শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৫ কবিতা
প্রকাশিত : মার্চ ৩০, ২০২০
কথাসাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের আজ জন্মদিন। ১৮৯৯ সালের ৩০ মার্চ ভারতের উত্তরপ্রদেশের জৌনপুর শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আদিনিবাস উত্তর কোলকাতার বরানগর কুঠিঘাটে। ছাড়পত্রের পক্ষ থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে তার রচিত পাঁচটি কবিতা পুনর্মুদ্রণ করা হলো:
আমার মন-চুয়ানো মধু
আমার মন-চুয়ানো মধু
ঝরবে যখন বাতাসে ক্ষরবে যখন
আসবে না কি বঁধু?
গন্ধে যখন ভরবে চরাচর
আসবে না কি মধু মাতাল
পাগল মধুকর?
ওগো তার তরে যে আমি
পথটি চেয়ে কাটাই দিবাযামী,
আমার বুকের বরমালা
সুখের মধু-ঢালা
পরিয়ে দেব তার গলাতে
আসবে যখন বরমালার বর
মধু-পাগল মধুকর!
আমার মনে যে ফুল ফুটেছিল
আমার মনে যে ফুল ফুটেছিল
আকাশের সূর্য তারে শুকিয়ে দিলরে।
ধুলাতে পড়ল ঝরে সে
বাতাসের নিদয় পরশে
বুকে মোর কাঁটার বেদনা
বুক দুখিয়ে দিলরে।
আমার মনে চাঁদ
আমার মনে চাঁদ যে উঠেছিল
ও তারে প্রলয় মেঘে লুকিয়ে দিলরে।
মরমের মৌন অতলে
নিরাশার ঢেউ যে উথলে
জীবনের পাওনা-দেনা মোর
কে চুকিয়ে দিলরে।
জনম অবধি কার তোমা ’পরে অধিকার
জনম অবধি কার তোমা ’পরে অধিকার
প্রিয় বলে ডাকিবার দিয়েছেন বিধি,
জানি না গো আমি তাহা তবু ভাবি যদি আহা
পাইতাম তোমা হেন অলকার নিধি।
তোমার বিহনে শুধু প্রাণ মোর করে ধু ধু
যেন গো সিকতাময় নিদারুণ মরু,
সুনিবিড় ছায়াদানে জুড়াও কাতর প্রাণে
তুমি এ সাহারা মাঝে সুশীতল তরু।
প্রাণের গোপন কথা প্রকাশিছে ব্যাকুলতা
বাহির হইতে মায়া মোহ পরিহরি,
লেখনী সে বাধ-বাধ কথা কহে আধ-আধ
দুয়ারে দাঁড়ায়ে আছে সরম প্রহরী।
ভাঙ্গি সরমের বাঁধ মনের আকুল সাধ
গিরিজা তটিনী সম ধায় তব পানে,
তুমি মম হে সাগর, তুমি মম হে নাগর
হতাশা দিও না ঢেলে প্রোষিত পরাণে।
করিবারে দাসীপনা ভেবেছিনু বাসিব না
বিপুল এ ধরা মাঝে কাহারেও ভাল,
আঁধারে একটি দীপ আকাশে চাঁদের টীপ
সম তুমি এ হৃদয় করিয়াছ আলো।
তাই আজ যেচে এসে পড়েছি চরণ দেশে
জেনো মোরে এ জগতে বড় অভাগিনী,
নয়নে কিসের জ্বালা হদয়ে বিষের জ্বালা
কানে বাজে সকরুণ হতাশ রাগিনী।
প্রভাত আলোক মিশে বায়ু ধায় দিশে দিশে
কত কুসুমিকা তারে দিয়ে ফেলে প্রাণ,
পবন তো জানে না তা ফুল বোঝে নিজ ব্যথা
জানে সেই বুকে যার বিঁধে আছে বাণ!
তাই এই বাচালতা চপল চটুল কথা
আনমনে কতশত বাতুল প্রলাপ,
এই বলে ক্ষমা কর একটি কঠিন শর
ত্যজিয়াছে মোরে চাহি মদনের চাপ।
ডাকব নাকি পুলিশ
পড়ার ঘরে পড়তে বসি যখন,
বাবা ডেকে বলেন, `ওরে খোকন,
মন দিয়ে খুব করিস্ লেখাপড়া
একজামিনে নইলে খাবি বড়া।`
কিন্তু আমি পড়ি কেমন করে?
বাবা জানেন না ত, পড়ার ঘরে
জুটেছে সব দুষ্টু পাজি যত
পড়তে কি দ্যায় একটু মনের মত?
বলেন বাবা, `কেবল পড়া ভুলিস্!
ডাকব নাকি পুলিশ?
টিকটিকি, তুই আমার দেয়ালে
ঘুরে বেড়াস্ মনের খেয়ালে।
কার হুকুমে করিস্ পোকা সাবাড়?
পোকা ছাড়া নেই কি রে আর খাবার?
আয় না নেমে উঁচু দেয়াল ছেড়ে,
ল্যাজটি কেটে বানিয়ে দেব বেঁড়ে!
কইলে কথা, বল্ ত ওরে নবাব,
একটি বারও দিস্ না কেন জবাব?
পোকা-মাকড় খেয়ে কেবল ফুলিস্
ডাকব নাকি পুলিশ?
ছারপোকা, তুই আমার চেয়ারে
লুকিয়ে বসে থাকিস যে, আরে!
ভাবিস বুঝি চেয়ারখানা তোর?
বেরিয়ে কেন আসিস্ না রে, চোর।
কুটুস কুটুস কামড় দিয়ে জ্বালাস্
ফুড়ৎ করে ফুটোর মধ্যে পালাস!
একরত্তি চেহারা তোর, তাই
ধরতে গিয়ে ফস্কে খালি যাই।
পড়ার সময় পাগল করে তুলিস,
ডাকব নাকি পুলিশ?
আরশোলা, তুই ফরফরিয়ে উড়িস,
দেমাক-ভরে মাথার উপর ঘুরিস্!
নিজেকে তুই মনে ভাবিস্ নাকি
উড়োজাহাজ কিম্বা ঈগল পাখি?
পড়িস যদি চীনেম্যানের হাতে,
কচমচিয়ে চিবিয়ে খাবে দাঁতে।
আমি নেহাৎ ভালমানুষ ছেলে!
আমার ঘরেই উড়িস্ পাখা মেলে
সড়সড়িয়ে পিঠের পরে বুলিস্
ডাকব নাকি পুলিশ?
মাকড়সা, তুই ঘরের কোণাতে
ব্যস্ত আছিস্ যে-জাল বোনাতে,
সে-জাল নিয়ে করবি কি`রে বোকা?
ডাঙ্গায় বসে ধরিস্ খালি পোকা।
জেলে ধরে কাৎলা ইলিশ রুই
মাছ না ধরে মাছি ধরিস তুই!
ছাত থেকে তুই শূন্যে নেমে ঝুলিস্,
দোলনা চেপে মনের সুখে দুলিস্,
দুলে দুলে বোধ হয় খালি ঢুলিস্
ডাকব নাকি পুলিশ?
ওরে মাতাল দুয়ার খুলে দিয়ে
ওরে মাতাল দুয়ার খুলে দিয়ে
পথেই যদি করিস মাতামাতি
থলি ঝুলি উজাড় করে দিয়ে
যা আছে তোর ফুরাস রাতারাতি।
অশ্লেষাতে যাত্রা করে শুরু
পাঁজি পুঁথি করিস পরিহাস
অকারণে অকাজ নিয়ে ঘাড়ে
অসময়ে অপথ দিয়ে যাস
হালের দড়ি আপন হাতে কেটে
পালের পরে লাগাস ঝড়ো হাওয়া
আমিও ভাই তোদের ব্রত লব
মাতাল হয়ে পাতাল পানে ধাওয়া।























