শামসেত তাবরেজীর একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত : আগস্ট ২৩, ২০১৮

চিঠিলুপ্তকাল: গুগলম্ অধ্যায়

চিঠি পৌঁছাতে পৌঁছাতে মেইল খুলে গেল- ইয়াহু!
রজঃরজনীর তাপ চাপ বিলাপ সব লুট হল বুলিয়ান চালে,
সকল আছে-র নাই-আকার খ-গহীনে ধরে থাকে বাহু,
কথা দিচ্ছি, ছুটি পেলে এইবার চুম্বন রেখে আসব পর্বত ঢালে।

সোপানমার্গে কি কি আছে জানিও প্রত্যুত্তরে মেইলে আমাকে,
বিন্দু-কন্দরে আরও আরও ব্রহ্মের বিকাশ হবে- নির্ভয়ে থাকো।
কতবার হারিয়েছি তোকে ভেবে-ভেবে বিভুরঞ্জনাকে,
তখনও পদ্মার ওপরটা শূন্য- দাঁড়ায় নাই ভিখ-মাঙ্গা সাঁকো।

শেষ চিঠি লিখেছিনু মেটাডর বলপয়েন্টের পিচ্ছিল আখরে,
হয়ত তা কোনদিন পৌঁছাবে না আর- খোলো গুগলম্ মেইল, আঁখি তব,
নিজদেশে পরবাসী- পরবাসে তথাবস্তুর মুকুর-মুকুল ঝরে
ঝরুক বিবর্তকাল- নাই হয়ে থাকব আমরা- একসঙ্গেই।

কাছিম

আজ নিশিরাত বিদেশি বিদেশি লাগে।

ছাউনি উদাম পলেনেশিয়ান রাত
পাথরে চাটছে চাঁদের গ্যাঁজলা কাছিম কালান্দর,
বিতাড়িত বেচারা,
কেউ নাই তার,
দ্যাখে নাই কোন নারী কিম্বা নর,
মানুষ যাদের নাম হল ইতিহাসে।

তবু তার ছিল মায়ার জগৎ- সূর্যরশ্মিপাত
অভ্যূদয়ের গোপন আর্তি অনাদি অবিশ্বাসে,
জলঘোটকেরা তাকিয়ে দ্যাখে এই ধীর-গম্ভীর
অস্তির কাছাকাছি পৌঁছিয়ে তবু- খোলস্থ অশরীর।

পুরা দেহটাই পিস্টনে বাঁধা- অবাক্ পিটপিটানো
তাকিয়ে রয়েছে ঈশ্বরাকাশে- আলো এসেছিল কবে!
এই প্রশ্নের জবাব যে দেবে, তার
নবুয়ত হয় নাই- একাকী বিষাদগ্রস্ত- সেই নিষ্ঠুর দানো
খেলাটা মাত্র শুরু করেছে- এখনো আসে নি রবে,
অধ্বনীন বাস্তবে
কে বুঝেছে কার ইশারা বাসনার!

শুধু তবে তিষ্ঠানো?

সুকঠিন পিঠে আদি অ্যালগির জালিকার প্রতিভাস
তারও পেছনের নিভাষ কণাদ এই ভাঙে এই গড়ে,
নিঃসঙ্গ প্রভূ কাঁদছেন, জন্মায় নাই দাস
পাঁজর ভাঙা সেই দ্বন্দ্বের এখনো হয় নি শুরু।
সূর্যকুণ্ড কটাক্ষ করে উপরে তুলেছে ভুরু,
নারী স্বত্বার জাগে নাই বিভ্রম,
কারো ফিরবার তাগিদ নাই’কো ঘরে
নৈর্ব্যক্তিক নামপদী উদ্যম
জাগে নাই জিবতলে,
একটা কাছিম কল্লা সেঁধিয়ে তাই নেমে গেল পুনরায়
পলেনেশিয়ান জলে,
যার ছায়া নিয়ে আজও উল্কা উল্টা আকাশে ধায়।

ভ্রাান্তি, আমার ক্ষমা করো

ভ্রান্তি আমার ক্ষমা করো বিপ্লবী,
কেন হুদা উথলিলে?
তত্ত্বহীন কি ভরবে বৃক্ষে গোবি,
হাঙর কি আর জন্মায় ধোপা-বিলে?

যেমন তেমন বিবাহ কি দিলে হবে
শান্তি মেয়েটার?
যা নাই তা যদি দেখে ফেল বাস্তবে
বাড়বে বেদনা ভার।

বি-যোগে আমার ভ্রান্তি কিছুটা আছে,
ঘাঁই দিয়ে উঠলেই
তাই কি চড়ব কালকানাদের গাছে
নিরাশার লক্ষ্যেই!

আগে আইসো, নিরিখ বানতে শিখি
বইতো পৃষ্ঠা চুয়ান্ন হাজারের
চেয়ে বেশি তা দিনেশ বাবুতে দেখি,
অ-ভাব নইলে ঢের

রয়ে যাবে, ওহে প্রাণসখি একই মতো
রক্তের- এসো ভাষা
মিলাই দুইয়ের একই ইতিহাসী ক্ষত
দীক্ষিত করি আশা।

ভেবে দ্যাখো আমরা জাতিবাদী নই
গোতমী মুসলমান,
পর্বত থেকে সমুদ্র-তক ছুঁই
তারপর নির্বাণ!

কথা কারিগরদের জন্যে

শুধু জিব নাড়া, কথা বেটে কথা- টক-শো রাত্রে
মানুষ ঘুমিয়ে তারপরও জাগে, পরভাষা সাঁতরে সাঁতরে
তীরে পোঁছায়, চোরা-তীর সহসা বিলীন মেঘনা আর যমুনা গর্ভে
বিগত বিশ্রী ঢেঁকুর উঠায়ে। তারপর? তারপরও জেনো কথাই ঝরবে!
হায় কথা, কথা-বাদশাদের হাজাম নেয় না কেন ‘কথাডগা’ কেটে বংশীদণ্ডে
দু’আঙুলে চেপে ত্রিপদী থেকে দ্বিপদী ছন্দে
স্বর্ণ-লুকানো মিঠাহাসিময় সোনাবাহিনীর! গ্রন্থগূহ্যে
আঁতিপাতি পাগলের মত তালা-চাবি না চাবিগুচ্ছে
সেই একই স্বার্থপরতা- পুরানা চুয়ানি- ছকে ফেলে করছে তালাস
ততদিনে বাংলাদেশ দোকানে দোকানে ডিসকাউন্টসহ কচি লাশ!

লাশ-চাষের গল্প

এ আমি তোমাকে কি বললাম,
তোমাকে এ আমি, পাগলা বাস?
পিষে ফ্যালো যত তরুণ নাম,
ফুরিয়ে যাচ্ছে শ্রাবণ মাস!

মন্ত্রি উতলা, জাগে ফ্যালাস
পারিষদ যেন কদমফুল,
আয়, কর্দমে সর্বনাশ
করে চেটে খাই দশ আঙুল।

আমিও রূষ্ট এই রাষ্ট্রে-
চাই, কচি-কচি হাজার লাশ,
চড়ব ভূতের মতন উষ্ট্রে
বাচ্চা বানাব চুমিয়ে হাঁস।

যা বলবার বলেছি ঠিক
হাস্যে-লাস্যে সর্বনাশ,
দে বাস উঠিয়ে- চতুর্দিক
গণতন্ত্রের চলুক চাষ!

কালান্তরের জ্বর

প্রচ্ছায়ায় বারান্দায় কাপড় কার শুকায়?
ভিতরে যে দেহ ছিল কার চাহিদা চুকায়!

প্রত্ন-গিরির উর্ধ্ব সিঁড়ি উঠল বেয়ে কি?
অপেক্ষমান যেখানটাতে অন্ধ ইয়েতি?

কালান্তরের কামিন নগ্না ভাঙল দরজা
দ্যাখে, সেথায় মৃত্যু এসে নিয়েছে শয্যা।

এইটুকু দেখার পর স্বপ্ন গেল ছিঁড়ে,
ইলেকট্রিকের তারে বিকাল চুমাচ্ছে পড়শিরে।

বিপুল উরু হারিয়ে কাঁপে ঢলঢলে পাজামা,
আড়ং-ভরং শেমিজটা বদ গন্ধে ঘামা।

কোনমতে উঠে বসি আঁধারি ছাদ-ঘরে,
গা-খানি পুড়ে যাচ্ছে কলঙ্কের জ্বরে!

তদ্ভাব

আমি তোমাকে ভালবাসি- এ ছাড়া অন্য কোন বাসাই বাসি না।
চান্স পেলে গোরু খাই, মদসঙ্গ বিহার করি দুলন্ত টেবিলে,
খালা না মাসী না ছাল-বাকলা তুলে ফেলা পুরানা দাসী না,
নিরঞ্জন রহি, যাতনা সহিতে সিনান সম্পন্ন করি বোয়ালির বিলে।

তারপরও গোচর কর না আমাতে তোমার তদ্ভাব কেমনে গজায়।
ঝাড়ু দিতে দিতে উঠান নিজেই কুঁজা- আ মরি, আবার জামপাতা
ঝরে পড়ল দাওয়ার সামনে, পাপিয়া পুরীষ ঝেড়ে নাচলেন মজায়
পাত্তা দিই না এইসবে, সা’পাড়ায় বিরস বদনে সারাদিন বসে থাকি বুঞ্জিয়ে ছাতা।