শামীম কবীর

শামীম কবীর

শামীম কবীরের কবিতা: অশান্ত কবির অবয়ব

স্মরণ

প্রকাশিত : এপ্রিল ১৯, ২০২০

১৯৯০ সালের এপ্রিল মাস। লিটল ম্যাগাজিন, ফ্রানৎস কাফকা, সুবিমল মিশ্র, ঢাকার শিল্প-সাহিত্য— এসব কিছুর সাথে বন্ধুত্বের একপর্যায়ে কবি শামীম কবীরের সাথে পরিচয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শামীমের সংবেদনশীল চরিত্র আর তীক্ষ্ম মেধার পরিচয় পেলাম। ধনেশ পাখির মতো গম্ভীর অথচ ভেতরে ভেতরে অশান্ত কবির অবয়ব। সেঁকোবিষ আর পোড়া মদ দিয়ে তৈরি যার তারুণ্য; করতোয়ার স্রোতহীন জলের সাথে অন্তর্গত বাক্যালাপের পর নিরন্তর সে গেঁথে চলেছিল একটার পর একটা কবিতার ব্রীজ। একমুখী সে ব্রীজে ভরশূন্য পরিভ্রমণ। নিজস্বতায় ঋদ্ধ নাগরিক ব্যক্তির— নৈঃসঙ্গ, যন্ত্রণা, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি আর বিচ্ছিন্নতাবোধের চর্মহীন কঙ্কাল যেন শামীমের কবিতা। তবে লোকজ ও স্থানিক উপাদান তার কবিতায় অনুষঙ্গ হিসেবে বহুল ব্যবহৃত। তিরিশের কবিদের ধারাবাহিকতায় বাংলা কবিতায় আধুনিক নিঃসঙ্গ মানুষের যে নৈর্ব্যক্তিক উপস্থিতি, শামীম কবিতায় তারই ব্যবচ্ছেদ করেছেন মর্গের দমবদ্ধ ঘরে। সাড়ে চব্বিশ বছরের স্বল্পায়ু জীবনের প্রায় অনেকটা সময়জুড়ে কাটিয়েছেন কবিতার অনুষঙ্গে।

বিনিদ্র লাল কালো অনেকগুলো চোখ ফুটে চেয়ে আছে নলাকার কাঠ থেকে এই ছিল তার দেখবার যন্ত্র। জীবনের ভেতরে থেকে দর্শক হয়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ শেষে অরো একটি চাঁদের দেখা পেয়েছিলেন শামীম। আর সে অভিযাত্রায় চান্দ্র ড্রাগনের শ্বাসে ঘাড় পুড়ে শক্ত হয়ে গেল। অতর্কিত একটি পিছল কাঁখ তাকে বহন করে নিয়ে যায় যুদ্ধের বাইরে— যে গর্তে তলা নেই তার। জ্ঞানী কবরের স্কন্ধে চরে তাকে বলতে দেখা যায়, ‘কাঁদে বালিহাঁস/কাঁদে উঁচু চিল/কাঁদে মধ্যবর্তিনীরা আর সবুজ ফাঙ্গাস/আমি জানি না আমি কী খুঁজি/আমি ক্যানো যে কাঁদি না।’ কখনও আবার তাকে লিখতে দেখি, ‘তোমার বিপুল গড়নের মধ্যে কোনোখানে এক টুকরো জটিল উল্লাস আছে তার স্পর্শে বদলে যায় প্রভাতের ঘ্রাণ’ এরকম সব আপ্তবাক্য। ঢাকায় আশির দশকে শুরু হওয়া লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের কবিতায় শামীম বৈশিষ্ট্যসূচকভাবে লিখে গেছেন। ঔপনিবেশিক প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আগ্রাসী, শোষণধর্মী কাঠামোর প্রতি শামীমের নঞর্থকতা শুধুমাত্র লেখার মধ্যে প্রকাশিত হয়নি; তার জীবন দর্শন ও আচরণেও তা প্রকাশ পেত।

শামীমের ভেতরে বোহেমিয়ান সত্তার উপস্থিতি ছিল প্রবল। প্রচলিত ধর্ম, মূল্যবোধ, লৈঙ্গিক ও শ্রেণিগত রাজনীতি ইত্যাদির অসারতা, নির্মমতা, প্রাণহীন অস্তিত্ব তাকে বাধ্য করেছিল সকল ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বের বাইরে থাকতে; যা হয়তো একজন সংবেদনশীল কবির সহজাত স্বভাব। নব্বই থেকে চুরানব্বইয়ে ঢাকার সমসাময়িক তরুণ কবিদের সাথে লেখালেখি, তরল-কঠিন-বায়বীয় নানা ধরণের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পরিভ্রমণ কবিকে নিঃসঙ্গ করে তুলেছিল। তার স্বেচ্ছা জীবন-প্রক্রিয়া, মনস্তত্ত্ব, কবিতার ধরণ অনেকটাই বোধগম্যতার বাইরে ছিল অনেকের কাছে, এমনকী সাহিত্য পরিমণ্ডলেও, যা এখনও অনেকটা রয়ে গেছে। তার কবিতার আলোচনা মূলধারার সাহিত্যে খুব কমই দেখা যায়। কবিতায় পুরাতন, অন্তঃসারশূন্য চিন্তাকে আঘাত করে নতুন চিন্তা ও শব্দের ব্যবহার শামীমকে করে তুলেছিল স্বতন্ত্র, নিজস্ব স্টাইলে দক্ষ যা সমসাময়িক কালোত্তীর্ণ। কবিতায় তার প্রকাশভঙ্গি ছিল ব্যক্তিগত যে জন্য তার পাঠকও মুষ্টিমেয় এবং বলা যায়, পরবর্তী সময়ের ও নতুন ভাবনার পাঠকের জন্যই তৈরি হয়েছিল তার কবিতা।

এরকম সব বাক্য লেখার পর শামীম তৈরি করেছেন ‘ম্যান সাইজ আরশি কিংবা আত্মহত্যা বিষয়ে গল্প’র মতো কবিতা। দ্রষ্টব্য থেকে প্রকাশিত ‘শামীম কবীর সমগ্র’তে কবির অধিকাংশ কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে শামীমের স্বেচ্ছামৃত্যুর দু`বছর পর। এই প্রকাশনার দীর্ঘ বিরতির পর অ্যাডর্ন পাবলিকেশন ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করে নির্বাচিত কবিতা: শামীম কবীর। একজন দ্রষ্টা কবি সময়ের অতীতে, বর্তমানে, ভবিষ্যৎ ভ্রমণ করেন আর মর্গের বাইরে থেকে শুনতে পান হাতুরি-ছেনির বিচরণ। —নভেরা হোসেন

উনপঞ্চাশতম জন্মদিনে তাকে স্মরণ করে তার সাতটি কবিতা পুনর্মুদ্রণ করা হলো:

ভোরবেলার স্বপ্ন নিয়ে ভাসা

যা কিছু প্রত্যয় আজ ভেস্তে যায় আধখানা পা
জীবন যা কিছু ধরে রাখে
এবং যা কিছু সাঙ্গ করে
রেখে যাই পাহাড়ি মদের ধারা
আজ রেখে ঢেকে যাই
অন্যদিকে শোঁ শোঁ শোঁ বাতাস কাঁপে
মনে হয় ভ্রাতার হাতে যে ভগ্নিধাম
তার কথা
এই যে এতটা পথ
এসবই নকল
তবে পড়া যায় মৌসুমী সাপের সাঁটলিপি
আমার প্রত্যয় আজ ভেসে যায় আধখানা পা
খণ্ড ধাবনের যত সুরেলা প্রতীক ছিল
ভুলে গেছি ঢলের পুরান ভাষা
কী এক ভাষার লোভে বেঁচে থাকি
কী এক প্রত্যয় আজ ভেস্তে যায় আধখানা পা
যা কিছু সকল শংকা যা কিছু স্বচ্ছল
জীবনের কে কোথায় ঊষর মলের ভাণ্ড ত্যাগ করে
উদরে পুরেছে কালো গোলগাল অপেক্ষার বীজ
তার ধাবনাঙ্ক মনে করি
অন্য আধা তর্কে বেঁচে থাকে
মাথা ভেদ করে আছে শীতের গহ্বর
ওই পথে ঝেড়ে ফেলি বিদেহী ভস্মের কারুকাজ
তরল আগুনে ঢাকা মেঠো পথ
তাক করা জীবনের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া
সোজা
ও বক্রল সরল চাকার তুমি অণ্ডকাম
আর ভেস্তে যাওয়া আধখানা ভরের সহগ
উলো আমন্ত্রণক্রমে আমি আজ সীমায় এসেছি
যাহার প্রত্যয় আজ ভেস্তে যায় আধখানা পা
সারাটা গায়ের সঙ্গে প্রলেপিত দাফন পোড়ার ঘ্রাণ
দিগ্বিদিক ঘ্রাণের আঘ্রাণে
ভেসে যাওয়া পৃথিবীতে একা আছি
পরমাংশ শোধনের কাটাছেঁড়া সৈকতশালায়
কী এক আকুল লোভে বেঁচে থাকি ছদ্ম প্রতিদানে
এমন আতপ মৃত্যু মাটি শুধু
মৃত্তিকাই পুঁতে রাখা জানে

আমার ঘর

এখন সময় হলো
আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে ফেরার
আমি দুপায়ের হাড় বাজিয়ে ফিরবো
আমার ঘরে
না কোনো ফুলের ঝাড়
কেবল মৃত্যু
আমার ঘরে কী সুন্দর সাজানো

কাঁপন

বৃত্তের সূত্র:
বৃত্তের পাশ ছুঁয়ে থাকা হাত
আলগোছে সরে এসে একটু একটু কাঁপলো
তাকে কী বলা যায়
আমি বাহান্নজন বালকের মুখ তৈরি করি
আদলে আদলে বিদ্যুৎ স্পৃহা চমকায়
আর হাত নিচু করে যখন সরে আসি
সন্ধ্যার সুবাস রেখে চলে যাওয়া রুমালের
অগোচরে জীয়ে থাকা অজস্র কাণ্ডের সাথে
গলাগলি আর খাড়া থাকবার উন্মাদনা
শেকড়ের গুপ্ত স্ফিতির চেয়েও
উত্তুঙ্গ হয়ে ওঠে
আমি এই পৃথিবীর নই
গোলকের সূত্র:
কব্জা খুলে ছুটে ছুটে যাওয়া প্লীহার গন্ধ
ভরাপেট উগরে গিয়ে বিকেলের হিম মাখানো রোদ
গায়ে মেখে ক্রমশ উদাস হয়ে যায়
যা ভাবায়
যা কাতর করবার জন্য আনাগোনা করে
কবিতাকে আঁকড়ে থাকতে হয় এক ছোটো
পীত রঙের হুকের সাথে
আর হাত ফসকে পড়ে যাওয়া কাঁধের গল্প
আজ মনে পড়ে যায়
যার কাছে গচ্ছিত রাখার বেদনা
এক বোতল উগ্র জেদ আর পাশবালিশের
কান ছুঁয়ে থাকা স্বপ্নের আঁকাবাঁকা রেখা
আজ হয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে
যার কাছে আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে
ফেরার সময় হয়
হয় হয় হয়
সেই গন্ধে আকুল চেতনার একপাশ বয়ে নিয়ে যাওয়া
এখন এই বিলয়ের বিনির্মাণ কালে
বৃত্ত ও গোলকের সমন্বয় সূত্র:
ডাক পাড়ে ডাকে
খালি ডাকে
একটু একটু ঠুকরে বেড়ানো ঠোঁটের পিনবিন্দু
স্থায়ীভাবে একবার বসতে চায়
তোমার অন্দরের ভিতর
ঠিক য্যানো আমি ভুলে গেছি
অথচ রাজ্যের বিস্ময় চিহ্ন মাখানো ছাতুর পিণ্ড
আকাশ জুড়ে করতাল বৃষ্টির সাথে ঝরে
ঠিক য্যানো আমি ভুলে গেছি
ক্ষুধা আমি ভুলে গেছি
মেশিনের বরপুত্র আমি

একটি নোম্যানসল্যান্ডের স্বপ্ন

একটি নোম্যানসল্যান্ডের পথ বেয়ে বসে আছি
অন্য এক দোল খাওয়া মাঠে
মাঠের উত্তরে আছে উঁচু এক বিম্বনাশী টিলা
সে টিলার খাঁজে ভাঁজে ফুটে থাকে দোদুল ফুলেরা
দক্ষিণের বায়ু এসে পরগায়নের সাথে
পাখি ও প্রজাপতির দীর্ঘশ্বাস মেশায়
অন্য সকলও
পূর্বে আছে পিত্রালয়
পথের কিনারগুলো কেটেছেঁটে কুরতি
সেই পথে বহু মৃদু শ্যাফ্ট্-এর সুরে
ভেসে আসে মায়েদের ব্যথা
অমরার নিভু নিভু বিচ্ছুরণ কালে
সে আসবে পশ্চিমের প্রকাণ্ড পশ্চিমগুলি ভেঙে
আর আমি সেই নোম্যানসল্যান্ডেতে শুয়ে বসে
হস্তমৈথুনের জন্য ঝোপঝাড় তৈরি করে নেব
আর আজ আমি উষ্ণ উজ্জ্বল কাঠের জুতোয় ঢুকে
মজা লুটি সাত-রশ্মি দিবস রজনী

অবলা সংলাপ

কী যে ঘোর লাগে কাহ্নু বাশি শুনে দুর্বল গাছের ডালে আমার যেপ্রাণপাখি বাঁধা
আহা আগাই পিছাই শুধু হৃদপিণ্ডে খুন্তি ছ্যাঁকা পুরান কাঁথার নক্সা কত আর চক্ষে
সয় জানালায় টিয়া ডাকে তীরন্দাজ কোন সে দূর থেকে বুকে মারে বাণ আমার
চোখের জলে বন্যা নামে বুঝি আমি কি ফ্যালানি ছাই প্রাণসখা আমাকে পোছে না
কতজন আসে যায় হাট ভাঙে করল্লার লতাটাও কঞ্চিমাচা জড়িয়ে ধরেছেওই কলাঝারে
হাঁটে বুঝি কেউ মর ছাই আলতা গাই ওটা কী যে ভুল নিঁদ নাই গলায়শাদা নলা নামতে
না চায় হায় প্রাণনাথ কোন বনে ঘোরে ঘরে শান্তি আমার নাই আমার যে প্রাণে বিষ কেউ
জানলে সর্বনাশ হবে ওলো সই তোকে কই কাহ্নু পিয়া এলে বলে দিস পোড়ামুখি কলস
নিয়ে যমুনা গিয়েছে

শামীম কবীর

খুব ক্রুর মুখোশের মতো মনে হয় এই নাম। অতিকায়
রূপালী তিমির মতো— আমার মর্মমূলেএই খুব নিবিড়
আপন নাম নিদ্রিত রেখেছে এক বিশুদ্ধ আগুন (তন্দ্রায়
নিবে গ্যাছে তার সব তুখোড় মহিমা) —এই প্রিয় সশরীর
নাম এক দাঁতাল মাছির মতো অস্তিত্বের রৌদ্র কুঁরে খায়
রাত্রিদিন; আষ্টেপৃষ্টে কাঁটাতার হোয়ে আছে— শামীম কবীর
এই তুচ্ছতর নাম: গোপনে, ত্বকের নিচে খুব নিরুপায়
এক আহত শিকারির নামের মোহন ফাঁসে জড়ায় তিমির।
ইতিহাসে অমরতা নেই; পরিবর্তে রাশি রাশি বুলেটের
দক্ষ কারুকাজ করোটিতে, দগ্ধ লাশময় দীর্ঘ উপত্যকা
আর নীলিমার বোঁটা থেকে অনর্গল-নির্ভার নিঃস্বদের
জাতীয় সঙ্গীত ঝরে পড়ে। ক্যাবল কুচক্রী এইনাম— পাকা
নিকারির মতো রোয়েছে অমর য্যান, আমার সকল পথে
অয় জালের ব্যুহ কোরেছে আরোপ কোন দুর্বার শপথে।

এই ঘরে একজন কবি

এই ঘরে একজন কবি আছে রক্তমাখা গালিচায় শুয়ে
কুয়াশার মতো তার নিদ্রামগ্ন ভাসমান চোখে ধীরলয়ে
শীর্ণ এক নদীর প্রতিমা ফ্যালে সুরময় ছায়া, শতাব্দীর
শুদ্ধতম শিলাখণ্ড শিয়রে তার— ঠিক একগুঁয়ে
ধীবরের মতো: ছিন্নভিন্ন-ছেঁড়া জালে কৌশলে মরা নদীর
শ্রোণী থেকে অপরাহ্নে রূপালী ইলিশ ছেঁকে নেবে; পচা ঘায়ে
গোলাপের মধু ঢালা— অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে য্যান। ভীষণ অস্থির
হাতে সে ক্যাবল বিষণ্ণ খুঁড়ে চলে শব্দের গোপন তিমির।
কবির আঙুল থেকে অনর্গল রক্ত ঝরে আর মূর্তিবৎ
অন্ধকারে পড়ে থাকে সে-ক্যামন মর্মন্তুদ অদৃশ্য বল্কলে
ঢেকে অস্তিত্বের ক্ষত। অবশ্য মাঝে মাঝেই বদ্ধ ঘরময়
গলিত বাতাস কাঁপে— অন্তর্গত সজীব গর্জনে: বাঁধা গৎ
ভুলে গিয়ে নিদ্রিত কবির বীণা সহসা কী প্রখর আদলে
গড়ে সুরের প্রতিমা, অথচ খোলে না তার অন্ধচক্ষুদ্বয়।