করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫২৪৪৫ ১১১২০ ৭০৯
বিশ্বব্যাপী ৬৪৮৫৩৯৯ ৩০১০৬৮৮ ৩৮২৪০৪
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

শিমুল বাশারের কলাম ‘আপনি বাস্তব নন, ভার্চুয়াল মানুষ’

প্রকাশিত : মার্চ ২৯, ২০২০

কানে ধরে ওঠা-বসা করানোর সাজাটা আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত। শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে শারীরিক আঘাতের ভয়াবহতা এড়াতে আত্মমর্যাদায় আঘাতের মাধ্যমে শাস্তি প্রয়োগের পদ্ধতিটাকে একসময়ে আমাদের সমাজ গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুখ ফসকে কোনো গোপন কথা বের হয়ে গেলে আমরা যেমন জিভ কাটি, তেমনি কানে ধরার এই হেরিটেজও আমাদের এতটাই গভীরে প্রোথিত হয়ে আছে যে, কেউ কোনও প্রকার ভুল করলে নিজের অজান্তে এখনো কানে হাত চলে যায়। এ ধরনের শাস্তি প্রয়োগের নিশ্চয়ই একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে, যা আমার জানা নাই।

আমি নিজেও বহুবার কানে ধরে ওঠা-বসা করেছি। দুই পায়ের নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে কান ধরে থাকার সেই ভয়াবহ মোরগ শাস্তির কথা এ জীবনে ভুলবো না। সে শাস্তি খেয়ে একবার আমার নাক দিয়ে রক্ত বের হয়ে গিয়েছিল। ছেলেবেলার সেই ভয়াবহ শাস্তি মাথা পেতে নেয়ার গল্প আরেকদিন করা যাবে।

যশোরের মনিরামপুরের দুই বৃদ্ধের কানে ধরে দাঁড়ানোর একটি ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। নিন্দার ঝড় বইছে ঘটনাটার অন্তরালে যিনি ছিলেন, তার বিরুদ্ধে। তিনি আমাদের এই প্রজাতন্ত্রেরই একজন কর্মকর্তা। জেন্ডারের বিচারে তিনি একজন নারী। তাকে যাচ্ছেতাই গালমন্দ করছে অনেকে। আমাদের দেশের গালমন্দের ধরণ কেমন হয় তা কারো অজানা নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব গালমন্দ জেন্ডার সেনসেটিভ হয়। পুরুষতান্ত্রিক গালি যে কতটা নোংরা হয়, তাও আমার বলে দেয়ার খুব বেশি দরকার নাই। মনে রাখবেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে সরকারি নির্দেশনা প্রয়োগের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব তাকেই দেয়া হয়েছে। এখন রাষ্ট্র হয়তো আপনাকে সব রকম সুবিধা দিতে পারেনি। একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা বা অসক্ষমতাই তার প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং প্রজাদের আচরণ নির্ধারণ করে দেয়। প্রয়োজনের বিবেচনায় একটি প্রজাতন্ত্র কখনো কখনো কর্তৃত্বপরায়ণ বা চরমপন্থী আচরণও করতে পারে।

এ ধরনের ফ্যাসিবাদের উদ্ভব হয়েছিল ১৯২৫ সালে, ইতালিতে। ওই সময়ের লিডার ছিলেন মুসোলিনী, তিনি সেসময় ইতালি থেকে প্রায় সাত হাজার ইহুদিকে বের করে দিয়েছিলেন। এরমধ্যে প্রায় ছয় হাজারকে হত্যা করা হয়েছিল। ২০২০ সালে এসে করোনার মতো একটি মহামারি কিন্তু সেদেশের শাসক নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। অথচ সে রাষ্ট্রকে আপনি আপনার স্বপ্নের ওয়েলফেয়ার স্টেট হিসেবে মানছেন।

আপনি কি মনে করেন, আমাদের বাংলাদেশটা একটা ওয়েলফেয়ার স্টেট হয়ে উঠেছে এরই মধ্যে? করোনা নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে যখন প্রায় লকডাউন চলছে, তখন সরকারিভাবে প্রজাদের বৃহত্তর স্বার্থে ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ভাইরাসটা যেন কমিউনিটিতে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য কিছু কিছু সতর্কতা মেনে চলতে বলা হয়েছে। সরকার তার কর্মচারীদের সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নিতে বলেছে। তারই অংশ হিসেবে কোথাও কোথাও প্রশাসনের সাথে জনতার বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। এখন লাঠি এবং আইন যার হাতে আছে, বিরোধের কালে সেতো সেটারই প্রয়োগ করবে, এটা খুব বেশি অস্বাভাবিক কী? অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কানে ধরে ওঠা-বসা কোন আইনে আছে?

না, আইনে এ শাস্তি দেয়ার বিধান নাই। এটাই যদি বিধান হতো তাহলে অন্যায়কে প্রতিহত করা এদেশে কোনোদিন সম্ভব হতো বলে মনে করিনা। তবে আপনাদের মনে রাখতে হবে, ইতালি ফেরত রেমিটেন্স যোদ্ধাটা যখন ‘ফাক দিস কান্ট্রি সিস্টেম’ বলে আপনার বিবেককে নাড়িয়ে দিলো, তখন কিন্তু করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারি নির্দেশনার অমান্য করলে সরকার সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮ প্রয়োগের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। বৃহত্তর জনগণকে সংক্রামক ব্যাধি থেকে নিরাপদ রাখাই এই আইনের মুখ্য উদ্দশ্য।

কি আছে ওই আইনে, এটা জানা থাকা এসময় খুব জরুরি। তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন, কোথায় কোন প্রতিক্রিয়া জানাবেন। ওই আইনে কানে ধরানোর কথা বলা নাই, তবে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরিটি চাইলে আপনার চলাচলকেও ওই আইন দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখেন। অপরাধ নিশ্চিত হলে ছয় মাস কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা করতে পারবেন। প্রশ্ন হচ্ছে, মনিরামপুরের ওই দুই চাচা মিয়া কি অপরাধ করেছিলেন? কানে ধরানোর প্রেক্ষাপট আমার জানা নাই তবে এটুকু ধারণা করতে পারি, আইন অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করা হলে তা ওই দুই চাচা মিয়ার জন্য আরো ভয়ানক এবং অমানবিক হতে পারতো। অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে প্রবীন দুজন মানুষ স্বেচ্ছায় কানে ধরেছিলেন কিনা, তা আমি নিশ্চিত নই। তবে এই কানে ধরাটা আমাদের স্বভাবসুলভ আচরণেরও অংশ হতে পারে। তবে এটা স্বেচ্ছায় করলেও তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া যায় কি? সেটা কি মানবিক না অমানবিক? আচ্ছা, একই ধরনের অপরাধ সংঘটনের পর ছোটদের কানে ধরানো গেলে বড়দের কানে ধরানো যাবে না কেন?

করোনা নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত আসার পর কোথাও কোথাও প্রশাসন মানুষকে ঘরে ঢুকানোর জন্য শারীরিকভাবে প্রহার করছে। এটা কি এদেশে খুব আনকমন ঘটনা? আপনারা ফেসবুকে ওই কানে ধরার বিষয়টাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, তাতে নিজেকে একটা ওয়েলফেয়ার স্টেটের সিটিজেন মনে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে কী? বাস্তবতা হচ্ছে, আপনি বাস্তব দুনিয়ারই মানুষ হতে পারেননি। আপনি একজন ভার্চুয়াল মানুষ। খুব মানবিকতা ফলাচ্ছেন, যে কোনো কোয়েশ্চেনিয়ার জরিপে আপনি নিশ্চিত স্ট্যান্ডার্ড হন। আপনাকে স্বাগত। এই লেখাটা আপনার জন্যই প্রস্তুত করেছি।

কলোনিয়াল লিগ্যাসি আমাদের সব জায়গাতেই আছে। আমাদের আইন, আইন প্রয়োগের ইতিহাস— কোথায় নেই এই লিগ্যাসি? সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ আইনের গোড়ার কথা জানেন কি? এ ধরনের আইন এ উপমহাদেশে এটাই প্রথম নয়। ১৮৯৭ সালে ভারতে যখন বুবনিক প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে, তখন ওই মহামারি ঠেকাতে প্রথম এ ধরনের আইন করা হয়। সেই আইনের প্রয়োগের ইতিহাসও খুব ভয়াবহ ছিল। কোথাও প্লেগ সন্দেহ হলেই সেই মহল্লা জ্বালিয়ে দেয়া হতো। মহল্লার বাসিন্দাদের কোথাও কোথাও নগ্ন করিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখার ঘটনাও ঘটেছিল। মুসলমান পর্দানশীল নারীদের প্রকাশ্যে নয়, বরং একান্তে পরীক্ষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন প্লেগ কমিশনার বৃটিশ অফিসার র‌্যান্ড। সে সময় আপনার আমার মতো বহু মানুষ এ ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। ওই প্রতিবাদ দেখেও সরকার তখন ওই অফিসারকে কিছু বলে নাই। বরং একটা কমিশন করেছিলেন কোথাও কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য। জানা যায়, ওই আইনের বলে ঔপনিবেশিক সরকার বিভিন্ন বাড়িতে, যাত্রীদের মধ্যে সন্দেহভাজন প্লেগের রোগী খুঁজত। তাদের জোর করে আলাদা করে দিত এবং সংক্রমিত এলাকা ধ্বংস করে দিত।

যে বছর ওই আইনটি জারি হয়, সে বছর স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলককে ১৮ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। তার অপরাধ ছিল, তার চালিত দুটি সংবাদপত্র কেশরী এবং মারহাট্টায় প্লেগ মহামারি যেভাবে সরকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তার পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা। ১৮৯৭ সালের মহামারি সম্পর্কিত আইনের বিধির চারটি ধারা রয়েছে। যার উদ্দেশ্য, বিপজ্জনক মহামারিজনিত রোগের সংক্রমণ প্রতিহত করা। এই আইনের দ্বিতীয় ধারায় রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে রোগ ছড়িয়ে পড়া আটকাতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ ও বিধি তৈরির অধিকার দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে:

যখনই কোনও রাজ্য সরকার মনে করবে মহামারি ছড়িয়ে পড়বার আশঙ্কা রয়েছে এবং যে আইন রয়েছে, তার দ্বারা এই ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তখন সরকার নিজে বা কোনও ব্যক্তিকে অধিকার দানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। এই পদক্ষেপ প্রকাশ্য নোটিশ দানের মাধ্যমে হবে। রাজ্য সরকারের হাতে যেসব অগাধ ক্ষমতা দেয়া রয়েছে, তার মধ্যে থাকছে রেল বা অন্য কোনও পরিবহনে যাতায়াতকারীদের পরীক্ষা, পরীক্ষক আধিকারিকদের সন্দেহ হলে, তাদের আলাদা করে হাসপাতাল বা অন্য কোনও অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা করা। তিন নম্বর ধারায় এই আইনের বিধি অমান্য করলে শাস্তির বন্দোবস্তও করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৮৮ নম্বর ধারায় (সরকারি আধিকারিকের নির্দেশ অমান্য করা) ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। চার নম্বর ধারায় এই আইন বলবৎকারী আধিকারিকদের আইনি সুরক্ষা দেবার কথা বলা হয়েছে।

সুতরাং বাংলাদেশে করোনা প্রতিরোধের জন্য যে আইন প্রয়োগের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, সেটি জানা থাকলে আপনার বুঝতে সুবিধা হবে যশোরের ওই এসিল্যান্ড চাচা মিয়াদের কানে ধরিয়ে রেখে আইনসম্মত কাজ করেছেন, নাকি মানবিক আচরণ করেছেন? আপনারা যারা ওই এসিল্যান্ডের গুষ্ঠি উদ্ধার করছেন এবং যে প্রক্রিয়ায় করছেন হয়তো এসব কারণেই সরকার তাকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে। এতে করোনা প্রতিরোধে আপনার ভূমিকাটা কোথায় থাকলো? ভেবে দেখুন তো, সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার এসব কর্মকাণ্ডকে করোনা প্রতিরোধে সরকারি কাজে বাধা দান হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে কিনা?

তবে হ্যাঁ, ওই এসিল্যান্ডের অপরাধীকে কানে ধরিয়ে ছবি তোলা তার শাস্তি প্রদানের সক্ষমতার প্রমাণ রাখার অংশ কিনা, তা আমি জানি না। বিষয়টি আমারো পছন্দ হয়নি।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক ও গণমাধ্যমকর্মী