সজীব দে’র কবিতা ‘কখন যে মরে গেছি, জানতে পারিনি’

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৩০, ২০১৯

সন্ধ্যা নামার পর আমার কেউ নেই। বাতাস আর গাভর্তি কুয়াশা চায়ের কাপে উড়ে যাচ্ছে। বিদেহী আত্মা বইয়ে পাতাগুলি দিয়ে তাপ পোয়াচ্ছে। কিছু নিরন্ন মানুষের চোখ ঘোলা হয়ে আসে।

আমি একজন পোস্টমর্ডানিস্ট আরবান মধ্যবিত্ত পুরুষ। আমি বিষণ্ণ। অবসাদগ্রস্ত। যোজন যোজন দূরত্ব তোমার আর আমার। মুখোমুখি কথা বলি না। ভালবাসা অথবা সফলতা আমার জন্য নয়।

এসব জেনে-বুঝে যখন বেঁচে থাকি, তখন তোমাদের ফালতু মোটিভেশনাল স্পিচের মুখে থুথু ছিটিয়ে চোখ বন্ধ করি। আর বেজে ওঠে, দ্য ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড। যখন হেরোইন গানটি গাইতে থাকে, আমি তুরীয় ঘুমে একাকি।

আর এক বিশাল অট্টালিকার কোনও কক্ষে আমাকে রেখে আসা হয়। এসব অহেতুক কথা যারা পড়ে এবং আমি লিখতে লিখতে যখন কোনও গন্তব্য পাই না, তখন নিরস্ত্র সেনার মতো চাউনি দিয়ে চারপাশটা দেখি আর আমাকে গুলি করার জন্য ঘিরে আছে কিছু কবি কিছু ফিল্মমেকার আর কিছু পাঠিকা।

আমি আত্মসমর্পণ করি। তারা আমাকে চোখ বেঁধে একটা দেয়ালের কাছ দাঁড় করিয়ে দ্যায়। দোয়েল শিস দিয়ে ওঠে হঠাৎ করে। আমার কান স্পষ্ট শোনে তাদের রাইফেল তাক করার শব্দ। আমি হাসি। একজন কবি একজন ফিল্মমেকার আর একজন পাঠিকা আমার কাছে আসে। তারা জানতে চায়, আমার শেষ ইচ্ছে কি?

আমি চুপ থাকি। জানি না তো আমার কি ইচ্ছে। আমার তেমন কোনও ইচ্ছে কোনোকালে ছিল না। তখন হঠাৎ মনে আসে, একটা এলএসডি নিতে। কারণ, উপশম! তারা নাকচ করে। জানায় যে, আমাকে কষ্ট নিয়ে মরতে হবে। বলি, তবে কোনও ইচ্ছে নেই আর। তবে একটা রেলস্টেশন যদি এনে দিতে পারে তবে সারদা স্টেশনে পাঁচ মিনিট দাঁড়াতে চাই।

তারা তা-ও নাকচ করে। কারণ তারা মনে করে, ওখানে গেলে হয়তো আমি হিমশীতল হতে হতে বরফ হয়ে যাব। তারা আমার তিন নম্বর ইচ্ছের কথা জানতে চায়। বলি, আমার কানের একপাশে নাগকেশর ফুল গুজে দিতে পারলেই হবে। কিন্তু তারা তাতেও রাজি হয় না। কারণ, আমি ফুলের গন্ধে বিবশ হয়ে যেতে পারি।

তখন বলি, তবে মৃত্যুর আগে আমার আর কোনও শেষ ইচ্ছে নেই। তোমার প্রেমিকাকে কি চুমু খেতে চাও? একবার বলে এক পাঠিকা। চিৎকার দিয়ে উঠে চেয়ে দেখি, সে তো আমারই প্রেমিকা! এবার আমি মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে না করে দেই। অনুভব করি, পাঠিকা অথবা প্রেমিকার মুখ চুপসে গেছে।

এবার আমি বলি, আমার কোনও শেষ ইচ্ছে নেই। চাইলে এখনই তারা আমাকে গুলি করতে পারে। আমি প্রস্তুত আছি। সামনে দিয়ে তখন একটা মিছিল মার্চ করতে করতে চলে যায়। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার স্লোগানে মুখরিত ছিল মিছিলটি। তারপর কিছু রিকশা টুং টাং শব্দ করতে করতে চলে যায়। যায় একজন বাদাম বিক্রেতা।

এভাবে প্রায় আধঘণ্টা পেরিয়ে গেলে প্রধান কবি বলে ওঠেন, আমাদের হাতে আর সময় নেই। আপনারা প্রস্তুত হোন। সাথে সাথে বুটের শব্দ। তারা নিজেদের পা হাঁটু সোজা করে রাইফেল তাক করে। আমার মনে পড়ে, ফাল্গুনি তো একটি রাইফেল ও একটি বাইবেল নামক শিরোনামের কবিতা লিখেছিল। প্রধান ফিল্মমেকার স্ট্যান্ডবাই বলে, ফাইভ ফোর থ্রি টু ওয়ান অ্যান্ড অ্যাকশন...

রাইফেলের গুলি ঝাঁকে ঝাঁকে আমার দিকে ছুটে আসে। মাটিতে অবশ দেহ লুটিয়ে পড়লে আমি অন্ধকারে ঢুকে যেতে থাকি। তারপর কখন যে মরে গেছি, জানতে পারিনি।