভষ্ম থেকেও জেগে উঠে আকাশে
উড়াল দেবে ফিনিক্স পাখির মতো...
৯.৪.২০২০
বেহুলা-লখিন্দর ও করোনা
চাঁদপুত্র লখিন্দরের বাসরশয্যা সৃজিত লোহার ঘরে
নিশ্ছিদ্র ঘর; কোথাও চুল পরিমাণ ফাঁকফোকর নেই যে
ঘরে ঢুকতে পারে কালনাগ;
বরের পাশে নির্ঘুম বেহুলা; ক্ষণকালের তন্দ্রার সুযোগে
ঘটে যদি কোনো অঘটন; চা্ঁদ সদাগর তাকে কেটে
টুকরো-টুকরো করে ভাসিয়ে দেবে কালিদহ সাগরে...
লখিন্দরের গলা জড়িয়ে শুয়ে ছিল বেহুলা
রাত পোহাতে আর কত দেরি! মোরগ বাগ দিলেই
কেটে যাবে স্বামী হারানোর ভয়—
‘মা মনসা, তোমার পায়ে পড়ি, সদাগর না-দিক
আমি তোমাকে পূজা দেব; আমার সিঁথির সিঁদুর
তুমি কেড়ে নিও না—’
বেহুলার কাতর মিনতিতে মনসার ক্রোধ কমেনি তিলমাত্র
ঘুম ভাঙল না লখিন্দরের; কালনাগ কখন এসেছিল
বেহুলা কিছুই জানে না...
আমি ঘরবন্দি, একা, একাকী; পাশে নেই বেহুলা
ঘরে তড়জার ভাঙা বেড়া, ভাঙা খড়খড়ি; দরজার
তক্তায় অজস্র খোড়ল...
টিনের চাল খেয়ে ফেলেছে উইপোকা আর দাঁতাল ইঁদুরে
ভয়ে আমার দিন কাটে না; রাত কাটে না
কখন আমার ভাঙা ঘরে ঢুকে পড়ে মনসা-কন্যা
মুকুটশোভিত করোনা...!
১০.৪.২০২০
অদৃশ্য শত্রুর মুখোমুখি
আমরা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দেখেছি; ত্রিকালব্যেপে যুদ্ধ
অর্জুনের হাতে বিষমাখা তীর, ভীমের হাতে ভারি গদা
কৃষ্ণস্বয়ং অর্জুনের সারথী;
দ্রোণাচার্যের অব্যর্থ যুদ্ধকৌশল, ত্রিশূল হাতে কর্ণের সে কী তেজ!
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রকাশ্য যুদ্ধ, কুরুক্ষেত্রে রক্তের বন্যা
পঞ্চপাণ্ডব চেনে কে শত্রু, দুর্যোধন-দুঃশাসনের সম্মুখেও পরিচিত শত্রু
দু’পক্ষই জানে কার গর্দান ভূপাতিত করতে হবে আগে…
আমরা ফোরাত-তীরে কারবালার যুদ্ধ দেখিছি; ধর্ম ও জলের যুদ্ধ
এজিদের অযুত-নিযুত পদাতিক সৈন্য ঘিরে রেখেছে নদীতীর
এক আঁজলা জল যেন কোনোভাবেই নিতে না পারে হোসেনের অনুরাগীরা
অলিদ-সীমার-ওমর প্রমুখ সৈন্যাধ্যক্ষ অশ্বপৃষ্ঠে ঘুরে ঘুরে
প্রণোদনা দিচ্ছে এজিদ-সৈনিকদের
কোষবদ্ধ তরবারি তাদের বালি-স্ফটিকের মতো ঝলমল করছে রৌদ্রালকে—
এইসব সেনারা শহীদ-হাসানপুত্র কাশেমের অতিচেনা; পরিচিত
কাশেমের তরবারি উন্মত্ত এজিদ-সেনাদের লোহিতরক্তসুধাপানের নেশায়
এইসব সেনাদের বধ করতে হোসেনের কিশোরপুত্র আকবর কৃপাণ হাতে নেমেছে যুদ্ধে
সারাদিন যুদ্ধ; গোধূলিবেলায় ফোরাতের রক্ত আর জল একাকার...
আমরা চার্চিল ও হিটলারের যুদ্ধ দেখেছি; দু’পক্ষই কামান-বোমা-সমেত সামনাসামনি
আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধও দেখেছি; কে শত্রু কে মিত্র দৃশ্যমান—
শত্রুর গোপন অস্তিত্ব নিরূপণ করা গেলে যুদ্ধকৌশল প্রণয়ন করা সহজ
শত্রুর অবস্থিতি ও শক্তি জানা থাকলে দেশপ্রেমিক যোদ্ধার টার্গেট কখনই ব্যর্থ হয় না
কিন্তু আমরা এখন অদৃশ্য শত্রুর মুখোমুখি; রণক্ষেত্রে বড়ই অসহায়, কাঙাল...
৮.৪.২০২০
এখন দুঃখ করে কোন লাভ নেই
এখন দুঃখ করে কোনো লাভ নেই এখন সন্ত্রস্ত হয়েও কোনো লাভ নেই
এখন এই কষ্টযন্ত্রণা তোমাকেই বহন করতে হবে ওজন যত ভারিই হোক না কেন;
কুঠার মেরেছ তুমি নিজের পায়ে নিজেই...
তুমি বনবাদাড় খেয়েছ তোমার খুধা মেটেনি
তুমি বনের সব বাসিন্দা খেয়েছ তোমার খুধা মেটেনি
তুমি নদনদী খালবিল খেয়েছ; খাওয়ার বাদ রাখোনি ঝর্ণা-সাগর
তবুও তৃষ্ণা মেটেনি তোমার; এখন দেখো, খেতে পারছ না কিছুই;
খাদ্য দেখলেই বমি আসে...
বারোজাত নইলে গাঁ বসে না; বসতি টেকে না তোমার সুখ-সম্ভোগের জন্য কাউকে খুন করেছ;
কাউকে করেছ বাস্তুচ্যুত
এখন তুমি একা, নিঃসঙ্গ; অসহ্য দরদালানের সুখ তোমার দিন কাটে না, রাত কাটে না
এখন আর দুঃখ করে কোনো লাভ নেই...!
৬.৪.২০২০























