রুখসানা আকতারের কবিতা ‘কে আমি’
প্রকাশিত : নভেম্বর ০২, ২০১৮
তুমি কে? কে তুমি?
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যেতেই মনে এই প্রশ্নটি
ভেতর থেকে আমাকে কেউ বারবার ছুঁড়ে দিচ্ছিল।
আমি কিছুটা দিশেহারা হয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, আসলেই তো কে আমি?
মেয়ে? বোন? পত্নী? মা?
কিন্তু এগুলোতো আমার সম্পর্কের
এক একটা বাঁধন।
আমার আমি তো না!
সঠিক উত্তর খুঁজে না পেয়ে এখানে সেখানে, হেঁসেল, বাড়ির দাওয়ায়, উঠানে, শোবার ঘরে
সব জায়গায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়িয়ে ছিলাম।
না শোবার ঘরের ওই বিছানাতে, না আমার নিত্য দিনের সঙ্গী ওই উনুনের পাড়ে,
না উঠানে মেলে দেয়া শুকনো কাপড়গুলোতে,
না কোথাও উত্তর খুঁজে পাইনি।
সব জায়গাতেই ছিল কারো অসুর আধিপত্য।
যে অসুরকে রাম বানানোর বৃথা চেষ্টা করিনি কখনো, কারণ আমি দেবতা চাইনি
চেয়েছিলাম জীবনযাত্রায় একজন সহযাত্রী।
তাই হাতখানি ধরে শুনিয়েছিলাম মানবতার দোহাই
বদলে শানিত ছুরির আঘাতে আমার হৃদয়ের প্রতিটি
প্রকোষ্ঠ আরো রক্তাক্ত, ক্ষত বিক্ষত হয়েছিল।
সমাজ, পরিজন সবার কাছে উত্তর চাইতে গিয়ে পেয়েছি বাণী,
ভয়, রোজহাশরে পুলসিরাতের হিসাব, হাবিয়া দোজখ, সত্তুর জন হুরপরি রানী।
পেয়েছি তিরস্কার। পেয়েছি বচন, তুমি বোকা! তুমি দুর্বল!
নারী তুমি সক্ষম সন্তান জন্মদানে, অক্ষম প্রতিপালনে।
বাপছাড়া সন্তান হবে অধুরা, বিপথগামী আর এর দায় নিতে হবে তোমারই।
শোনানো হয়েছে তালাকপ্রাপ্ত রমণীর দুঃখ দুর্দশার কাহিনি
কপালে জুটেছে ধর্যহীনার তকমা।
যা আমার জন্য ইহজনমে কোনও মুক্তির পথ দেখায়নিৎ
বরং আরো বেশি করে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে
দেয়ার চেষ্টা ছিল।
অবশেষে আমার ভিতরের আমিত্বকে
টেনে হিঁচড়ে বের করে উত্তর চেয়েছি।
সে আমার পরম বন্ধুর মতো মমতায় মাথায়
হাতখানি বুলিয়ে বলে,
তুমি মানুষ, তোমার অনেক শক্তি, তুমি তোমাকে তৈরি করো
সব বাঁধা উড়িয়ে আগে বাড়ো এবং
নিজে বিশ্বাস করো যে,
মানুষই সব পারে, তুমি ও পারবে।
সেই থেকে আমার আমি নারী থেকে মানুষ হয়ে গেলাম।
জীবনের পথে সকল বাধা একে একে ডিঙিয়ে
মাথা উঁচু করে এগিয়ে গেলাম।
জীবন যেন এখন কলকল স্রোতে বয়ে যাওয়া
স্বচ্ছ পাহাড়ি ঝর্ণা, যেন টুপটাপ ঝরে পড়া ভোরের শিউলি। জীবন সুন্দর।
কবির ডাকনাম ঝর্না। লন্ডন নিবাসী একজন সমাজকর্মী ও সিঙ্গেল প্যারেন্ট। ঝর্না দুই হাতে জীবনের প্রত্যেকটি ধাপে লড়েছে, একুশোর্ধ চাকরিজিবী মেয়ে লুম্বিনি ও টিনএজ ছেলে নির্বাণের পথচলতি রথে যোগ করেছে যাপিত উল্লাসের অনুপ্রেরণা। বাঙালি নারী যেভাবে বিশ্বায়িত নারী হয়ে ওঠে তার মহাকাব্যগাথা লিখতে গেলে, আমার এই বন্ধুটির কথা প্রথমে বলতে হয়। আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় আমরা যখন জান্তাবিরোধি আন্দোলনে সক্রিয়, ঝর্না তখন আমাদের সহযাত্রী। সিলেটের মেয়ে ঝর্না আমাদের আদিবাস ও নাগরিকতাকে ধারণ করেছে হৃতস্পন্দনের সহজাত আন্তরিকতায়। ওর স্ট্যাটাসগুলো, বেদনায়, আনন্দে ও আশায় ওর অভিজ্ঞতা জারিত, যেখানে অনুষংগ ও অনুভবে কোনো সঙ্ঘাত বাধে না, এতটাই তা ভান ও ভনিতাহীন। আমার সন্তান মাতিস-জ্যোতি ঝর্নার সন্তান নির্বাণকে ছেলেবেলা থেকে এ-অব্দি বন্ধু হিশেবে পাওয়াটা আমার জন্য বড় ধরনের আনন্দঘন ও চিত্তাকর্ষক ঘটনা। মাতিস-জ্যোতি, নির্বাণের ছেলেবেলার ও টিন এজের পাশাপাশি ছবিগুলো বলে দেয়, ওরা কত সহজে ক্লিক করে। নির্বাণ এ-গুণটি পেয়েছে ওর মা থেকে। লুম্বিনি হচ্ছে লক্ষ্মি ও স্বরস্বতির মিশেল। —চয়ন খায়রুল হাবিব























