করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৪০৬৩৬৪ ৩২২৭০৩ ৫৯০৫
বিশ্বব্যাপী ৪৫৯৫০৩৭২ ৩৩২৭৩৯২২ ১১৯৪৪২৩

শিমুল বাশারের খুদে গল্প ‘জোছনার চাঁদ’

প্রকাশিত : অক্টোবর ১০, ২০২০

পায়ের কাছে পূবের জানালাটা খোলা। দক্ষিণা বারান্দা লাগোয়া বেডরুম। মাঝে স্বচ্ছ গ্লাসের দেয়াল। যদিও শীত, বর্ষা সব সময়ই গ্লাসটা সরানোই থাকে। শেষরাতে ইদানীং রহস্যময় হিম হাওয়া  আসে। একটি দুটি পরিযায়ী পাখির চিৎকার শোনা যায়। বারান্দার গাছেরা মৃদু দোলে। কিছু গাছে ফুল আছে। নয়নতারা, পাপড়ি গাদা আর মর্নিং গ্লোরির অর্ধস্ফুট কলি সব মিলিয়ে রোমান্টিক এক মেলাঙ্কলি আমার।

পূবের জানালা খোলা। ঘুম না এলে চোখ খুলে আবছায়ার ভেতর আমি পায়রাটাকে খুঁজি। অহংকারী গ্রীবাদেশে তার পার্পল আভা। কবে যে, সে আমার চোখের নিকটে এসে এই আবাস খুঁজে নিয়েছিল, জানা নাই। হঠাৎ এক বৃষ্টিমুখর বিকেলে ভেজা হলুদ দালানের কার্নিশের তলে তাকে আমিই প্রথম দেখেছি কিংবা সে আমাকে। তার সাথে আমার দূরত্ব এক কবর সমান।

আমরা একে অপরের দিকে ক্ষণিক তাকিয়ে থাকলাম। তারপর থেকে পায়রাটা আমার মনোটোনাস সময়ের সঙ্গী। বিছানায় গা এলিয়ে পায়ের কাছে খোলা জানালায় তাকিয়ে পায়রাটাকে দেখতে না পেলে আমার আর ঘুম আসে না। ইদানীং আবার মেথডলজিক্যাল অথচ কেয়ারফুল এক অভ্যাস রপ্ত করেছি। ঘুমের দেশে তলিয়ে যাবার ঠিক আগে আগে মানুষের চিন্তা জগতে কল্পনার যে সুররিয়ালিস্ট চিত্রকল্প তৈরি হয়, সেখানে পায়রাটাকে রাখি।

কখনো কখনো তার অহংকারী গ্রীবাদেশে একটা জোছনার চাঁদ ঝোলে। সেই চাঁদের গাল বেয়ে গলে গলে জালের মতো আলো ছড়ায়ে নামে দালানের হলুদ দেয়ালের শিরা-উপশিরায়। আমার পায়ের পাতা দীর্ঘ হতে থাকে ক্রমাগত। নিস্তেজ হতে থাকা দেহ থেকে নীলাভা ছিটকে যায় জানালা দিয়ে। মাতিসের রঙিন মাছ বুকের নদীতে কেমন খলবল করে আমার!

বারান্দায় কামিনী গাছের ঘোর কালোর নিচে একটা হলুদ বিড়াল আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত হাসে। দূরাগত কোনো অচিন দিগন্ত থেকে দুধ ছোটানো শিশুর অভিমানী কান্নার মিহি আওয়াজ আসে, কে যেন মিষ্টি করে তার মাকে ডাকে মা... মা গাব খাইবা? মা গাব আনছি।

গহীন জঙ্গলের জলে ডুবে যায় নারীর চু্ল। চেনা কাপড়ের ঘ্রাণ লেগে যায় বিছানায়। মাখা মাখা আদর স্মৃতি! প্রেমিকার ব্রা, প্যান্টি পাখির মতো ওড়ে রাতের আকাশে!

কতবার ভাবলাম, জানালার কোনে পাতিল রেখে পায়রাটাকে একটা ছোট্ট নীড় করে দেই। কিন্তু আমি সেটা করি না। অথচ পায়রাটাকেই খুঁজি প্রতিদিন, প্রতিরাতে। জানালার ওপাশে পায়রাটা, এপাশে আমি। আমার চায়নিজ দার্শনিক ঝুয়াংজির কথা মনে পড়ে.. একদা ঝুয়াংজি স্বপ্ন দেখেছিলেন, রঙিন প্রজাপতি হয়ে বাগানের ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছেন। স্বপ্ন ভাঙার পর দেখলেন, তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন। এরপর আর নিশ্চিত হতে পারলেন না তিনি কি আসলে ঝুয়াংজি যিনি স্বপ্ন দেখছিলেন একটি প্রজাপতি হয়ে উড়ছিলেন নাকি তিনি আসলে প্রজাপতিটিই এখন স্বপ্ন দেখছেন ঝুয়াংজি হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন?

আধো আঁধারে কার্নিশের তলে পায়রাটা চুপ করে বসে আছে আমার দিকে তাকিয়ে.. আমি পায়রার দিকে তাকিয়ে। বারান্দার সব গাছ ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। আমার হাত আঠালো, রক্তমাখা। ও কামিনী, ও নয়নতারা বৃন্তচ্যুত ফুল দল... এখন ঠিক কয়টা বাজে কেউ কি বলতে পারো? মাতিসের রঙিন মাছ উড়ছে... আকাশে ভ্যানগগের তারা, পায়ের কাছে ঝিকমিক নদী।