অঙ্কনঃ রিফাহ সানজিদা
সঞ্চারী ভৌমিকের কবিতা ‘ভালোবাসি বললেই’
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৮
আমার ঘর থেকে ঘুরে এসো। তোমাকে তো তেমন করে ভালোবাসতে পারিনি। পারিনি বলেই হেমন্তকে তেমন বুঝি না। শীত যতটা কুয়াশা নিয়ে চণ্ডিমণ্ডপে সকালবেলা ডেকে নিয়ে যায়...
পৌষলক্ষ্মী ঘরে আসে। আলপনা দি উঠোনজুড়ে, কিন্তু তেমন করে ভালোবাসতে পারিনি যে তোমায়। তাই আজও বুক-বারান্দা খাঁ খাঁ করে... বৈষ্ণবী খরা!
উনুনপাড়ে নতুন গুড়ের পিঠে রেখে আজও অপেক্ষা করি। গোবর নিকোই। কিন্তু তুমি? তুমি তো আর আসো না...
শিকারি বেড়ালের লেজের মতো অভিমান জমেছে, তবুও তুমি এসে ঘুরে যেও আমার ঘরে...
শীত কাটিয়ে বসন্ত কীভাবে আসে, বুঝি না। তোমাকে ভালোবেসেছি তোমার মতো করে। তাই নিজে তোমায় কতটা ভালোবাসি, বুঝিনি...
তবু একটা আর্জি, দোলে এসো। তোমার নরম গালে আবিরের সোহাগ মাখাবো। নববর্ষে এসো।
নতুন জামার গন্ধ শোকার কাঙালবাসনা নিয়ে, আর পঁচিশে বৈশাখ অবশ্যই আসবে রবিঠাকুরের গান নিয়ে...
গেয়ে উঠবে, তোমায় নতুন করে পাবো বলে...
ভালোবাসি বললেই মনে পড়ে যায় সেই নিমগাছের পাতায় লেগে থাকা আলো
বৃদ্ধ বাগানের মালির ছাপ ছাপ জামা, মায়ের পোষা কাঠবিড়ালিদের দুপুর ভাতের অভ্যেস
তার আঁচলে বাধা কালোজিরের পুঁটুলি, বাবার দাঁড়ি কাটা বাকসের প্রতিটি খাপখোলা ব্লেড, প্রতি রবিবার সাইকেল চেনে মোবিলগন্ধ
ভালোলবাসি বললেই মনে পড়ে যায় সেই পাথরকুচির বাগান যেখানে পড়ে গিয়ে আমাদের হাতপা ছড়ে যেত
লাল ওষুধ, তোমার ছোট ছোট নরম হাত, গোলাপি
বসতবাড়ির মেঝে, একটা কেন্নো পার হয়ে যেতে যেতে লজ্জাবতী
দেয়ালের গায়ে টিকটিকির আচমকা জ্যোতিষী বনে যাওয়া, ঠিক-ঠিক-ঠিক
নতুন জুতোয় ঘরময় দৌড়নো, ঘর মুছে দ্যায় যে মাসি তার মেয়ের বিয়ে আচমকা, পাত্রপক্ষের ঘড়ি-সাইকেল
দিদিমার পুরোনো ডায়েরিতে হিসেবের পাশাপাশি কয়েকটা মনের কথা
ভাঙা ক্যাসেটের বাকসে রবীন্দ্র নজরুলের মাঝে আচমকা নচিকেতা
মায়ের জামাকাপড় ধোয়ার লোহার বালতি, মায়ের পা ধোয়ানোর বাতিক
কোন পেনের মুটকি নেই, সমস্ত খাতার মাঝের প্রচুর পাতায় বেকারত্ব
ভালোবাসি বললেই মনে পড়ে যায় সেই থেকে থেকে কাশির দমক ওঠা সিলিং ফ্যান
দাদুর কাশির ওষুধ সুস্বাদু, তোমার প্রথম মায়ের কোলে চেপে আমার দিকে এগোনো
তারপর সেই নবম শ্রেণি, মাঝে দাদুর চিতা, মায়ের বুকের ব্যামো
কাকাদের সেই জমি রাজনীতি, বাবার কবিতা-কান্নার রাত, আমার না-ঘুম চোখের পাতায় বৃষ্টি
ভাড়াবাড়ির অল্পবয়সী ছাদ, সিঁড়ির তলায় বাথরুমে, তোমার প্রথম চিঠি
আমার ছবি আঁকার খাতায় আরশোলা, মাধ্যমিকে একটাতেই লেটার, ঈদের দিনে বন্ধুবাড়ির বীফ... এসব কেবল বাবা জানত
ভালোবাসি বললেই মনে পড়ে যায় তোমার অন্য ভালবাসা, আমার ভোর চারটেয় ঘুম, বাংলা অনার্স
আমায় ছিনিয়ে আনা আগুন, তোমার প্রথম গমের পিঠ, নতুন এক পোশাক চিনেছিলাম, তার হুক
মায়ের জন্মদিনের পায়েসে বেশি চাল, তোমার প্রথম প্রতিশ্রুতি, আমার বিদেশি সঙ্গীত
ভালোবাসি বললেই মনে পড়ে প্রত্যেক রিশকাতেই ঋতু নির্বিশেষে পর্দা দরকার।
রাতের বেলা আচমকা আলো চলে গেলে রবীন্দ্রসঙ্গীত
ঠকছি দেখেও বিশ্বাস- বামপন্থা, বামপন্থা...
ভালোবাসি বললেই অনেক কথা বলা হয়ে যেত তখন, এখন অনেক কথা বলেও বোঝানো যায় না, ভালবাসি।























