শাহরুখ পিকলুর শহুরে কবিতা

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৮

শহুরে

 

না, গ্রামে না-থেকে কেমনি বলি

যে আমি নহি শহুরে, শহুরেই তো আমি।

মিথ্যা? নাহ্‌ নাহ্‌ -

গ্রামে ভ্রমণে শানকি ভরা ভাত,

সঙ্গে কলমি শাক?

নারে বাপু, আমি শহুরেই যে- নো ডিসেপশন, নো নো......

 

 

শহরে, সারাজীবন

না মফস্বলের টাউন না আধো গ্রাম আধো শহরে নয়-

ঢাকাতেই, রাজধানী- রাজার

নিদ্রাকোষ্ঠের থেকে খুব বেশি দূরে নয়,

ক্ষাণিক ক্বচিৎ তারে দেখি বটে-

রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঘামের ঝর্ণাধারা সঙ্গে নিয়ে

ওষ্ঠাগত প্রাণ, হোসেনের দুঃখের কিয়দংশ-

দুলদুল থাকলেই বা কী?

ইয়াজিদের কপালে যে এই বিজয় লেখা-

এখন ভগবানের নিদ্রাকাল,

বসন্ত বহু দূর

অকালবোধন চাইলেই কি ঘটে যায়?

 

 

গ্রামে থেকেছি

সেই একাত্তরের ঘন কালো দিনগুলোতে

মাস তিনেক হবে তো নিশ্চয় প্রাণের ভয়ে।

আগে ছিলো ছিটেফোঁটা গ্রামে থাকা,

সেবার তা নয়,

এক টানা বহুকাল যেন সেই অসময়ে,

সেই রাতের অন্ধকারের দিনগুলিতে।

এমন সে দিন যেন

অর্জুনের মিনতিতেও কৃষ্ণ অপারগ-

জগতের মালিক নিশ্চুপ থেকেছেন

এখনো থাকেন- সর্বদা।

 

 

কিন্তু সেই তিন মাস-

গ্রীষ্ম-বর্ষা মিলিয়ে বর্ষাই বেশি,

তবুও সূর্যের প্রখর তাপের মাঝে মৃত্যুর হাতছানি,

চারদিকে শত্রু- নির্বিচার হত্যা-ধর্ষণ

আগুনে্র গোলায় সব ভস্ম-

নয়তো হিন্দু মেয়েতে তাওহিদের বীজ বপন-

যুদ্ধে যে সব হালাল-

কেটে কুটে মালাউন হত্যা,

জমি দখল নারী যে সর্বদাই সম্পত্তি-

যখন যার তখন তার যেন।

 

 

স্বাধীন বাংলা, আকাশবাণী

কখনো বিবিসি বা প্রাভদা

তাই তো বলে-

আমি বালক

দেখেছি অনেক রক্ত,

শব, শকুণ, কুত্তা-শেয়াল-নেকড়ের

মানবরূপ।

আকাশে চিলের অভিসার,

তাতে প্রেম নেই

আছে দু’বেলার ভূড়িভোজন।

 

 

আমি বালক তখন তাই ভয় পেয়েছি-

মায়ের বলা ভয়ঙ্কর ঠাকুরমার

ঝুলির রূপকথার মত।

রূপকথা্র ভীতি যে ভোরের

আলোয় মিলিয়ে যায়

কিন্তু

সত্য, মিথ্যা, বর্বরতা

হত্যা-ধর্ষণ-বিশ্বাসের মৃত্যু

বিশ্বাসের মূর্ত-বিমূর্ত অবিচার

অত্যাচার, মনুষত্ব্যের স্খলন

উদ্ভট সব সংজ্ঞা, চারিদিকে।

মৃত্যুতে মুক্তি বলে পণ-

আর বেঁচে গেলে বিজয়ীরা সব রাজা

পদদলিত সব বিজিতের দল,

সব মিলে মিশে একাকার,

তখন বুঝিনি যদিও।

 

 

যারা বাঙলার শহর থেকে দূরে ছিলো

গ্রাম থেকেও অনেক অনেক দূরে-

তারা বুঝেছে কি, কষ্টের সে-রূপ?

বাঙালির দুঃখ বাঙালি বুঝবে

স্থান-কাল-পাত্র নগণ্য-

তাই কি?

কে বলবে মনের কথা-

স্বার্থই যে বড় নির্ণায়ক।

 

 

বিশ্বের ইতিহাস, কে খন্ডাবে-

বাকুনি্ন, লেনিন বা চে,

সব যে মরে ভূত

তবুও আছে কিছু ভূত,

তারা মানুষ হতে যে ব্যস্ত।

 

 

আজকের শহর-

আমার ঢাকাকেই ধরি,

গ্রামের সঙ্গে তফাৎ কী তার?

সৌর্য? বীর্য? অন্যরকম হাহাকার?

মিলে মিশে গেছে সবই

তোমার আমার জীবন-

গ্রামকে চুষে খায় শহর

চুষে খায় বিদেশ

চুষে খায় বাঙালি, বিদেশি বাঙালি

বা শুধু বিদেশি।

 

 

আর আমি ভাবি

নাহ্‌, কিছুই না

শুধু চেয়ে থাকি-

শহরের মৃত্যু হচ্ছে

তাই যেন দেখি

বসে-শুয়ে-আহ্লাদে।

 

 

ঢাকায় থাকি, থেকেছি, মরবো

হেথায়-ই, হয়তো

সে লাশ আমার কুকুর-কাক খেতে পারে

শিয়াল বা চিল? না, সেগুলো নিশ্চিহ্ন প্রায়।

কীটের খাদ্য হওয়াই স্বাভাবিক অথবা ভষ্ম

কিন্তু শকুনও আসতে পারে-

মানুষের মুখোস পরে

মনে এখন অন্য রকম ভয়।

 

 

গ্রাম-নদী-বন

শহর, শুয়োর, কুত্তা মানুষ,

মানুষ নামের কিছু একটা-

চলেছে সবই সমুদ্রে

আনন্দে, উৎসাহে, অশ্রুস্নাতভাবে

সুখের না দুঃখের সে আঁখিধারা!

দিকচক্রবাল ছাপিয়ে

চলেছে মানুষ কিন্তু তবুও

আমি শহুরে

কিছুই বুঝি না-

শুধু বুঝি

গ্রাম নেই, নদী নেই

গাছ নেই, সবুজ নেই

শহর থাকবে কেমনে?

 

চারদিকে আর্তনাদ......

 

 

ঢাকা ২৪শে অক্টোবর ২০১৬